ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রভাবশালীদের প্রভাবে জলবায়ু প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি

স্টাফ রিপোর্টার : প্রভাবশালীদের প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ছয়টি প্রকল্পের চারটিতেই অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলেছে, এই প্রকল্পগুলোর একটিতে একজন সচিব, একটিতে ক্ষমতাসীন দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক এক মন্ত্রীর আত্মীয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাকি দুটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রভাব খাটিয়েছেন। এ অবস্থায় জলবায়ু প্রকল্পে সুশাসন তথা কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জনঅংশগ্রহণসহ ১৪ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। 

গতকাল বুধবার সকালে সংস্থাটির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে ‘জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরেন ক্লাইমেট ফাইন্যাস গর্ভনেন্স (সিএফজি) ইউনিটের প্রোগ্রাম ম্যানেজার গোলাম মহিউদ্দিন। উক্ত গবেষণায় আরো সংযুক্ত ছিলেন একই ইউনিটের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মহুয়া রউফ এবং এসিসটেন্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাজু আহমেদ মাসুম। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা এবং ক্লাইমেট ফাইন্যাস গর্ভনেন্স (সিএফজি) ইউনিটের সিনিয়র প্রোগ্রাম মানেজার এম জাকির হোসেন খান। গবেষণাটি মার্চ ২০১৫ - জুলাই ২০১৭ সময়কালে পরিচালিত হয়েছে। এই গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) তহবিলের অর্থায়নে বাস্তবায়িত পাউবো-এর ছয়টি জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সকল পর্যায় - প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। 

টিআইবি জানায়, তারা ছয়টি প্রকল্প গবেষণার জন্য ঠিক করি,তার চারটি প্রকল্পেই প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদন দেয়ার মতো অনিয়ম পাওয়া গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বড় প্রকল্পগুলো পাউবো বাস্তবায়ন করে থাকে বলে এগুলোকে বাছাই করার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে টিআইবি। পাউবো এ খাতে চলমান প্রকল্পের মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা মোট অর্থায়নের ৪০ শতাংশ।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ এবং বিসিসিটিএফ-এর প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্দেশিকাতে তথ্যবোর্ডে কোনো কোনো বিষয় সংযুক্ত করতে হবে এবং তথ্যবোর্ড স্থাপনের সময়সীমা ও রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। এছাড়া বিসিসিটিএফ এবং পাউবো-এর কোনো আইন / নির্দেশিকায় কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা ও তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন প্রকল্প নজরদারি ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। পাউবো’র স্থানীয় অফিসের কর্মকর্তা ছয়টি প্রকল্পেই পরিদর্শন করেছেন, তবে এই তদারকি সংক্রান্ত কোনো লিখিত প্রতিবেদন নেই। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ দল এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষন এবং মূল্যায়ন বিভাগ কর্তৃক গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পেই পরিবীক্ষণ করা হয়নি। বিসিসিটিএফ কর্তৃক ছয়টি প্রকল্পের শুরুতে ও শেষাংশে কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়েছে, তবে সমাপ্তির পর মূল্যায়ন হয়নি। কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের কার্যালয়ের নিরীক্ষা দল কর্তৃক গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পেই নিরীক্ষা করা হয়নি। গবেষণায় কার্যকর অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতিও চিহ্নিত করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার যে সকল চ্যালেঞ্জসমূহ পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় পাউবো’র একটি স্থানীয় কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকতা নেই; জরিপে অংশগ্রহণকারি প্রায় ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি সম্পর্কে জানেন না; প্রকল্প এলাকায় তথ্যবোর্ড স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি এবং তথ্যবোর্ডে অপর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ ইত্যাদি। 

আলোচ্য ছয়টি প্রকল্পের কোনোটিতেই জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। কোনো প্রকল্পেই স্থানীয় প্রকল্প প্রণয়ন বিষয়ক সভা করা হয়নি; প্রকল্পের উপকারভোগি, প্রকল্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কোনো সামাজিক মূল্যায়ন হয়নি। এছাড়া গবেষণাধীন কোনো প্রকল্পের তদারকিতে স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল না এবং প্রকল্পের কাজের মান সম্পর্কে উপকারভোগি / স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে বিদ্যমান নির্দেশিকা সম্পর্কে না জানা এবং জানলেও আমলে না নেয়া দুটি বিষয়ই পরিলক্ষিত হয়েছে। 

পাউবো কর্তৃক বাস্তবায়িত জলবায়ু প্রকল্পসমূহে সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। জলবায়ু প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ উন্নয়ন বাজেটের প্রকল্পের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় ব্যবস্থাপনার দিক থেকে গুরুত্ব কম পাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন অংশীজনদের যোগসাজশে অনিয়ম। অর্থায়নকারি সংস্থা এবং পাউবো’র কোনো আইন / নির্দেশিকায় কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার নির্দেশনা নেই যা জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন; তথ্যের স্বপ্রণোদিত উন্মুক্ততা এবং চাহিদাভিত্তিক তথ্য প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি; জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিষ্ক্রিয়তা এবং সমন্বয়ের ঘাটতি; শুদ্ধাচার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। যার প্রভাব ঠিকাদার নিয়োগ, ঠিকাদার কর্তৃক কাজের মান প্রভৃতির উপর পড়েছে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সহায়ক পরিবেশ হিসেবে কাজ করছে; পানিসম্পদ খাতের প্রকল্পসমূহে জনঅংশগ্রহণের আইন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পে স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিচালিত জলবায়ু প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও, সার্বিক বিবেচনায় শুদ্ধাচার, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। তথ্যের উন্মুক্ততার ব্যাপারে আইনী বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়েছে এবং প্রকল্পসমূহের গুণগত মানও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বাংলাদেশ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে টিআইবি কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশসমূহ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। 

ড. ইফতেখার আরো বলেন, প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় শুদ্ধাচার চর্চার ক্ষেত্রে দেখা গেছে গবেষণাধীন ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্পই অনুমোদনের সময় বিভিন্ন পর্যায় থেকে সুপারিশ এবং প্রভাব খাটানো হয়েছে বলে তথ্যদাতারা জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি প্রকল্পে জনৈক সচিব, একটি প্রকল্পে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা, প্রাক্তন মন্ত্রীর আত্মীয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) এবং দুটি প্রকল্পে স্থানীয় এমপি প্রভাব খাটিয়েছেন বলে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন।

গবেষণায় আইনী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শুদ্ধাচার এবং জনঅংশগ্রহণ বিষয়ে ১৪ দফা সুপারিশ উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তথ্যবোর্ডে কোনো কোনো বিষয় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তথ্যবোর্ড স্থাপনের সময়সীমা প্রভৃতি বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি; বিসিসিটিএফ-এর আইন ও পাউবো’র সংশ্লিষ্ট আইন পরিমার্জন করে অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থা এবং তৃতীয় পক্ষের তদারকির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা; পাউবো’র ওয়েবসাইটে প্রকল্প প্রস্তাবনা, নিরীক্ষা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং প্রকল্প এলাকায় দরপত্র, প্রকল্প নকশা, বাস্তবায়নকৃত এলাকা, বাজেট ইত্যাদি তথ্যবোর্ড ও নাগরিক সনদের মাধ্যমে উন্মুক্ত করা এবং চাহিদাভিত্তিক তথ্য প্রদান ব্যবস্থা কার্যকর করার মাধ্যমে প্রতিটি স্থানীয় কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ। এছাড়া জলবায়ু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সমন্বয়ে একটি কার্যকর অভিযোগ নিরসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা; জলবায়ু ঝুঁকি ও বিপদাপন্নতা যথাযথভাবে যাচাই করে তার ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদন নিশ্চিত করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ