ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এনজিও ও ব্যাংকের কিস্তির চাপে দিশেহারা দিনাজপুরের বানভাসিরা 

মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দিনাজপুর ॥ “বানভাসিদের নিকট কিস্তির জন্য কোন এনজিও বা ব্যাংক চাপ দিতে পারবে না” প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন নির্দেশের পরও কিস্তির চাপে দিশেহারা দিনাজপুরের বানভাসিরা। দিনাজপুরের প্রায় সকল উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যাকবলিত। প্রায় ৬ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গতদের চিত্র ও সংবাদ পড়ে কেউ কেউ সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে আবার কেউ কেউ সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু মন গলছে না ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও (বেসরকারি সংস্থা) ও কিছু ব্যাংকের। এ অবস্থায় বানভাসিদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এনজিও ও ব্যাংক। বন্যায় ভেসে গেলেও, না খেয়ে থাকলেও এনজিও ও ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ আদায় কর্মীরা কিস্তির জন্য কসাইয়ের মতো আচরণ করছেন বানভাসিদের সঙ্গে। গতকাল বুধবার সরেজমিনে গিয়ে বানভাসিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ওই সব তথ্য।

জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিনাজপুর জেলায় বন্যা দূর্গতদের ত্রাণ দিতে এসে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, এনজিও এবং ব্যাংক ঋণ দিয়েছেন, ভালো কথা। কিন্তু এখন বন্যার্ত এলাকায় ঋণের কিস্তি আদায়ে কাউকে চাপ দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশের কোনই তোয়াক্কা করছে না জেলার এনজিও এবং ব্যাংকগুলো। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো গ্রামে গ্রামে সমিতি গঠন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবলেও এনজিওর কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন। কিস্তির টাকা না পেয়ে অনেকের বাড়ি থেকে গরু-ছাগলও কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে সুদের ওপর টাকা নিয়ে কিস্তি দিচ্ছে অনেকে। অনেকে আবার ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকছে। বন্যার সময়ে এনজিও কর্মীদের এমন অমানবিক আচরণে সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শহরের সুইহারী ড্রাইভারপাড়া এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িঘরে বন্যার পানি উঠেছে। ঘর ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে এক বেলা খেয়ে জীবন পার করছে পরিবারগুলো। এমন অবস্থায় কিস্তির টাকার জন্য হাজির হন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মীরা। কিন্তু কিস্তির টাকা দিতে না পারায় বিশাল হাঙ্গামার সৃষ্টি হয়। তারা কিস্তি নিয়েই যাবেন। তা না হলে আগামী সপ্তাহে দুই সপ্তাহের কিস্তি দিতে হবে। এ নিয়ে ঋণগ্রহীতা একজন বলেন, ‘ঋণ আদায় কর্মীরা এক-একটা আজরাইল। আমরা মরলাম কি বাঁচলাম তা তারা দেখে না। তাদের কিস্তির টাকা দিতেই হবে। তাদের ব্যাংক থেকে ১০ হাজার ঋণ নিছিলাম। সাপ্তাহে ৫০০ টাকা কিস্তি দেয়া লাগে। বন্যায় কামাই-রোজগার না হওয়ার কারণে কিস্তির টাকা জোগাবার পারি নাই। অনেক অনুরোধ-বিনিরোধ করেও শেষে আগামী সপ্তাহে দুই সপ্তাহের টাকা দিতে হবে এমন বলেছে।’ ওই এলাকারই আরেকজন জানালেন, ‘পানির মধেই এনজিও কর্মী কিস্তির জন্য বাড়িতে আসছে। কিস্তি ছাড়া বাড়ি ছাড়ে না। তাও আবার অগ্রিম এক কিস্তির টাকাও চায়। ঈদের ছুটিতে ওই কর্মী বাড়ি যাবে, তাই আগে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে।’ তারা জানান, একদিকে ঘরে খাবার নেই, অন্যদিকে কিস্তির টাকার চাপ। এ নিয়ে বানভাসিরা এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছে। একই চিত্র জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও। চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনজিও কর্মী ও ব্যাংকের কর্মীরা ঋণের টাকার জন্য প্রচন্ড চাপ দিচ্ছেন। তারা বলছেন-টাকা না দিলে আপনাদের ঈদ আমাদের ঈদ দু’টোই হবে না। ঈদের আগেই কিস্তি দিতে হবে। কিস্তি পরিশোধ করেই ঈদ করতে হবে। এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দিনাজপুর শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, আমাদের ঋণ গ্রহিতারা আমাদের পরিবারের সদস্য। বন্যার সময় আমরা তাদের কাছে কিস্তি আদায়ে নয়, বরং খোঁজ নেয়ার জন্য গিয়েছি। তারা স্বাভাবিকভাবেই কিস্তি প্রদান করছেন। আমাদের পক্ষ থেকে কোন চাপ নেই। কিস্তি নিয়ে কোন সমস্যাও নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ