ঢাকা, মঙ্গলবার 22 August 2017, ০৭ ভাদ্র ১৪২8, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এবার খেলাপি ঋণের শীর্ষ তালিকায় উঠে এলো ইসলামী ব্যাংকের নাম

 

এইচ.এম আকতার : এবার খেলাপি ঋণের শীর্ষ তালিকায় উঠে এলো দেশের সর্ব বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের নাম। এর আগে কখনও খেলাপি ঋণের শীর্ষ তালিকায় এই ব্যাংকটির নাম ছিল না। পরিচালনা পরিষদ পরিবর্তনের মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির এমন অবনতিতে অবাক গ্রাহক এবং শুভাকাঙ্খিরা। ছয় মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।

 খেলাপি ঋণের পাশাপাশি প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতিতে পড়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। চলতি বছরের জুন শেষে এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে সোনালী, বেসিক, ইসলামী ও ন্যাশনাল ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত জুন প্রান্তিকের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, খেলাপি ঋণে এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। খেলাপির শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটি গত জুন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করেছে ৩৩ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের সাড়ে ৩৪ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করেছে ১৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি সাত হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৫৩ শতাংশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। গত ছয় মাসে বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত ছয় মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। যা শতকরা হিসাবে দাড়ায় ৩৬ শতাংশ।

ব্যাংকটির এমন অবনতিতে সারা দেশের ১ কোটি ২৫ লাখ গ্রাহক এবং শুভাকাংখিরা চিন্তিত। তারা বলছেন,ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার তিন যুগের এমন অবনতি হয়নি। ব্যাংটির পরিচালনা পরিষদের পরিবর্তন না অন্যকোন কারনে এই ঘটনা ঘটলো তা এখনও স্পষ্ট নয়। 

এর পর রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, যার দুই হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা খেলাপি, বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ। আর পূবালী ব্যাংকের এক হাজার ৮৩২ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই ব্যাংকটি আগের খেলাপির তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে ছিল।

  রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পাঁচ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণের ১৪ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চার হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের ২০ শতাংশ।

 রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ চার হাজার ৭৬০ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৬৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫২ শতাংশ।

কেয়া গ্রুপের ঋণের কারণেই পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী। তিনি বলেন, কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠানের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পূবালী ব্যাংকের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। বড় অংকের ওই ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তবে কেয়া গ্রুপের ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত থাকায় ঋণটি নিয়ে ব্যাংকের খুব বেশি উদ্বেগ নেই। 

আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ২২৯ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণের আট শতাংশ। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ২১৩ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণের পাঁচ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক হাজার ১৫৪ কোটি টাকা, বিতরণকৃত ঋণের সাত দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে বেসরকারি খাতের বিতরণকৃত ঋণের শতকরা হিসেবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭৬ দশমিক ৫২ শতাংশ খেলাপি, আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭০৭ কোটি টাকা।

মোট ঘাটতির সিংহভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের। আর সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮০ কোটি টাকা।

ব্যাংক ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতির অর্থ সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই ব্যংকিং খাতে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ। আর এ সময়ে যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত ঋণগুলো ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। ফলে প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে। আর এটি বেশি বাড়ছে সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে। কারণ তাদের জবাবদিহিতা কম। তাই সরকারের উচিত এসব ব্যাংককে সাপোর্ট না দিয়ে ঋণ আদায়ের ওপর চাপ দেয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর হওয়া। একই সঙ্গে যেসব বেসরকারি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে, সেগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৪৩ হাজার ৬৪০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৪৪৯ কোটি আট লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ৩১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এর খেলাপির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে ছয় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ তিন হাজার ৮০ কোটি ১১ লাখ, সোনালী ব্যাংকের দুই হাজার ৮০৯ কোটি ৩৪ লাখ, রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ৪৭৩ কোটি ৮০ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২৬৯ কোটি চার লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭২৬ কোটি ৮৮ লাখ ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৭৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

আলোচিত সময়ে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কোনো কোনো ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত (উদ্বৃত্ত) অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে রাখায় সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমে গেছে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশিরভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো ধরনের ঝুঁকির মুখে না পড়ে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। এর একটি হলো প্রভিশন সংরক্ষণ। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণীকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাবস্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শেয়ারহোল্ডাদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

উল্লেখ্য, ছয় মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর বাইরে মন্দমানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ। সব মিলে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ