ঢাকা, বৃহস্পতিবার 24 August 2017, ০৯ ভাদ্র ১৪২8, ০১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাদারীপুরের সোমা হত্যা রহস্য উদঘাটনে বাবার অভিনব পদ্ধতি

মাদারীপুর সংবাদদাতা : কলেজ ছাত্রী সোমা বালা (১৬)কে হত্যা করা হয়েছে-না কি তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে এমন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন সোমার পিতা দিলীপ বালা। তাই তিনি সত্য উদঘাটনের জন্য অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। লাশ সৎকার না করে কফিনে পুরে মাটিচাপা দিয়ে ২ মাস ধরে মেয়ের লাশ পাহাড়া দিচ্ছেন অসহায় পিতা। ঘটনাটি ঘটেছে চলতি বছর ২৪ জুন মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামে। এ ব্যাপারে দিলীপ বালা রাজৈর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে ২ আগস্ট দিলীপ বালা বাদী হয়ে মাদারীপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। (মামলা নং ৫৮৬/১৭)। ৩ আগস্ট আদালতের বিচারক এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেন। ৩১ আগস্টের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেয়া হয়েছে।
দিলীপ বালার অভিযোগ ও মামলার বিবরণে জানা গেছে, প্রায় বিশ বছর আগে রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের সুতারকান্দি গ্রামের সুনীল বালার ছেলে দিলীপ বালার সাথে একই উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের মনোরঞ্জন শিকারীর মেয়ে শোভা রাণী বালার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ বাঁধে। বনিবনা না হওয়ায় শোভা রাণী বালা তাদের শিশুকন্যা সোমা বালাকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায় এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকে। শোভা মাঝে মধ্যে স্বামীর বাড়িতে আসা যাওয়া করতো। এদিকে শিশু সোমা বালা মামা বাড়িতে থেকে বড় হয়ে ওঠে এবং লেখাপড়া করতে থাকে। ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করার পর সোমাকে গোপালগঞ্জ জেলার কলিগ্রাম বঙ্গরত্ন ডিগ্রি কলেজে ভর্তি করা হয়। সোমা চলতি বছর (২০১৭) (মানবিক রোল নং ৩৯৪৬৪৭) এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৩.০০ পেয়ে পাস করে। এ অবস্থায় সোমার পিতার পরিচয় গোপন রেখে দিলীপ বালার স্ত্রী শোভা রাণী বালা, শ্বাশুড়ী পারুল শিকারী, শ্যালক কৃষ্ণ শিকারীসহ ঐ বাড়ির লোকজন নাবালিকা সোমার অমতে পার্শ্ববর্তী বনগ্রামের দিপক মন্ডল (৪৫) নামের এক মধ্যবয়সী লোকের সাথে বিয়ে ঠিক করে। সোমা এতে বাধা দেয়ায় তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করা হয়।
মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন বিগত ২৪ জুন সকাল ৭টার দিকে সোমা বালা তাদের পার্শ্ববর্তী পলিতা গ্রামের বন্ধু (সোমার বয়ফ্রেন্ড) অনিক মোহন্তের বাড়ি বেড়াতে যায়। সকাল ৮টার দিকে সোমা তার মামা বাড়িতে ফিরে আসে। এ সময় সোমার মামা বাড়ির লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করে। এর এক পর্যায়ে মামা কৃষ্ণ শিকারী সোমার বুকের মধ্যে শুকনো মরিচের গুড়া মাখিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে। এ অপমান সহ্য করতে না পেরে সোমা আত্মহত্যা করে অথবা তাকে হত্যা করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সোমার লাশ রাজৈর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তারা নিজেদের মত লাশের ময়না তদন্ত করিয়ে নিতে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তাকে জানানো হয় সোমার কোন অভিভাবক নেই। এই সংবাদ পেয়ে সোমার পিতা দিলীপ বালা রাজৈর হাসপাতালে যায়। তাকে দেখে মামলার আসামীরা লাশ হাসপাতালের বারান্দায় রেখে পালিয়ে যায়। পরে দিলীপ বালা ময়না তদন্তের পর পুলিশের কাছ থেকে সোমার লাশ বুঝে নেয়। ময়না তদন্ত রিপোর্ট প্রভাবিত হতে পারে এই সন্দেহ হয় দিলীপ বালার। তাই সত্য ঘটনা উদঘাটনের জন্য লাশ দাহ না করে কাঠের বাক্সের কফিনে সংরক্ষণ করে বাড়ির আঙ্গিনায় মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। এ অবস্থায় আজ ২ মাস ধরে হতভাগ্য মেয়ে সোমা বালার লাশ পাহাড়া দিচ্ছেন অসহায় পিতা।
এ ব্যাপারে মৃত সোমা বালার পিতা দিলীপ বালা বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়ে সোমাকে হত্যা করা হয়েছে না কি নির্যাতন করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে আমি এ সত্যটা জানতে চাই। এ জন্য আমি আমার মেয়ের লাশ সৎকার না করে কাঠের বাক্সে ভরে সংরক্ষণ করে মাটিচাপা দিয়ে ২ মাস ধরে পাহাড়া দিচ্ছি। সত্য ঘটনা উদঘাটনের জন্য আমি লাশের পুনরায় ময়না তদন্তের দাবি করছি এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই। সত্য ঘটনা জানার পরেই আমার মেয়ের লাশের সৎকার করবো।’
মামলার আইনজীবি মো. রেজাউল করিম বলেন, সোমাকে হত্যা করা হয়েছে না কি নির্যাতন করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে এ সত্যটা উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য মেয়ের বাবা হিন্দু প্রথা অনুযায়ী লাশ সৎকার না করে কাঠের বাক্সে সংরক্ষণ করে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছেন। পুনরায় লাশের ময়না তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জিয়াউল মোর্শেদ বলেন, সোমা মারা যাবার ব্যাপারে আমরা তদন্ত করে ও ময়না তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী আত্মহত্যা বলেই প্রমাণ পেয়েছি। তবে শুনেছি নিহত সোমার বাবা দিলীপ বালা লাশ পুনঃরায় ময়না তদন্ত করার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ