ঢাকা, মঙ্গলবার 22 August 2017, ০৭ ভাদ্র ১৪২8, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

জিবলু রহমান : [পাঁচ]
দৈনিক প্রথম আলো : এই মুহূর্তে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ (কাউন্সিল, না সংসদ) কোনটি বহাল? সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কি পুনরুজ্জীবন ঘটেছে?
শফিক আহমেদ : মনে হয় না রায়ে এ বিষয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা আছে।
দৈনিক প্রথম আলো :  তাহলে আপিলের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ৯৬ অনুচ্ছেদের আইনি মর্যাদা কি থাকবে?
শফিক আহমেদ : এটা এখনো বিচারাধীন।
দৈনিক প্রথম আলো : এ কথার যুক্তি কী? হাইকোর্ট কি তাহলে ‘মামলাটির সহিত সংবিধান-ব্যাখ্যার বিষয় জড়িত আছে’ মর্মে সংবিধানের ১০৩(২) অনুচ্ছেদের আওতায় সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন?
শফিক আহমেদ : হ্যাঁ, করেছেন বলে আমি শুনলাম।
দৈনিক প্রথম আলো :  যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে হাইকোর্ট নিজেই কিন্তু মনে করছেন যে, এর সঙ্গে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আর তা আপিল বিভাগ নিষ্পত্তি করবেন।
শফিক আহমেদ : ঠিক তাই, সে কারণে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর আইন দুটি না করা পর্যন্ত কাউকে অপসারণের কোনো প্রশ্নই আসে না।
দৈনিক প্রথম আলো :  মন্ত্রিসভা ও আইন কমিশন কিন্তু একটি আইনের খসড়া করেছে।
শফিক আহমেদ : করেছে। কিন্তু সেটা তো চূড়ান্ত নয়। সুপ্রিম কোর্ট ও বিশেষজ্ঞদের মত নেওয়ার কথা ছিল।
দৈনিক প্রথম আলো : সেই সুযোগ শেষ হয়নি। আপিলের সম্ভাব্য শুনানি এবং সুপ্রিম কোর্টের অভিমতের মধ্যে একটা সমন্বয় আনা যেতে পারে।
শফিক আহমেদ : সে জন্যই আমি বলছি, ধৈর্য ধরে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে যাঁরা সংসদীয় অপসারণের বিরোধিতা করছেন, তাঁরা কেন তা করছেন, তা-ও স্পষ্ট নয়। সুতরাং আপিল বিভাগে অধিকতর আলোচনার দরকার আছে। আশা করব, তাঁদের সিদ্ধান্ত সব বিতর্কের অবসান ঘটাবে।
দৈনিক প্রথম আলো : বিচারপতি খায়রুল হক ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না বলেছেন, এর কী তাৎপর্য?
শফিক আহমেদ : ভোটাভুটি যদি গোপন ব্যালটেই হয়, তাহলে ৭০ অনুচ্ছেদের দরকার পড়ছে না।
দৈনিক প্রথম আলো : তাহলে তো প্রস্তাবিত আইনে নির্দিষ্ট করে বলতে হবে যে ৯৬ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদটি প্রযোজ্য হবে না, কিন্তু সেটা তো আইন কমিশন বলেনি। আর সাধারণ আইন দিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
শফিক আহমেদ : ঠিক তাই। আমি তো সে কারণেই আগে আইনের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা বলছি। আর আমি মনে করি, আইন করে সাংসদদের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতামুক্ত করা সম্ভব।
দৈনিক প্রথম আলো : তাহলে আইন যদি আলোচনাসাপেক্ষ এবং তাতে সরকার যদি আন্তরিক থাকে, তাহলে হাইকোর্টের শুনানি কি আরও বিলম্বিত হতে পারত?
শফিক আহমেদ : পারত। সেটাই উচিত ছিল।
দৈনিক প্রথম আলো : রাষ্ট্রপক্ষ কি তেমন নিবেদন হাইকোর্টে করেছিল?
শফিক আহমেদ : সেটা আমি জানি না।
দৈনিক প্রথম আলো : আপনি কেন বিশ্বাস করেন যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে?
শফিক আহমেদ : আমি তা-ই মনে করি। আমি আইনমন্ত্রী থাকতে একজন বিচারকের আচরণ তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিল তা বিবেচনায় নেয়নি। সহকর্মীর প্রতি একটা সহমর্মিতা থাকে, তারও একটা অপনোদন দরকার। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৮ মে ২০১৬)
দৈনিক প্রথম আলো : আদর্শস্থানীয় কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা নেই, তাহলে ভীতিকর কি ৭০ অনুচ্ছেদটাই?
খন্দকার মাহবুব হোসেন : প্রথম কথা হলো তাদের সংস্কৃতি থেকে আমাদেরটা আলাদা। যাঁরা সংসদে যাচ্ছেন, তাঁরা প্রধানত বিচক্ষণ রাজনীতিক নন। বেশির ভাগই টাকার জোরে, দলীয় টিকিটের জোরে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে তাই প্রজ্ঞা আশা করা যায় না। আমাদের বিচার বিভাগ সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু নিম্ন আদালতকে আমরা রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবমুক্ত করতে পারিনি।
দৈনিক প্রথম আলো : ১১৬ অনুচ্ছেদে যেখানে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে আছে, সেই বিধানকে চতুর্থ সংশোধনী ও জিয়ার সামরিক ফরমান থেকে মুক্ত করতে না পারার কারণে বিচার বিভাগকে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন বলা যায় না।
খন্দকার মাহবুব হোসেন : হ্যাঁ, আপনারা এটা বারবার লিখেছেন, তদুপরি বলব, বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসে অনেকটা পরিবর্তন এনেছেন। আগে বিচারক বদলি ও পদায়নে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে নামমাত্র পরামর্শ হতো।
দৈনিক প্রথম আলো : বর্তমান প্রধান বিচারপতির আমলেও বদলির পরামর্শ থমকে ছিল, প্রধান বিচারপতিকে এ জন্য আলটিমেটাম দিতে হয়েছে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন : এটা ঠিক আমরা সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও কার্যক্ষেত্রে স্বাধীন নই।
দৈনিক প্রথম আলো : ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং বিচারক নিয়োগে আপিল বিভাগেরই  তৈরি করা আইনের বাস্তবায়নের কি দরকার নেই? এর সঙ্গে বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়া কী হবে, তার কি কোনো যোগসূত্র নেই? উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণ সংসদের কাছে যাওয়ার বিরোধিতা করছেন, আর নিম্ন আদালতের বিচারক অপসারণ সরকারের হাতেই রাখবেন?
খন্দকার মাহবুব হোসেন : হ্যাঁ, তার দরকার আছে। বিচারক নিয়োগের নীতিমালার জন্য আমরা ঘন ঘন দাবি তুলেছি। বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য নিম্ন আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছেই ন্যস্ত করতে হবে।
দৈনিক প্রথম আলো : আপনি গত তিন মেয়াদে সুপ্রিম কোর্টের সভাপতি ছিলেন, এ সময়ে আপনি এ বিষয়ে জোরালো আন্দোলন করেননি। বিচারপতি এম এ মতিন দুঃখ করে বলেছেন, এ কোন দেশ, যেখানে বিচারক নিয়োগের আইন থাকতে সুপ্রিম কোর্ট বার নীতিমালা চাইছে?
খন্দকার মাহবুব হোসেন : আমি এই সমালোচনা গ্রহণ করি। তবে যেখানে যতটুকু এখন আছে, সেখানে আমরা যদি মানসিক শক্তি অর্জন করি, পদোন্নতির আকাক্সক্ষা না করি, তাহলে আমরা এগোতে পারি। আর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে যেখানে প্রধান বিচারপতি ও দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারক ছিলেন, তার পরিবর্তে আজ যদি সংসদের ফ্লোর ভাগ্যনিয়ন্তা হয়, তাহলে তো ভয়ানক ব্যাপার ঘটবে। রায়ের পরে আমরা যা দেখলাম, তাতে আশঙ্কা করি, কেউ রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদে এসে খড়্গহস্ত হওয়ারই প্রবণতা দেখাতে পারেন। সর্বোচ্চ আদালতকে চাপে ফেলতেই কাউন্সিল বিলোপ করে সংসদের হাতে অপসারণের ক্ষমতা নেওয়া হচ্ছে।
দৈনিক প্রথম আলো :  বিচারপতি খায়রুল হক যেভাবে বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়াকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতামুক্ত মানে দলীয় হুকুমের বাইরে রাখার কথা বলেছেন, সেটার বাস্তবায়ন হলে কি অবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে?
খন্দকার মাহবুব হোসেন : তিনি বলেছেন, ৭০ অনুচ্ছেদ এখানে প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু তিনি সঠিক বলেননি। কারণ, ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের সিদ্ধান্তই চলবে। এমনকি যদি তা নাও চলে, তাহলেও আমি বলব, আমাদের বর্তমান যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেখানে যদি এই ক্ষমতা সংসদের কাছে যায়, তাহলেও বিচারকদের ওপর একটা রাজনৈতিক চাপ থাকবে। বর্তমানে অনেক রাজনীতিকই আইন পেশায় আছেন, যখন তাঁরা আদালতে প্রতিকার পাবেন না, তখন তাঁরা সংসদে গিয়ে নানা অভিযোগ তুলতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাঁরা শালীনতাও হারাতে পারেন। যে রায় এসেছে তাঁর প্রতিকার হলো আপিল। সেটা জানা সত্ত্বেও সংসদে সেই রায়ের বিষয়ে শালীনতাবিহীন আলোচনা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। বিচারকদের প্রতি যেভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে, তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। এখানে ক্ষতিকর প্রবণতাটাই সবচেয়ে লক্ষণীয়। আর সেটা হলো, আমরাই যেহেতু আপনাদের বিচারক করেছি, তাই আমরা যা খুশি তা-ই বলতে পারব! তারা একদা হৃষ্টচিত্তে পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলে আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অথচ এখন তাঁরা বলছেন, সংসদের আইন আদালত বাতিল করতে পারেন না।
দৈনিক প্রথম আলো : আমাদের সংস্কৃতিতে রায় পক্ষে গেলে এক রকম, বিপক্ষে গেলে অন্য রকম প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়!
খন্দকার মাহবুব হোসেন : হ্যাঁ। আজ যদি আমার দল ক্ষমতায় থাকে, আর আমি কোনো বিচারকের রায়ের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদে আসি, আর বক্তৃতা করি, তখন বিচারকের মর্যাদা বলে আর কিছু থাকবে না। অন্য দেশে দৃষ্টান্ত আছে, সেখানকার সঙ্গে এই মনোভাবের কি আপনি কোনো মিল খুঁজে পাবেন? এটা তো অনির্বাচিত সংসদ, যদি নির্বাচিতও আসে, আর বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়, পর্যাপ্ত চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস যদি না থাকে, তাহলে সটা বিরাট আশঙ্কার বিষয়। ভারতে দেখুন, সেখানে একটা অপসারণের প্রক্রিয়ায় কতগুলো ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই যত দিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে উন্নত না হবে, তত দিন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণ সংসদের কাছে ন্যস্ত করা অত্যন্ত নাজুক হবে।
দৈনিক প্রথম আলো : কিন্তু যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বা রাজনৈতিক বিবেচনায় একজন সাংসদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তেমন বা তার কাছাকাছি প্রক্রিয়ায় সব সাংবিধানিক পদেই তো নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজ এ দেশে গড়ে উঠেছে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন : সে জন্যই তো আমরা বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুদ্ধ করা নিয়ে সব সময় সরব থেকেছি। এখানে যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতি না থাকে। কিন্তু তাঁরা নিয়োগ-সংক্রান্ত আইন না করে হঠাৎ অপসারণ আইন করার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। অথচ বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ-দুটোই কিন্তু অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যদি আমরা উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে অপসারণের প্রশ্ন আসবে না। অযোগ্য ও অদক্ষ বিচারকদের মধ্যেই অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অসদাচরণ লক্ষ্য করা যায়। আর এটা দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের বিচার বিভাগ আজ অনেকটাই মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা সব সময় যেন একটা রাজনৈতিক ছায়ার মধ্যে থাকছেন।
দৈনিক প্রথম আলো : কাউন্সিলের দ্বারা তদন্ত শুরু করতে প্রধান নির্বাহীর পূর্বানুমোদন লাগত, ১৯৭৭ সালে জিয়ার আনা এই বিধান কি বিচার বিভাগের জন্য সৌভাগ্যজনক ছিল?
খন্দকার মাহবুব হোসেন : এটা আমার ঠিক নজরে আসেনি।
দৈনিক প্রথম আলো : ঠিক তা-ই। ষোড়শ সংশোধনীতে বিলোপ করা ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল তদন্ত শুরু করতে একা প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী ছিল। তাহলে বলুন, তার থেকে একটা সমষ্টিগত সংসদীয় প্রক্রিয়া উন্নত নয় কেন? আর ষোড়শ সংশোধনী বহাল রেখেও যদি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত করা হয়, তাহলে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ