ঢাকা, শুক্রবার 25 August 2017, ১০ ভাদ্র ১৪২8, ০২ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যায় ৭ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত ॥ ঈদ যাত্রা নিয়ে শংকা

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি তথ্যই বলছে, চলমান বন্যায় এ পর্যন্ত ২১টি জেলার ৭ হাজার ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা আসন্ন ঈদ যাতায়াতে বাড়ি ফেরা মানুষদের চরম দুর্ভোগে ফেলবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মহাসড়কে যানজটে খাড়া দেখা দিয়েছে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের (এনডিআরসিসি) উপ-সচিব জি এম আব্দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, দিনাজপুর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জেলার ১ হাজার ১০৪ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরেই এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও দিনাজপুরেই বেশি। আব্দুল কাদের জানান, অন্যান্য জেলার মধ্য টাঙ্গাইলের ৯৯৭ কিলোমিটার, কুমিল্লার ৮৮০ কি.মি., পঞ্চগড়ের ৮৫৮ কি.মি., নীলফামারীতে ৫৩৬ কি.মি. রাস্তার ক্ষতি হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) হিসাবে, সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৭টি সড়ক বন্যার পানির তোড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিনাজপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা এবং এর আশপাশের জেলাগুলোর সড়ক। এই দুই জেলার ভেতর এবং দুই জেলার সঙ্গে অন্য জেলার সংযোগ স্থাপনকারী অন্তত ৯টি সড়ক পুরোপুরিই বিচ্ছিন্ন। নেত্রকোনা জেলায় ৫টি সড়কে স্থানে স্থানে পানি থাকায় চলাচল প্রায় বন্ধ। জামালপুর, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরের তিনটি সড়কের কিছু অংশ পানিতে নিমজ্জিত। এসব সড়কে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা পরিমাপ করতে পারছে না সওজ।

সওজের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে উত্তরের ১০ জেলায় ৭৩টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তালিকা করা হয়েছে। এই জেলাগুলো হচ্ছে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী। এসব জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অন্তত পৌনে ২০০ কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে আছে। এই জেলাগুলোর ১৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

এর আগে গত রোববার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছিলেন, দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে এ পর্যন্ত ২৩টি পয়েন্টে রাস্তা পানির নিচে রয়েছে এবং ১৮টি পয়েন্টে রাস্তা ‘ওয়াশআউট’ হয়ে গেছে। ঈদের আগে এসব রাস্তা ঠিক করা ‘খুবই চ্যালেঞ্জিং’ হবে বলেও জানিয়েছিলেন মন্ত্রী। যদিও গতকাল মন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ঈদে কোনো সড়ক-মহাসড়কে যানজট থাকবে না। 

বন্যায় এ পর্যন্ত ১৩৭ জন মানুষ মারা গেছে এবং ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আব্দুল কাদের। এনডিআরসিসি’র তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩২ জেলার ১৯৯টি উপজেলা ও ৫১টি পৌরসভা বন্যা কবলিত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে দিনাজপুরে ৩০ জন, নীলফামারীতে ৬ , লালমনিরহাটে ৬, কুড়িগ্রামে ২৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ১, গাইবান্ধায় ১৩, বগুড়ায় ৪, সিরাজগঞ্জে ৬, জামালপুরে ১৪, সুনামগঞ্জে ২, নেত্রকোণায় ৪, যশোরে ৩, টাঙ্গাইলে ২, শেরপুরে ৪, মৌলভীবাজারে ২, নওগাঁয় ৬, কুমিল্লায় ২, রংপুরে ৬, মানিকগঞ্জে ১ ও জয়পুরহাটে ২ জন মিলিয়ে মোট ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বানের পানিতে ৬ লাখ ১২ হাজার ৩৬২ হেক্টর ফসলী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪২৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬১ হাজার ১০৮টি টিউবওয়েল। ক্ষতি হয়েছে ৫০টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের। আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭৮ কিলোমিটার বাঁধ এবং ৪৪৬টি ব্রিজ ও কালভার্ট।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রাঙামাটি, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নাটোর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, শেরপুর জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এই দফায় বন্যার কবলে পড়েছে।

এদিকে, দেশব্যাপী বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন। তিনি গতকাল বলেন, উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। পদ্মা নদীর পানি কমতে থাকায় দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মুন্সিগঞ্জ ও শরীয়তপুরের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকার চতুর্দিকের বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, টঙ্গিখাল এখনও বিপদসীমার যথাক্রমে ৭৮ সেন্টি মিটার, ৯ সে.মি., ১২ সে.মি. এবং ৮ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী বিপদসীমার ১৮ সে.মি. উপর দিয়ে বইলেও গত চব্বিশ ঘণ্টায় পানি ৩ সে.মি. কমেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ