ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকার প্রধান বিচারপতিকে অসুস্থ বানিয়ে পদ থেকে সরাতে চাইছে -রিজভী

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ আয়োজিত শফিকুল গনি স্বপনের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চলমান অস্থিরতা কোন পথে বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুর কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : সরকার বিচারপতি এস কে সিনহাকে অসুস্থ বানিয়ে তাকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরাতে চাইছে অভিযোগ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রধান বিচারপতি পদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার মতো অনুগত লোক চাচ্ছে সরকার। আর বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা স্বাধীন সত্তা নিয়ে কথা বলায় তাকে সহ্য করতে পারছে না সরকার। তার রায়ে দুঃশাসনের কথা উঠে এসেছে, এটাই আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে যন্ত্রণা দিচ্ছে। এ জন্যই প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চাইছে তারা।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০ দলের জোট শরিক বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ‘চলমান অস্থিরতা : কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ প্রথমে জনগণের ভোটের অধিকার গুম করেছে। পরে বিরোধী দলের নেতাদের গুম করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় আছে। এখন প্রধানমন্ত্রী সরে গেলেই জনগণ শান্তি পাবে। কিন্তু তিনি জনগণের মনের কথা উপলব্ধি করতে পারছেন না।
ষোড়শ’ সংশোধনী রায় বাতিলের কারণে সরকার দিশেহারা হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, প্রধান বিচারপতিকে মানসিক অসুস্থ বলে অন্য কোনো ধরনের অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে তারা এগোয় কি না, সেটা আজকে মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। তাকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে, এটা অজুহাত সৃষ্টি করে যে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ তাকে আর রাখা যাবে না- এই বলে কোনো উদ্যোগ তারা গ্রহণ করে কি না, সেই আলোচনা হচ্ছে।
 প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে আছে- প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তাহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।
বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফেরত নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন আনা হয়েছিল, যা সর্বোচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে এনেছে। জিয়াউর রহমানের আমলে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার এই রায়কে ঐতিহাসিক বলছে বিএনপি। রায় বদলাতে সরকার বিচার বিভাগকে চাপ দিচ্ছে বলেও তাদের অভিযোগ।
অন্যদিকে এই রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সিনহা বাংলাদেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
এই পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ ও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে অভিযোগ তুলে রায়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি দলের নেতারা কড়া সমালোচনা করছেন, বাক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি সিনহাও।
প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতা ফজলে নূর তাপস অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের পদত্যাগ করা উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন।
ওই প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, পরিস্থিতি এমনই যে, তাদের একজন খাস মানুষের পদত্যাগ চাইলেন তিনি। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা জেলে গেলে এই অ্যাটর্নি জেনারেলই তাদের কারাগারে আটকিয়ে রাখার জন্য সর্বশেষ চেষ্টা করেন। এত অনুগত অ্যাটর্নি জেনারেল আর কখনও আসেননি। হায় তারই পদত্যাগ চেয়েছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। এই ফজলে নূর তাপসরা একদিন হয়ত প্রধানমন্ত্রীরও পদত্যাগ চেয়ে বসবেন।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, খায়রুল হক কত নিচুমানের হতে পারে অর্থের লোভের জন্য। এই খায়রুল হকই গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। আমরা আইন প্রক্রিয়ায় জনগণের মাধ্যমে তাঁকে শাস্তি দিতে চাই। মইন উদ্দিন, ফখরুুদ্দীন আর আজকের এই সরকার একই নৌকার মাঝি। এই সংসদকে কার্যকর করতে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা আবদুর রাজ্জাককে রাষ্ট্রীয় সম্মান না দেয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, যখন আমাদের চলচ্চিত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করেছে সেটাকে একটা মাত্রায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে নিজে যে শ্রম দিয়েছেন; আর্ট  অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি- দুইটাকে সমন্বয় করে একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন আবদুর রাজ্জাক, তার আজ মূল্যায়ন কোথায়?
যারা গুম-খুন-গণহত্যা, ধর্ষণ ও ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি করে, তারাই এই সরকারের কাছে সম্মান পায় বলে মন্তব্য করেন রিজভী।
এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্বের চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ এ রাজ্জাকের অভিনয়ের কথাও তুলে ধরেন রিজভী। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ নিজের দলের বাইরে যেতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন বিএনপি নেতা।
বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, কেউ যদি স্বাধীনতাবিরোধীও হয়, সে যদি জয় বাংলা স্লোগান দেয় এবং এই সরকারকে খুশি করতে পারে, তারা সম্মানিত হবে। একাত্তর সালে পাকিস্তান রেডিওতে যারা কবিতা পাঠ করেছেন, পরবর্তীতে তারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হয়ে গেলেন। কিন্তু ড. পিয়াস করিমের মতো শিক্ষক এবং সিরাজুর রহমানের মতো সাংবাদিক শুধু সরকারের সমালোচনা করার জন্য সম্মানিত হতে পারেননি।
শফিকুল গণি স্বপনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রিজভী বলেন, তার মতো মেধাবী রাজনীতিবিদ আজকের সমাজে বড়ই বিরল। তিনি আজীবন দেশ, মাটি-মানুষ ও গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতি করেছেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আওয়ামী লীগের নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, তাদের মাথা এতটাই গরম যে, তারা প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করে মাঠে আসতে বলেন। ভাবটা হলো যে, তারা হা-ডু-ডু খেলতে মাঠে নেমেছে।
আলাল আরো বলেন, নিজের মধ্যে বারবার প্রশ্নের উদ্রেক হয় আমরা কী আসলে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। নাকি স্বাধীন আওয়ামী লীগের দ্বারা শাসিত একটা দেশ? শুধু তারা স্বাধীন, অন্য কেউ নয়?’
বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে শহীদুন্নবী ডাবলুর সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতউল্লাহ, ছড়াকার আবু সালেহ, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ