ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

জিবলু রহমান : [সাত]
ভারতের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে পাস করা সংবিধানের ৯৯তম সংশোধনী সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেন। সেই সংশোধনীতে কংগ্রেস ও বিজেপি একমত হয়েই বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারে কিছুটা নির্বাহী অংশগ্রহণ চেয়েছিল। শ্রীলঙ্কার প্রধান বিচারপতি ছিলেন শিরানি বন্দরনায়েক। প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে নানা রায় দিয়ে তিনি তাঁর রোষানলে পড়েন। দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাঁকে অপসারণ করা হয় ২০১৩ সালে। পরে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথসহ দেশি-বিদেশি নানা তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল অন্যায়ভাবে। নতুন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার আমলে অপসারণ খারিজ করে তাঁকে প্রধান বিচারপতি পদে বসানো হয় ২০১৫ সালে। দুর্নীতির কালিমামুক্ত হয়ে মাত্র এক দিন দায়িত্ব পালন করে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
শিরানির মতো প্রধান বিচারপতির সর্বোচ্চ পদে আসীন একজনকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করা সম্ভব হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ-সংক্রান্ত শ্রীলঙ্কার সংবিধানের বিধানে। সেখানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সংসদের হাতে। বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করার পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতাও ছিল সংসদের হাতে। রাজাপক্ষের অনুগত সাংসদেরা এই সুযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব দেন পার্লামেন্টেরই সিলেক্ট কমিটিকে। তদন্তে মারাত্মক অনিয়ম থাকায় তা আদালত স্থগিত করে দেন। সে অবস্থাতেই পার্লামেন্টের ভোটের ভিত্তিতে শিরানিকে অপসারণের প্রস্তাব পাঠানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পদচ্যুত করেন রাজাপক্ষে। (সূত্র : আসিফ নজরুল, দৈনিক প্রথম আলো ১৮ জুলাই ২০১৭)
১ আগস্ট ২০১৭ প্রকাশিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিমকোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতিরা সংবিধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। এতে গণতন্ত্র, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, সেনাশাসন, জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব, সংসদ ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসনসহ অনেক বিষয় চলে এসেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, বিচারপতিদের জবাবদিহিতা ও ৩৯ দফা আচরণবিধি,সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, ক্ষমতার পৃথকীকরণের বিষয়ও রায়ে উঠে এসেছে। এছাড়া সমসাময়িক অনেক ইস্যুর জবাব দেয়া হয়েছে ৭৯৯ পৃষ্ঠার এ রায়ের মাধ্যমে। ষোড়শ সংশোধনী মামলার ৭৯৯ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে ব্যাখা দিয়েছেন।
রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে সংবিধানে। সার্বভৌম হচ্ছেন শুধু জনগণ এবং সর্বময় হচ্ছে সংবিধান। বাকি সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নেহাতই সংবিধানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার মাত্র। আমাদের সংবিধানে সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়নি।
রায়ে তিনি লিখেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভার আধিপত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সংসদের কার্যপ্রণালিতে কার্যত একক আধিপত্য থাকে মন্ত্রিসভার। ক্ষমতাসীন দল যা চায় সংসদে বেশিরভাগ সদস্য তাকেই সমর্থন করেন। সংসদের পুরো নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রিসভার হাতে। সংসদে কী আলোচনা হবে সেই সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভাই। যখন এটা নিয়ে আলোচনা হয় তখনও কত সময় নিয়ে আলোচনা হবে এবং কী নিয়ে আলোচনা হবে তাও নির্ধারণ করে মন্ত্রিসভা। শেষ পর্যন্ত যেসব বিল সংসদের মাধ্যমে পাস হয় তা মন্ত্রিসভা হয়েই সংসদে আসে। স্বার্থান্বেষী ও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের স্বার্থ আদায়ে মন্ত্রীদের অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকে, যাতে আইনে তাদের স্বার্থরক্ষা হয়।
বিচারপতি সিনহা লিখেছেন, কোনো সংসদ সদস্য মন্ত্রী না হলেও সংসদে বিল উত্থাপন করতে পারেন (কার্যপ্রণালি বিধির ৭২ ধারা অনুসারে)। তবে সরকারের সমর্থন ছাড়া বেসরকারি ওই বিল পাসের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ব্যক্তি সংসদ সদস্যের ক্ষমতা ভীষণভাবে সীমিত। তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগও সীমিত। সংসদের বেশিরভাগ দিনই যায় সরকারের কার্যক্রম সম্পাদনে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার জন্য সপ্তাহে শুধু একদিন বরাদ্দ রয়েছে। সরকারের এত বিল অপেক্ষমাণ থাকে যে, তার ফলে বেসরকারি বিল চাপা পড়ে যায়।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পূর্ণাঙ্গ রায়ে লিখেছেন, বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা আইন, সংবিধান ও জনগণের কাছে। বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য কোনো বিচারপতিকে দায়ী করা যায় না। এ ধরনের জবাবদিহিতার প্রশ্নই ওঠে না।
সুপ্রিমকোর্টে এ মামলার শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। এ কারণে বিচারপতিরা নিজেরাই নিজেদের বিচার করবেন, তা ন্যায়সঙ্গত নয়। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, বিচারপতিদের জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতা থাকা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতের জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে বিচারপতিদের জবাবদিহিতায় কোনো বাধা দেয়নি। বিচারপতিরাও গর্ববোধ করেন যে, তারা আর কারও কাছে নয়, জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহি করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেছেন, কোনো বিচারক (পটেনশিয়াল ক্যান্ডিডেট) যদি মনে করেন, তিনি জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতার তুলনায় যথেষ্ট বড়, তবে তিনি বিচার বিভাগে স্বাগত নয়। তার সরে যাওয়াই উচিত।
আজমালুল হোসেন বলেছেন, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা যদি বিচার বিভাগের হাতে দেয়া হয় তবে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থায় চিড় ধরবে।
এ মন্তব্যের জবাবে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, এখন প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতা চর্চার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত। লর্ড ড্যানিং বলেছেন, ‘কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হবে, সেটা বিচারপতি হলেই ভালো।’
প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল বিচারকদের সম্পর্কে নির্দয় মন্তব্য করেছেন। আমি বলব, তিনি ভুল বলেছেন। আমি তাকে উপদেশ দেব যে, তিনি যেন তার মক্কেলকে (এ ক্ষেত্রে সরকার) বলেন যে, সরকারের ধারণা যদি এই হয় যে, বিচারপতিরা স্বাধীন ও স্বচ্ছ নন, তাহলে দেশে কারও ওপরই আস্থা রাখা ঠিক হবে না। উপরন্তু, আমরা যদি এই যুক্তি গ্রহণ করি তবে এ বিষয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ সংবিধানই এই ভুল পদ্ধতি গ্রহণ করত।’
বিচারপতি সিনহা লিখেছেন, অনুচ্ছেদ ৯৪-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিরা স্বাধীন থাকবেন। ১১৬(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগে নিয়োজিত সব ব্যক্তি এবং বিচার পরিচালনাকালে সব ম্যাজিস্ট্রেট স্বাধীনতা ভোগ করবেন। এই প্রেক্ষাপটেই বিচারপতি ও বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার বিষয়টি দেখতে হবে। আদালতে যেসব মামলা বিচারাধীন আছে তার ৮০ ভাগই হয় রাষ্ট্রের (সরকার) বিরুদ্ধে অথবা বিচার বিভাগের কাছে সরকার ন্যায়বিচার চাচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি মত দিয়েছেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিচারিক জবাবদিহিতা ও ব্যক্তিগতভাবে বিচারকের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বিচারকরা ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ করলে অন্য নাগরিকদের মতো তাদের জন্যও আইন সমান প্রযোজ্য। তবে বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য কোনো বিচারপতিকে দায়ী করা যায় না। এ ধরনের জবাবদিহিতার প্রশ্নই ওঠে না। আর জবাবদিহিতা থাকবে না বলে বিচারকরা কাজে অবহেলাও দেখাতে পারেন না।
প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারকরা সাংবিধানিক কর্মকর্তা। তারা বেসামরিক কর্মকর্তাদের মতো নয়। তারা কারও দাস নয় এবং কেউই তাদের মনিব নয়। কারও সঙ্গে তাদের দাস-প্রভুসুলভ সম্পর্ক নেই, যেমনটা অন্যান্য সরকারি শাখায় থাকে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চতর আদালত নির্বাহী ও আইন বিভাগ থেকে একেবারেই পৃথক। তারা তাদের বিবেক ছাড়া কারও কাছে জবাবদিহি করবে না।
তবে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, জবাবদিহিতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিচারকরা বিদ্যমান আইন, প্রক্রিয়া ও রীতিনীতি অনুযায়ী বিচার করেন। তারা মর্জিমাফিক কাজ করতে পারেন না।
বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা আইন, সংবিধান ও জনগণের কাছে। জনগণ ও গণমাধ্যম বিচারপতিদের সমালোচনা করে থাকে। এতেই বোঝা যায়, বিচারকের স্বাধীনতা চূড়ান্ত নয়, বরং কিছু সীমাবদ্ধতা তাদেরও রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের সবচেয়ে জবাবদিহি অঙ্গের একটি।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা লিখেছেন, আদালত কিংবা বিচারকদের উচিত নয় সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করা। আদালত ও সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্য থাকা উচিত। একইভাবে সুপ্রিমকোর্টের কোনো মতামত সম্পর্কে সংসদের কোনো মন্তব্য করা ঠিক নয়। সংবিধানের ৭৮(২) অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৭০ ও ২৭১ ধারা অনুসারে এটা তারা করতে পারেন না। তিনি লিখেছেন, এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার চূড়ান্ত পৃথকীকরণ সম্ভব নয়। এ কারণে সংসদ ও বিচার বিভাগের উচিত মিলেমিশে কাজ করা।
তিনি লিখেছেন-আইনের শাসনের অপরিহার্য দিক হচ্ছে, স্বাধীন বিচার বিভাগের আওতায় কোনো বিচারপতি সরকারের কোনো বিভাগের থাবার নিচে থাকতে পারেন না। তাকে নিরপেক্ষ থাকার বর্মে সজ্জিত থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং কেউ যাতে তা ‘অপহরণ’ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাও সুপ্রিমকোর্টের দায়িত্ব। দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানই সুপ্রিমকোর্টের কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
কয়েকটি দেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, যেখানে সংসদের হাতে অভিশংসন ক্ষমতা দেয়া হয় সেখানে এটা নিশ্চিত করা হয় যে, সেই কমিটির ওপর সবার আস্থা রয়েছে, তারা নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হয় না। তবে গত ৪২ বছরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেভাবে সংসদ চলছে তাতে এরকম নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা দেয়ার প্রসঙ্গে রায়ে তিনি বলেন, নতুন এ ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের বিরাগভাজন হয়ে কোনো বিচারপতি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাকে সংসদ অভিশংসন করবে।
রায়ে তিনি লিখেছেন, সংবিধানের ৭, ২২, ৯৪(৪), ১০২ এবং ১১২ অনুচ্ছেদ একত্রে পড়লেই বোঝা যায়, সুপ্রিমকোর্ট স্বাধীন, পৃথক এবং সংবিধানের অভিভাবক এবং রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। এটা নেহাতই একটি আদালত নয়। ষোড়শ সংশোধনীতে সংসদকে বিচারপতিদের অভিশংসনের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল তা বহাল থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ