ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বনানী কবরস্থানে চির শয্যায় ঢালিউড মহানায়ক রাজ্জাক

গতকাল বুধবার বনানী কবরস্থানে নায়ক রাজ রাজ্জাকের দাফন করা হয় -সংগ্রাম

সাদেকুর রহমান : রাজধানীর বনানী কবরস্থানে চিরশয্যায় শায়িত হলেন ঢালিউড মহানায়ক রাজ্জাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা সদ্য মরহুম নায়করাজ রাজ্জাকের মেজো ছেলে বাপ্পী কানাডা থেকে গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকায় ফেরার পর সকাল সোয়া ১০টার দিকে অশ্রুসিক্ত পরিবার-পরিজন, সহকর্মী ছাড়াও অগণিত ভক্ত-শুভাকাংখীদের উপস্থিতিতে তাকে দাফন করা হয়েছে। এদিকে, কোটি বাঙালির নায়ক স্মরণে পরিবারের পক্ষ থেকে আগামীকাল কুলখানি ও পরশু শনিবার নায়করাজের প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। 

বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন ৭৫ বছর বয়সী রাজ্জাক। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে তার মৃত্যু হলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্য ছাড়াও শোক-বিহ্বল হয়ে পড়ে তিন প্রজন্মের সহকর্মী ও সিনেমাপ্রেমীরা। পাঁচ শতাধিক বাংলা ও উর্দূ চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে খ্যাত ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক নামে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাদা কালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে রূপালী পর্দা থেকে লাখো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন তিনি।

আগের দিন মঙ্গলবার যেমন বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে লাখো ভক্ত-শুভানুধ্যায়ী অশ্রু আর ফুল হাতে নিয়ে প্রিয় নায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তেমনি গতকালও তুমুল বৃষ্টিকে তুচ্ছ করে রাজ্জাককে শেষ বিদায় দিতে বনানী কবরস্থান এলাকায় জন¯্রােত নামে। পাঁচ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন শাসন করে যাওয়া এই অভিনেতাকে যখন ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কবরে শোয়ানো হয়, তিন ছেলে রেজাউল করিম বাপ্পারাজ, রওশন হোসাইন বাপ্পী ও খালিদ হোসাইন স¤্রাট, আত্মীয়-বন্ধু আর চলচ্চিত্র অঙ্গনের কলা-কুশলীরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। 

মঙ্গলবার সকালে রাজ্জাকের কফিন নেয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল এফডিসিতে। সেখানে জানাজার পর দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ কিংবদন্তী এই অভিনেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়। ওই দিন বিকেলে গুলশানের আজাদ মসজিদে জানাজার পর রাজ্জাককে দাফন করার কথা থাকলেও কানাডাপ্রবাসী মেজো ছেলে বাপ্পীর ফেরার অপেক্ষায় সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়। টার্কিশ এয়ারওয়েজের একটি বিমানযোগে ভোর ৪টায় ঢাকায় পৌঁছানোর পর শেষবার বাবাকে দেখার সুযোগ হয় বাপ্পীর।

গতকাল সকালে বৃষ্টির মধ্যেই ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘর থেকে রাজ্জাকের লাশ বনানী কবরস্থানে নিয়ে আসেন তার তিন ছেলে। তাদের সঙ্গে আসেন চিত্রনায়ক উজ্জ্বল, শাকিব খান, ফেরদৌস, জায়েদ খান, চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়াকিল আহমেদ ও প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু।

দাফন শেষে রাজ্জাকের ছোট ছেলে স¤্রাট বলেন, আমার বাবা আমার হাতেই মারা গেছেন। তিনি বড় শান্তিতেই চলে গেছেন। পরে সমবেতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার বাবা জানা-অজানায় যদি কারও মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে ক্ষমা করবেন। সকলে দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তার কবরের আজাব ক্ষমা করে দেন।

বাপ্পী বলেন, বাবাকে নিয়ে আমাদের গর্ব হয়। তার মৃত্যুতে সারা দেশের মানুষ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমরা গোটা পরিবার বড় কৃতজ্ঞ।

চলচ্চিত্র পরিবারের পক্ষে অভিনেতা শাকিব খান বলেন, অভিনেতা রাজ্জাক ছিলেন গোটা বাঙালির সম্পদ। তার মৃত্যুতে এ দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে ক্ষতি হল, তা অপূরণীয়। তার মৃত্যুর পর যত নায়ক বা সুপারস্টার আসবেন, তার সবাই তার আদর্শকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাবেন।

বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করেই প্রিয় ‘নায়করাজ’-এর কবরে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, কেউবা শ্রমজীবী মানুষ। হবিগঞ্জ থেকে আসা ব্যবসায়ী টুটুল দাশ, গাজীপুরের কালীগঞ্জের হাফেজ ফরহাদ হোসেন, স্কুলছাত্র মঈন ও জসিম, বংশালের ব্যবসায়ী হাজী মো. হোসেনকে কবরের পাশে বসে চোখ মুছতে দেখা যায়।

 ‘রাজ্জাক-ভক্ত’ ষাটোর্ধ্ব এম এম সাহেদ মাহমুদ বলেন, রাজ্জাক চলে গেলেও বাংলার মানুষ তাকে বাঁচিয়ে রাখবে তাদের মনে। রাজ্জাকের মৃত্যু নাই।

অভিনেতা রাজ্জাকের রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনে চাকরিরত মিজানুর রহমান বিমর্ষ কণ্ঠে বলেন, হাসিমাখা মুখটি আর কোনোদিন দেখতে পাব না।

অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজ্জাকের জন্ম। টালিগঞ্জের খানপুর হাইস্কুলে পড়ার সময় নাটকের মধ্যে দিয়ে অভিনয় শুরু। কলেজে পড়ার সময় ‘রতন লাল বাঙালি’ নামে একটি সিনেমার অভিনয় করেন তিনি। অভিনেতা হওয়ার মানসে ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমালেও সেখানে সফল না হওয়ায় টালিগঞ্জে ফেরেন রাজ্জাক। কিন্তু কলকাতায়ও পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন।

১৯৬৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে অভিনয়ের সুযোগ নেন রাজ্জাক। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি তবে নায়ক হিসেবে নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে।

সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। এক সময় জহির রায়হানের নজরে পড়েন রাজ্জাক। তিনি ‘বেহুলা’য় লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ দিলেন রাজ্জাককে, সুচন্দার বিপরীতে। ‘বেহুলা’ ব্যবসাসফল হওয়ায় আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে।

সুদর্শন রাজ্জাক সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দেন ঢালিউডকে। এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেছেন তারা। ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’ এবং স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্র উপহার দেন এই জুটি। বদনাম, সৎ ভাই, চাপা ডাঙ্গার বউসহ প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক। তার মালিকানার রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। রাজ্জাক অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘কার্তুজ’, পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘আয়না কাহিনী’।

অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয় তাকে। ২০১৫ সালে তিনি পান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার। অভিনয় জীবনের বাইরে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক।

কুলখানি কাল ও শনিবার স্মরণসভা : এদিকে, না-ফেরার দেশে চলে যাওয়া এক কর্মবীর নায়করাজ রাজ্জাক স্মরণে কুলখানি আয়োজন করেছে রাজ পরিবার। অন্যদিকে এফডিসিতে আয়োজন চলছে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের।

গতকাল বনানী কবরস্থানে পিতা রাজ্জাককে অন্তিম শয়ানে রেখে এসে নায়করাজ পুত্র স¤্রাট জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে তার কুলখানি ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

শেষযাত্রায় ঢাকাইয়া সিনেমার হালের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে নায়করাজের দেহের ভার কাধে তুলে নেন শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানও। তিনি জানান, নায়করাজ রাজ্জাক স্মরণে আগামী শনিবার দিনভর আলোচনা সভা, কুরআন খতম, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে এফডিসিতে। চলচ্চিত্র পরিবারের পক্ষ থেকে এই আয়োজনটি করা হচ্ছে।

জায়েদ খান বলেন, ওইদিন সকাল ১০টায় এফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাব ভিআইপি অডিটরিয়ামে নায়করাজের কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনা, দুপুরে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া এফডিসি মসজিদে সকাল থেকে কুরআন খতম করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ