ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বাস্থ্য সচিবের ব্যাখ্যায় হাইকোর্টের অসন্তোষ

স্টাফ রিপোর্টার : ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে ২৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার গাফিলতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিবের ব্যাখ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করে তা গ্রহণ করেননি হাইকোর্ট। আদালতের আগের তলবে হাজির হলেও ফের তাকে আজ বৃহস্পতিবারও হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য সজিব সিরাজুল হক আদালতে হাজির হলে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। স্কাস্থ্য সচিবের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী।
গত ২১ আগস্ট রীড ফার্মার ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ২৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার অদক্ষতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় স্বাস্থ্য সচিবকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা সচিব সিরাজুল হক আদালতে হাজির হয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আদালত গ্রহণ করেনি। ফলে ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার অদক্ষতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন গ্রহণ করা হয়নি সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার আবার তাকে যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে হবে।
অভিযুক্ত ওই দুই কর্মকর্তা হলেন-ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম ও উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেন। তাদের উদ্দেশ করে আদালত বলেন, গত ১৬ মার্চ থেকে বিবাদীরা বসে আছে। কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ওই ঘটনায় মোট ৭৬ শিশু মারা গেছে। আপনি বহাল তবিয়েতে আছেন। আর বলছেন দেখতেছি!
ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এ সময় বলেন, আগে সতর্ক করা, তারপর বরখাস্ত। সতর্ক না করলে জটিলতার সৃষ্টি হত।
আদালত বলেন, আপনারাতো (দুই কর্মকর্তা) জামাই আদরে আছেন। আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ সময় বলেন, দুজনকে বদলি বা সাসপেন্ড কিছুই করেনি।
তখন আদালত বলেন, ব্যবস্থা যে নেয়া হয়নি, আমরাতো আগে থেকে সেকথা বলে আসছি। এ পর্যায়ে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তখন আদালত বলেন, কোর্টকে আর খাটো করার চেষ্টা করবেন না। মার্চ থেকে বলে আসছি।
আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, ব্যবস্থা নেয়ার আগে শোকজ, তদন্ত-এসব আছে। আমরা ব্যাখ্যা তৈরি করার জন্য সময় পাইনি। আমাদের সময় দরকার।
তখন আদালত বলেন, আগামীকাল যথাযথভাবে ব্যাখ্যা দিবেন। ২৮ শিশু মারা গেল। আপনার (সচিব) ছেলেমেয়ে এখানে থাকে না। যারা মারা গেছে, এরাতো মরার জন্য জন্মেছে! এটা দুর্ভাগ্যজনক। এদেশ গরীব হতে পারে। এভাবে শিশুরা মারা যাবে এ শিক্ষা তো কাউকে দেয়া হয়নি।
২০০৯ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত রীড ফার্মার ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ সেবন করে সারা দেশে ২৮টি শিশু মারা যায়। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম ওই ঘটনায় ঢাকার ড্রাগ আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় রীড ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমানসহ পাঁচজনকে আসামী করা হয়। ওই মামলার রায়ে গতবছর নবেম্বরে পাঁচ আসামীর সবাই খালাস পান। বাকি চার আসামী হলেন-মিজানুর রহমানের স্ত্রী কোম্পানির পরিচালক শিউলি রহমান, পরিচালক আব্দুল গণি, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল ইসলাম ও এনামুল হক।
ঢাকার ওষুধ আদালতের বিচারক আতোয়ার রহমান ওই রায়ে বলেন, মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তখনকার সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম ও উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেনের ‘অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে’ রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আদালতের রায়ের পরও ওষুধ প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে একটি আবেদন করলে গত ১৬ মার্চ হাইকোর্ট রুল জারি করে। ওষুধ প্রশাসনের অধিদপ্তরের ওই দুই কর্মকর্তাকে কেন চাকরি থেকে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না-তা জানাতে চাওয়া হয় রুলে। সরকারের স্বাস্থ্য সচিব ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এর জবাব দিতে বলা হয়। ওই রুলের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১১ জুলাই হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দেয়, সেখানেও ওই দুই কর্মকর্তার অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়। এরপর তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চেয়ে আরেকটি সম্পূরক আবেদন করে এইচআরপিবি।
এরপর গত ৩ আগস্ট ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব এক প্রতিবেদনে আদালতকে জানায়, ওই দুই কর্মকর্তাকে সতর্ক করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ