ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে বৈধ হাটের সাথে বসছে অবৈধ পশুর হাটও

গাবতলী গরুর হাটে গরু আসতে শুরু করেছে। ক্রেতা সমাগম কম

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এবার রাজধানীর গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটের পাশাপাশি দুই সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ২২টি অস্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু দুই সিটি কর্পোরেশনের ইজারা দেয়া পশুর হাটের বাইরে আরও অর্ধশত পশুর হাট বসানোর কার্যক্রম শুরু করেছে প্রভাবশালীরা। যেসব হাটগুলোর বৈধতা দেয়নি দুটি সিটি কর্পোরেশনের একটিও। তারা বলছে, অনুমোদন না নিয়েই ইতিমধ্যে অবৈধ হাট বসানোর কার্যক্রম শুরু করেছে ওই প্রভাবশালী মহল। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণের জুরাইন বালুর মাঠে একটি অবৈধ হাট বসানোর যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্থানীয় সরকার দলীয়রা। তাদের সাথে আছে স্থানীয় ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও। অভিযোগে প্রকাশ, এখানে হাট বসানোর মতো কোনো জায়গাই নেই। এ অবৈধ হাট বসানোকে কেন্দ্র করে বৈধ হাট ইজারাদারদের সাথে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। 

এছাড়া, ঐতিহাসিক গোলাপবাগ মাঠেও একটি হাট বসানোর কার্যক্রম শুরু করে ব্যানার পোস্টার করে প্রচারণা চালাচ্ছে ডিএসসিসির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর‘র নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। অথচ এ ধরনের কোনো হাটের ইজারাই দেয়নি ডিএসসিসি। এভাবে দুই ডিসিসি এলাকায় অর্ধশত ছোট-বড় হাট বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। 

প্রতি বছরই দুই ডিসিসির নির্ধারিত পশুর হাটের বাইরে যত্রতত্র অবৈধ হাট বসছে। এজন্য যানজটসহ নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে দরাজ গলায় বলা হলেও কার্যত: চোখে পড়ার মত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এবার অবৈধ পশুর হাট ঠেকাতে আদালত পর্যন্ত যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ভুক্তভোগীরাই।

গোলাপবাগ হাটের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ‘হাট! হাট! হাট! বিরাট গরু ছাগলের হাট। ঐতিহাসিক গোলাপবাগ মাঠ, ঢাকা’-এমনসব কথা লিখে ব্যানার পোস্টার করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এর নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। এখানেই থেমে নেই, বাঁশ-খুঁটিও স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন তারা। অবাক হলেও সত্য, এ হাটের অনুমোদন দূরে থাক, দরপত্রও আহবান করেনি ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। অবৈধ এ হাটের প্রচারপত্রে ইজারাদার হিসেবে আবুল কালাম আজাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ওইসব প্রচারপত্রে আরও বলা হয়েছে, এ হাটে ঈদের দিন পর্যন্ত গরু-ছাগল বিক্রি হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা দেবে, পানি-বিদ্যুৎ, থাকা-খাওয়া-গোসল, গরু উঠা-নামা এবং গাড়ি পার্কিংসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও প্রচারপত্রে হাজী মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, হাজী শহিদুল ইসলাম মিয়ন এবং মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলর ব্যতিত অন্যরা স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। 

গোলাপবাগ বাঁশ পট্টিতে অবৈধ হাট বসানোর বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় কাউন্সিলর বাদল সরদার বলেন, হাটটি অনুমোদনের জন্য ডিএসসিসিতে আবেদন করা হয়েছে। যতটুকু জেনেছি বরাদ্দ দেয়া হতে পারে। এ কারণে আমরা প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। শেষ সময়ে বরাদ্দ দেয়া হলে প্রচার ও হাট গোছানোর কাজ করা সম্ভব হবে না। তবে যদি অনুমোদন না পান তাহলে সবকিছু গুটিয়ে নেবেন বলে জানান। 

ইজারাদার হিসেবে পোস্টার ছাপানো আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা হাট ইজারা পাইনি, এটা সত্য। তবে শেষমুহুর্তে পেতেও পারি। এজন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। তবে না পেলে হাট বসাবো না।

জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এ বছর ১৩টি অস্থায়ী কোরবানির পশুরহাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ৯টি হাটের দরপত্র মূল্যায়ন সম্পন্ন করে ইজারাদার চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি চারটি হাটের তৃতীয় দফা পুনঃদরপত্রের টেন্ডার বাক্স খোলা হয়েছে সোমবার বিকালে। কিন্তু কোনো হাটেরই ন্যূনতম দর মিলেনি। এই অবস্থায় সরকারি হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। বিদ্যমান সর্বোচ্চ দামে মন্ত্রণালয় হাট ইজারার অনুমোদন দিলে হাটগুলো বসবে, নইলে বসবে না। কিন্তু এই অবস্থায় এ চারটি পশু হাট বসানোর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে হাট ইজারার পাওয়ার প্রত্যাশী প্রার্থীরা।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর দরপত্রের মাধ্যমে কদমতলির শ্যামপুর বালুর মাঠ এবং পোস্তগোলা শশ্মান ঘাট সংলগ্ন খালি জায়গায় দু’টি হাট ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। শ্যামপুর মাঠ এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং পোস্তগোলা শশ্মানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গার হাট ৩৫ লাখ ১৫ হাজার টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, এ দু’টি হাটের মাঝখানে ও খুব নিকটবর্তী জুরাইন বালুর মাঠ নাম ব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই অবৈধভাবে আরেকটি কোরবানির পশুরহাট বসানোর কার্যক্রম শুরু করছেন কদমতলি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছিম মিয়া। এ ব্যাপারে স্থানীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণায় শুরু করেছেন তিনি। মেয়রের অনুমতি নিয়ে এ হাট বসানো হচ্ছে বলেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জুরাইন রেলগেট সংলগ্ন বালুর মাঠ নামে যে জায়গাটিতে হাট বসানোর চেষ্টা চলছে সেখানে কোনো মাঠই নেই। এখানে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম হাসপাতাল আর দুই শতাধিক দোকানপাট রয়েছে। এখানে হাট বসলে মূল রাস্তায় ছাড়া গরু-ছাগল রাখার তেমন বড় কোনো জায়গা নেই। ফলে এখানে পশুহাট বসালে জনগণের চিকিৎসাব্যবস্থায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া, দোকান ও সড়কের হাট বসাল স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও বাসিন্দারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এই হাট বসলে বড় ধরনের সংঘর্ষেরও আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, জুরাইনের এ এলাকাটি ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। এ ব্যাপারে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী মো: মাসুদও কিছু জানেন না। তিনি বর্তমানে হজ পালনে সৌদি আরব রয়েছেন। বরং ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এখানে হাট বসানোর অপতৎপরতা চালানোয় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

পোস্তগোলা শিল্পাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং খালি স্থানে অবৈধ কোরবানি পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মিরা। খোঁজখবরে জানা গেছে, এ অবৈধ হাট বসানোর নেতৃত্বে রয়েছেন কদমতলী থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও ডিএসসিসির ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাসিম, কদমতলী থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী সোহেল ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শরিফ মোহাম্মদ আলমগীর। সরেজমিনে দেখা গেছে, পোস্তগোলা শিল্পাঞ্চল বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যানার, ফেস্টুন টাঙ্গিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাঁশ-খুঁটিও বসানোর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। 

এ বিষয়ে কাজী সোহেল বলেন, ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নেতৃত্বে হাট বসানো হচ্ছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। আমাকে কোনো দায়িত্ব দেয়া হলে আমি পালন করবো। আর কাউন্সিলর যে হাটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, সেটা অবৈধ হতে পারে না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ৫২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাসিম নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেন। 

ডিএসসিসি এবার ব্রাদার্স ইউনিয়ন বালুর মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গায় অস্থায়ী হাট বসানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনদফা দরপত্র আহবান করেও ন্যূনতম দর পায়নি ডিএসসিসি। এ কারণে হাটটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণলায়ে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ। এলজিআরডি মন্ত্রণালয় এব্যাপারে ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুই ধরনের সিদ্ধান্তই আসতে পারে। তবে ওই হাটের প্রত্যাশি ইজারাদারের লোকজন ইতিমধ্যে হাট বসানোর প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেছে। গেট তৈরির কাজ সম্পন্ন, বাঁশ-খুঁটিও লাগানো হচ্ছে। এসব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে তৎপরতা নেই ডিএসসিসির। এ ব্যাপারে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান আহমেদ বলেন, আমার এলাকায় অবৈধ হাট বসানোর কোনো সুযোগ নেই। ডিএসসিসি অনুমোদন না দিলে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হাট বসবে না। এছাড়াও তিনদফা দরপত্র আহ্বান করেও ন্যূনতম দর মিলেনি-কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকা, আরমানিটোলা খেলার মাঠ এবং সাদেক হোসেন খোকা মাঠসংলগ্ন ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল ও সংলগ্ন খালি জায়গা। সরেজমিনে ঘুরে এবং খোঁজখবরে জানা যায়, এ তিন হাট বসানোর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

শ্যামপুর বালুর মাঠের ইজারাদার মাসুক রহমান বলেন, আমরা বৈধভাবে টেন্ডারে অংশ নিয়ে ভ্যাটসহ এক কোটি ৬৮ লাখ টাকা দিয়ে হাটটি ইজারা নিয়েছি। কিন্তু এ হাটের মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে জুরাইন বালুর মাঠে একটি অবৈধ হাট বসানোর চেষ্টা হচ্ছে। পোস্তগোলা হাটটিও জুরাইন বালুর মাঠের খুব কাছাকাছি। এতে আমরা ব্যবসায়িকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, জুরাইনে বালুর মাঠে অবৈধভাবে হাট বসাতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অপতৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু এখানে বালুর মাঠের কোনো অস্তিত্বই নেই। এখানে হাট হলে তা রাস্তার ওপর বসবে। এতে জনস্বার্থ চরম বিঘœ ঘটবে। এ কারণে এখানে হাট বসানোর কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া এ হাটের সিটি করপোরেশনের কোনো অনুমোদন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আমি এ ব্যাপারে মেয়রের সাথেও কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, জুরাইনে কোনো হাটের ইজারা হয়নি। এখানে কোনো পশুহাট বসতে দেয়া হবে না।

একইভাবে ডেমরা মৃধাবাড়ি এবং ধানমন্ডির গ্রিনরোড সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের ২ নং ভবনের সামনের মাঠেও অবৈধভাবে হাট বসানোর পাঁয়তারা চলছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ সিটির প্রায় অর্ধশতাধিক এলাকায় কোরবানির পশুহাট বসানোর আবেদন আছে। কিন্তু জনস্বার্থে সব জায়গায় হাট বসানো সম্ভব নয়। এজন্য ১৩টি স্থানে হাট বসাতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, জুরাইনে কোরবানির পশুহাট বসানোর বিষয়ে আবেদন আছে। তবে এখানে হাট বসানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, যেসব হাটের এখনও ইজারা চূড়ান্ত হয়নি, সেসব হাটে যারা প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তাদের উচ্ছেদ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ