ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দূর হোক প্রশ্রয়-বলয়ের আপদ

‘বেতাগীর মানুষ ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত’- সংবাদপত্রে এমন শিরোনামের সঙ্গত কারণ আছে। বরগুনার বেতাগী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষককে স্কুলেরই একটি কক্ষে স্বামীর সামনে ধর্ষণের ঘটনার আলামত মিলেছে ডাক্তারি পরীক্ষায়। তবে এ ঘটনায় এখনো (২০/৮/২০১৭) ছয় আসামীর কেউ ধরা পড়েনি। তারা এলাকায় প্রভাবশালী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত। আসামীদের না পেয়ে পুলিশ দুই আসামীর দুই পিতাকে আটক করেছে। তারা হলেন আসামী রাসেলের বাবা আবদুল হাকিম ও সুমন কাজির বাবা আবদুল কদ্দুস কাজি।
গত ১৭ আগস্ট বিদ্যালয়ের কক্ষে শিক্ষকের উপর বর্বর নির্যাতনের ঘটনায় এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত। শনিবার ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম ছিল। পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী বলেছে, ‘ওই ঘটনার পর থেকে স্কুলে যেতে ভয় লাগছে।’ এলাকার লোকজন বলছেন, এ ঘটনায় তারা লজ্জিত, ক্ষুব্ধ। আসলে ‘ভয়’, ‘লজ্জা’, ‘ক্ষোভ’ শব্দাবলী দ্বারা ওই বর্বর ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। এমন প্রেক্ষাপটে কেউ যদি প্রশ্ন করে এই সমাজে আমাদের কোন প্রয়োজন আছে কী, তাহলে তাকে কোন দোষ দেয়া যাবে কী? আসলে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য হজম করার জন্য তো মানুষ সমাজবদ্ধ হয়নি। সমাজে যখন দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য চলে তখন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় সমাজপতিদেরও। একটি দেশে সরকার থাকবে, পুলিশ ও প্রশাসন থাকবে; তারপরও সাধারণ মানুষের ওপর চলবে দুর্বৃত্তদের বর্বর নির্যাতনÑ এমন চিত্রতো মেনে নেয়া যায় না। বর্বর ওই ঘটনার পর নির্যাতিতা শিক্ষক ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন। তারা ভয়ে মামলা চালাতেও চাইছেন না। নিরাপত্তায় বিদ্যালয়ে ও বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করলেও তাদের আতঙ্ক কাটছে না। পুলিশের এই বিশেষ ব্যবস্থা  তো সাময়িক, কিন্তু এরপর? সমাজে আইন যদি তার স্বাভাবিক পথে চলতে না পারে, পুলিশ ও প্রশাসনের মাধ্যমে যদি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন না হয়; তাহলে সাধারণ নাগরিকের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কেমন করে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়Ñ মামলার ছয় আসামী সুমন বিশ্বাস (৩৫), রাসেল (২৪), সুমন কাজি (৩০), মোঃ রবিউল (১৮), হাসান (২৫) ও মোঃ জুয়েল (৩০) বৃহস্পতিবার বিকালেই এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দেয়। এলাকার লোকজন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এরা এলাকায় নেশাদ্রব্য বিক্রি ও সেবন এবং সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সুমন বিশ্বাস স্থানীয় হোসনাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রভাবশালী ইউপি সদস্য মন্টু বিশ্বাসের চাচাতো ভাই এবং তার মোটরসাইকেলের চালক। আওয়ামী লীগে কোন পদ-পদবি না থাকলেও মন্টু বিশ্বাস এলাকায় সরকারি দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি বেতাগী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবুল আকতারের খালাতো ভাই। মূলত মন্টু বিশ্বাসের মদদেই সুমন ও তার সহযোগীরা নিজেদের আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে হোসনাবাদ ইউনিয়নে নানা অপকর্ম করে বেড়ায়। তাদের ভয়ে এলাকার লোকজন মুখ খোলার সাহস পায় না। পত্রিকার প্রতিবেদনে ওদের অপকর্মের ব্যাপারে আরো কিছু তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তা উল্লেখ না করে আমরা এখানে বলতে চাই, পদ-পদবি ধারণ করে কিংবা ক্ষমতাবানদের আশপাশে থেকে যারা অপকর্ম করে যাচ্ছে তারা তো এক ধরনের প্রশ্রয় বলয়ে আছে। প্রশ্রয় না পেলে কোন সমাজে দুর্বৃত্তরা বর্বর কর্মকা- করার সাহস পেত না। বরং সাধারণ মানুষই তাদের মোকাবিলায় যথেষ্ট হতো। দুর্বৃত্তরা ক্ষমতাবানদের প্রশ্রয় পাওয়ায় সমাজে শক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপরাজনীতির দীর্ঘ সময়ে আমরা একই চিত্র লক্ষ্য করে আসছি। এমন যাতনা থেকে কি জনতার মুক্তি নেই?
বেতাগীর স্কুলে শিক্ষিকাকে ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে। সবাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চায়, চায় অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার। তবে প্রশ্রয়-বলয়ে থাকার কারণে অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার সম্ভব হবে কিনা তেমন আশঙ্কাও আছে। ভিকটিমের পরিবার তো মামলা চালিয়ে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা যে অমূলক কিছু নয়, তেমন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। ‘সত্য চাপা দেয়ার চেষ্টা!’ শিরোনামে একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। ২১ আগস্ট প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়, বেতাগীর স্কুলে শিক্ষিকাকে ধর্ষণের ঘটনায় ডাক্তারি পরীক্ষায় বলা হয়েছে, তাকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সত্য চাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের শিকার শিক্ষিকা ডাক্তারি পরীক্ষার এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২০ আগস্ট তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এটা অসম্ভব। যদি এটা হয় তাহলে বলবো, ফলাফল উল্টে দেয়া হয়েছে। আমি শতভাগ নিশ্চিত, পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত প্রমাণিত হবে।’ এই প্রসঙ্গে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক আজমিরি বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ধর্ষণের বিষয়ে নারীর পারিপার্শ্বিক নানা বিষয় জড়িত থাকে। এজন্য এটা ধর্ষণ কিনা, সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না। তবে তার হাতে ও গালে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।’ অথচ ধর্ষণের আলামত পরীক্ষাকারী এই চিকিৎসক ১৯ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় সম্ভবত ধর্ষণের আলামত মিলেছে।’
স্থানীয় শিক্ষক সমিতির নেতা, শিক্ষিকার পরিবার ও এলাকার সচেতন মহল ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা বলেছেন, আসল সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে অপরাধীদের রক্ষার জন্য ধর্ষণের আলামত গোপন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বেতাগী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি তিনদিনের কর্মূচি ঘোষণা করেছে। উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটাকে পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি পুনরায় ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান। এলাকার সচেতন নাগরিকরা ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনে বিস্মিত। তাঁরা বলছেন, একটি মহল শুরু থেকেই এ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। ধর্ষণের এতবড় একটি ঘটনা ঘটলো অথচ ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেল না, এটা বিস্ময়কর ও সন্দেহজনক। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
আমরা জানি, সমাজে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা খুবই কম। তারপরও তারা দাপটের সাথে অপরাধমূলক নানা কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্রয়-বলয়ের কারণেই তাদের দৌরাত্ম্য চলতে পারছে। এটা সুশাসনের লক্ষণ নয়। বেতাগীতে স্কুল শিক্ষিকার সাথে যে বর্বর আচরণ করা হয়েছে তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। দেশের মানুষ ওই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চায়। কিন্তু বিচারের ব্যাপারে ভিকটিমের পরিবার শুরুতেই যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সেটাই যেন সত্য হতে চলেছে। অভিযোগ উঠেছে, ধর্ষণের আলামত গোপন করা হয়েছে, সত্য চাপা দেয়ার চেষ্টা চলছে। যদি ক্ষমতাবানরা সত্য চাপা দেয়ার চেষ্টায় সফল হয়ে যান, তাহলে সুষ্ঠু বিচার সম্ভব হওয়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারের ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন প্রয়োজন। কোনো সমাজে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন না হলে, আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যায়। এমন সমাজ মানুষের বসবাসযোগ্য থাকে ন। আমরা তো এমন পরিস্থিতির জন্য সমাজবদ্ধ হইনি। উন্নত জীবনের যে মহান লক্ষ্যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে, সেই অভিযাত্রায় সংশ্লিষ্ট সবার এখন দায়িত্ব পালন প্রয়োজন। আলোচ্য ঘটনায় ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন ও সত্য চাপা দেয়ার ব্যাপারে যে অভিযোগ উঠেছে, সে ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পদক্ষেপ বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ