ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যায় ফসলের ক্ষতি ও করণীয়

এই সময়ে চলমান বন্যায় সারা দেশে ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের সকল আউশ ও আমনের আবাদ অনেক কম হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আউশ ও আমনের ক্ষেতের সঙ্গে তলিয়ে গেছে সবজির ক্ষেতও। এরও অশুভ প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে। বন্যায় সবজি ও ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও গভীর ভীতি ও আশংকার সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ কারণে। সে কারণ এর ঠিক পূর্ববর্তী ফসল বোরোর চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। বোরোর চাষাবাদ ক্ষাতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারত থেকে নেমে আসা বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত পানির কারণে। এই পানি হাওর এলাকার সব ফসল ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছিল দেশের বোরো ধানের চাষাবাদের ওপর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বোরোর উৎপাদন এবার ১০ লাখ টন কম হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য বলেছিল, ১০ লাখ টন নয়, উৎপাদন কম হয়েছে ২০ লাখ টনের। অন্যদিকে চালকল মালিক সমিতি এর পরিমাণ ৪০ লাখ টন বলে জানিয়েছিল। উৎপাদনের প্রকৃত পরিমাণ যেটাই হোক না কেন, এই সত্য স্বীকৃত হয়েছিল যে, এবার বোরোর উৎপাদন অনেক কম হয়েছে।
এদিকে বোরোর ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার আগেই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আউশ ও আমনের সব ক্ষেত। সরকারি হিসাবে জানানো হয়েছে, এ পর্যন্ত ৪০ জেলায় তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ছয় লাখ ৫২ হাজার ৬৫৪ হেক্টর। জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর আশা করেছিল, প্রতি হেক্টর জমিতে এবার সাড়ে তিন টন করে চাল উৎপাদিত হবে। সে হিসাবে তলিয়ে যাওয়া জমিতে অন্তত ২৩ লাখ টন চাল উৎপাদিত হবে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পরিধারণ ও মূল্যায়ন ইউনিট আমন ও আউশ মিলিয়ে এক কোটি ৫৮ লাখ টন চালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বন্যার কারণে আমন ও আউশের উৎপাদন কমপক্ষে ১০ লাখ টন কম হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
কৃষিবিদ ও অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বোরোর পরপর আমন ও আউশের উৎপাদনও বিপুল পরিমাণে কমে যাওয়ার ফলে দেশকে বড় ধরনের খাদ্য ঘাটতির কবলে পড়তে হবে। তারা এমনকি দুর্ভিক্ষেরও আশংকা করছেন। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেছেন, একদিকে লক্ষ্যমাত্রার চাইতে চাল এবার অনেক কম উৎপাদিত হয়েছে ও হতে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি গুদামে খাদ্যের মজুদ বিপদজনক পরিমাণে কমে যাওয়ায় অসৎ ও মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা চালের দাম কেবল বাড়িয়েই চলেছে। পরিসংখ্যানেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যেমন সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা যেখানে প্রায় ১৭ লাখ টন, সেখানে বর্তমানে চালের মজুদ রয়েছে মাত্র দুই লাখ ৯৫ হাজার টন। অথচ গত বছরের একই সময়ে মজুদ ছিল প্রায় সাত লাখ টন। এমন অবস্থায় সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং বাজারে মূল্য কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সরকার দুই দফায় আমদানি শৃল্ক কমিয়ে মাত্র দুই শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও চালের আমদানি যেমন বাড়েনি তেমনি কমেনি মূল্যও।
প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত জুলাই থেকে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত সরকার মাত্র ৪৬ হাজার টন চাল আমদানি করেছে। একই সময়ে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার টন। শুল্ক কমানোসহ সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির এই পরিমাণকে মোটেও উল্লেখযোগ্য বলা যায় না। তথ্যাভিজ্ঞ মহলে আশংকাও বাড়ছে একই কারণে। তারা মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে বন্যার পর চালের দাম কমে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। চালের দাম বরং বাড়তেই থাকবে। কিন্তু মানুষের হাতে টাকা নেই বলে তাদের পক্ষে চাল কিনে খাওয়া ও পরিবার সদস্যদের খাওয়ানো সম্ভব হবে না। পরিণতিতে দেশে খাদ্য সংকট হবে ভয়াবহ। দেশ এমনকি দুর্ভিক্ষের কবলেও পড়তে পারে।
এমন প্রায় নিশ্চিত ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবেলার উদ্দেশ্যে করণীয় সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছেন উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বোরোর পরপর আমন ও আউশের ফলনও নৈরাশ্যজনক হওয়ায় বেসরকারি পর্যায়ের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে চাল আমদানির পদক্ষেপ নেয়া এবং অন্তত ১০ লাখ টন চালের মজুদ গড়ে তোলা। কারণ, খাদ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে এই পরিমাণ খাদ্যের মজুদ থাকা দরকার। সরকারকে একই সাথে বন্যার পানিতে প্লাবিত সকল অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে ধানের বীজ ও সারসহ কৃষি উপকরণ বিতরণের পদক্ষেপ নিতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারক ও ব্যসায়ীদের ব্যাপারেও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। কারণ, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও কালোবাজারীরাই সাধারণত মানুষের বিপদ বাড়ায়। সরকারকেও তারাই বেকায়দায় ফেলে। সুতরাং চালের আমদানি থেকে বাজারে নজরদারি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সুচিন্তিতভাবে এমন সুশৃংখল ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী বা মহলের পক্ষেই চালসহ খাদ্যের মূল্য বাড়ানো এবং সংকট সৃষ্টি করা সম্ভব না হয়। দেশও যাতে দুর্ভিক্ষের কবলে না পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ