ঢাকা, বুধবার 23 August 2017, ০৮ ভাদ্র ১৪২8, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

জিবলু রহমান : [ছয়]
খন্দকার মাহবুব হোসেন : সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তদন্ত কমিটিতে এমন সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে পারে না, যাঁদের কোনো শপথ নেই। বিচারক অপসারণের তদন্তে প্রধান বিচারপতিকে রাখতেই হবে। আবার সংসদে যখন দুইতৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না, তখন ​িক হবে? বিচারক নিয়োগেও দেখুন, আমরা যতই যা বলি প্রধানমন্ত্রীর অমতে কিছু কিন্তু হয় না। তাই বিচার বিভাগকে স্বাধীন করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর সর্বময় ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। এখানে সংশোধনী না আনা হলে আমরা যা-ই করি না কেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ওই নির্বাহী ক্ষমতাটা বিচারকদের মাথার ওপরই থেকে যাবে।
সংসদের মাধ্যমে বিচারক অপসারণ আইনের (সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী) কোনো প্রয়োজন ছিল না। কেননা, এ আইনের ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে রাজনৈতিক বিবেচনা ও অশুভ উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্যরা বিচারকদের অপসারণ করতে চেষ্টা করার সুযোগ ছিল। এতে বিচারকদের ওপর একটি অশুভ চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যম তৈরি করা হয়। যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্তরায়। আবার সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও এ প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না। এতে করে জটিলতাও বাড়তো।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল প্রশ্নে সরকারি দলের নেতা, মন্ত্রীরা যেভাবে কথা বলেছেন, তা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি জঘন্য আক্রমণ। এটি সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা। তারা তো হাইকোর্টের রায়ের পর (সরকারি দলের সংসদ সদস্য) বলেছিলেন, সংসদ থেকে কোনো আইন পাস হলে তা নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের নেই। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ৭ মে ২০১৬)
কিন্তু অতীতে সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তমসহ বেশ কিছু সংশোধনী বাতিল বলে ঘোষণা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এখতিয়ার না থাকলে সর্বোচ্চ আদালত এগুলো কিভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করে? এখন এ ইস্যুতে সংসদ ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি হলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। যেহেতু বিষয়টি এখনো রিভিউ আইনি প্রক্রিয়াধীন এবং সরকার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলেছে, সেখানে উচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে এভাবে আক্রমণাত্মক কথা বলা শোভনীয় নয়। এটি আইনি বিষয়। তাই এ নিয়ে উচ্চবাচ্য না করে এটি আইনিভাবেই মোকাবিলা করা উচিত।   
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় নিয়ে ৫ মে ২০১৬ উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছিল জাতীয় সংসদের অধিবেশন।
স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে দিনের কার্যসূচি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট অব অর্ডারে জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম হাইকোর্টের রায় নিয়ে বক্তব্য দেন। ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। এখনো বিশ্বাস করি, বিচার বিভাগ স্বাধীন। সে কারণে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। আইনি পথেই যাব, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করব না।’
হাইকোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংবিধানের এই সংশোধনী এনেছি। কিন্তু ওনারা (হাইকোর্টের বিচারকেরা) রায়ে বলে দিলেন, এটা অবৈধ। এখনো আমি বলি, এটা মোটেও অবৈধ নয়। ওনারা যেটা বলছেন, সেটাই বরং গ্রহণযোগ্য নয়।’
আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারপতিদের সম্মান অক্ষুণœ রাখার জন্যই সরকার ষোড়শ সংশোধনী এনেছে। তিনি বলেন, মূল সংবিধানের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা চলে না।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির সদস্যরা তুমুল হইচই শুরু করলে তিনি কিছুটা দৃঢ় কণ্ঠেই বলেন, ‘দিস ইজ নট দ্য লাস্ট ডিসিশন (এটা শেষ সিদ্ধান্ত নয়)...আপিল করলে এ সিদ্ধান্ত থাকবে না।’
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এ সংসদ সার্বভৌম। আমরাই বিচারপতিদের নিয়োগ দিয়েছি। হাইকোর্ট সংসদ-প্রণীত আইন বাতিল করলে এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হবে। এটা হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘সামরিক শাসনামলে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন ও বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় করা হয়েছিল। এখন সে সুযোগ নেই। এখন কাউকে অপসারণ করতে হলে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। হাইকোর্টের এ রায়ে আমরা দুঃখিত, ব্যথিত ও মর্মাহত।’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যাঁরা বিচারক, তাঁদের আমরা চিনি, জানি। আমরা ক্ষমতায় বলেই তাঁরা বিচারক হয়েছেন। তাঁরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন, তা আমরা প্রত্যাশা করি।’ তিনি বলেন, ‘একজন বিচারপতি আরেকজন প্রধান বিচারপতির বিরোধিতা করছেন। এটার অবসান হওয়া উচিত।’
শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘এ রায়ের পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। রাষ্ট্রপতি অপরাধ করলে সংসদ তাঁকে অপসারণ করতে পারলে বিচারপতিরা কোথা থেকে এসেছেন যে তাঁদেরটা করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর আইন যদি আমরা পাস না করি, তাহলে তাঁরা কি এ আইন পাস করতে পারবেন?’
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারের সূত্রপাত করে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, ‘সংসদে যে আইন পাস করা হয়, তা যদি একটার পর একটা অবৈধ হয়ে যায়, তাহলে তো আইনসভার কোনো মর্যাদা থাকে না। এভাবে সংসদে পাস করা আইন বিচার বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করলে সাংসদেরা ছিনিমিনি খেলার বস্তুতে পরিণত হবেন। এ রকম চলতে থাকলে সংসদে যে আইন পাস হবে, তা-ই অবৈধ হয়ে যাবে।’
একই দলের কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘এই সংসদে পাস করা আইন যদি অবৈধ হয়ে যায়, তাহলে তারা (বিচারকেরা) আইন করুক। আমাদের দিয়ে পাস করিয়ে নিক।’
জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘বিচার বিভাগকে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁরা ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন কি না, জানি না। মূল সংবিধানে যেটা ছিল, সংসদ সেটাই পুনঃস্থাপন করেছে। তাহলে এটাকে বিচার বিভাগ কী করে অবৈধ বলে দেন?’ তিনি বলেন, ‘এ রায় দেয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন, যেটা একান্তই অনভিপ্রেত।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৬ মে ২০১৬)
আদালতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় ক্ষুব্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৪ আগস্ট ২০১৭ দুপুরে সিলেটে প্রস্তাবিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আবার সংসদে এটা পাস করব এবং অনবরত করতে থাকব। দেখি জুডিশিয়ারি কত দূর যায়।’ অর্থমন্ত্রী কারও নাম উল্লেখ না করে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘মানুষের প্রতিনিধিদের ওপর তারা খবরদারি করবে? তাদের আমরা চাকরি দিই।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৫ আগস্ট ২০১৭)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ