ঢাকা, শুক্রবার 25 August 2017, ১০ ভাদ্র ১৪২8, ০২ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রতারিত হজ্বযাত্রীদের আহাজারি অভিযোগও নিতে চায় না হজ্ব ক্যাম্প

 

মিয়া হোসেন : প্রতারিত হজ্বযাত্রীদের কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে হজ্ব ক্যাম্প। এজেন্সি ও মধ্যসত্বভোগী দালালরা তাদের টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে। কারো ভিসা হয়েছে, টিকিট হয়নি, আবার কারো ভিসা টিকিট কোনোটিই হয়নি। এসব হজ্বযাত্রীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। আবার অনেকের ভিসা টিকিট হলেও ফ্লাইট পাচ্ছে না। আজ নয়, কাল এভাবে অপেক্ষার প্রহর গুণে অশেষ ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। তাদের এসব আহাজারিও শুনছে না হজ্ব ক্যাম্প। চলতি বছর হজ্ব ফ্লাইট শুরুর পর থেকেই ফ্লাইট বাতিলসহ নানা ভোগান্তি শুরু হয় হজ্বযাত্রীদের। আর সেই ভোগান্তি এবার শেষ দিকে এসে চরমে পৌঁছেছে। এদিকে, আশকোনার হজ্ব অফিসে অভিযোগ করতে গেলে ঠিকমত অভিযোগ নেয়া তো দূরে থাক, উল্টো হজ্বযাত্রীদের সাথে হজ্ব অফিসের কর্মকর্তারা অশোভন আচরণ করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরদিকে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট ছাড়া হজ্ব ক্যাম্পে প্রবেশ না করার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আশকোনার হজ্ব ক্যাম্পে সরেজমিনে ভোগান্তির শিকার হজ্বযাত্রীদের আহাজারির চিত্র দেখা গেছে। জানা গেছে, সময় মতো ভিসার আবেদন না করা, মোয়াল্লেমের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর বিলম্বে চুক্তি, সময়মতো বাড়িভাড়া না করা, ভিসা লজমেন্ট ও মোফা সেন্ড করতে বিলম্ব করা, হজ্ব এজেন্সিদের গাফিলতিতে যাত্রীর অভাবে এখন পর্যন্ত মোট ২৮টি হজ্ব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় তিন হাজার যাত্রীর সৌদি গমন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে মোয়াল্লেম ফি ও টিকিটের টাকা জমা দিয়ে নিবন্ধন করা হলেও ৯৯৩ হজ্বযাত্রীর ভিসার আবেদন জমা দেয়নি সংশ্লিষ্ট হজ্ব এজেন্সি। ফলে নির্দিষ্ট কোটা থেকে ৯৯৩ হজ্বযাত্রী কম যাচ্ছে।

ক্যাম্পে ভুক্তভোগী হজ্বযাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বহু হজ্বযাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঊধাও হয়ে গেছে হজ্ব এজেন্সির মালিক, এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এদের অনেকের ভিসা হয়েছে অনেক আগে কিন্তু এজেন্সিগুলো তাদের বিমানের টিকেট দিচ্ছে না। ভিসাপ্রাপ্ত হজ্বযাত্রীদের সৌদি পাঠাতে এজেন্সি মালিকরা টালবাহানা শুরু করেছে। প্রতিটি এজেন্সি এখন এসব হজ্বযাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করছে।

মধ্যস্বত্বভোগী দালালচক্র প্রায় দুই হাজার হজ্বযাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে এজেন্সিকে ঠিকমত জমা দেয়নি। তাই এখন এজেন্সির মালিকরা ভিসা হওয়া সত্ত্বেও টিকিট কাটছে না। প্রতারণা করে মধ্যসত্বভোগী ও অনেক এজেন্সি মালিক ঊধাও হয়ে গেছে। প্রতারণার শিকার এসব হজ্বযাত্রীরা জড়ো হচ্ছেন রাজধানীর আশকোনার হজ্ব ক্যাম্পে। ভুক্তভোগী হজ্বযাত্রী সাংবাদিকদের দেখলেই জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। বলছেন, বাবা আমাদের হজ্বে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। না হলে আমরা লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবো।

নিজের স্ত্রীকে নিয়ে একসাথে পবিত্র হজ্ব পালনে উদ্দশ্যে সৌদি আরব যেতে চেয়েছিলেন আব্দুল বারেক তালুকদার। কিন্তু মধ্যসত্বভোগী এজেন্ট মো. আলাউদ্দিনের প্রতারণার শিকার হয়ে গত বছর হজ্বে যেতে পারেনি দু’জনের কেউই। এবছরও তাদের হজ্বে যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই মেয়ে মোছা. সাবিহা বারিকে নিয়ে হজ্ব অফিস, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। এ দু'জন ছাড়াও আলাউদ্দিনের প্রতারণার শিকার আরো ২২ জন। এই ২৪ জনকে অনিশ্চয়তার সাগরে ভাসিয়ে আলাউদ্দিন এখন পলাতক।

আব্দুল বারেক তালুকদার বলেন, আমাদের সবার বাড়ি পিরোজপুরের রাজাপুর উপজেলায়। প্রত্যেকে মো. আলাউদ্দিনের কাছে তিন লাখ করে টাকা জমা দিয়েছিলাম ২০১৫ সালে। গত বছর সবাইকে হজ্বে পাঠাবে বলেছিল কিন্তু পাঠাতে পারেনি। এবছরও একই কথা বলেছিল কিন্তু এখন তো পলাতক।

তিনি আরো বলেন, আমাদের সবার ভিসা হয়েছে। আমরা শুনেছি ওই আলাউদ্দিন আমাদের সবার টাকা জমা দিয়েছে আল বালাদ হজ্ব এজেন্সিকে। এখন আলাউদ্দিনকে তো পাচ্ছি না। এজেন্সির কাউকেও পাচ্ছি না। হজ্ব অফিসে বলতে গেলে কেউ ঢুকতে দিচ্ছে না। উল্টে আমাদের সবার সাথে চিল্লাচ্ছে। তারা বলেছে এই সব দোষ নাকি আমাদের। 

আব্দুল বারেক তালুকদারের মেয়ে মোছা. সাবিহা বারি বলেন, আমরা আজ দুই বছর ধরে এভাবে ঘুরছি। আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কোনোভাবে বাড়িতে নিতেও পারছি না। মরে যাবে কিন্তু মা বাড়িতে যেতে রাজি হচ্ছে না। আমাদের এই বিপদ থেকে কে উদ্ধার করবে। মরা মা-বাবাকে বাড়িতে নেয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকবে না।

পাবনার লক্ষীপুর থেকে এক সাথে ১২০ জন হজ্ব ক্যাম্পে এসেছে ৫-৬ দিনে আগে। এদের সবাই এ বি এম হজ্ব এজেন্সির যাত্রী। ৫দিন আগে ১২০ জনের ৪০ জন সৌদি চলে গেছে। কিন্তু বাকি ৮০ জন ভিসা হাতে গত ৫-৬ দিন ধরে ক্যাম্পে ঘুরলেও এজেন্সির মালিক তাদের বিমানের টিকেট দেয়নি। আর কোনো যোগাযোগও করেনি। এদিকে, এই ৮০ জন ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে কেঁদে বেড়াচ্ছেন। শুধু এরাই নয়, এদের মত অসংখ্য ভুক্তভোগীর ভীড় এখন হজ্ব ক্যাম্পে।

আল বালাদ হজ্ব এজেন্সির মালিকের ছোট ভাই মো. মাহবুব বলেন, আসলে তাদের গ্রুপ লিডার আলাউদ্দিন আমাদের কাছে তাদের টাকা ঠিক মত জমা দেয়নি। তাই ঝামেলা তৈরি হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের টিকেট করার।

হজ্ব এজেন্সিগুলোর এসব অভিযোগ সর্ম্পকে জানতে চাইলে হজ্ব অফিসের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বেশকিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। প্রতি বছরই এসব অভিযোগ জমা হয়। অভিযুক্ত কোনো এজেন্সিকে ছাড় দেয়া হবে না। তাদের সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে আগামী ২৮ তারিখের আগে বলা যাচ্ছে না কোনো কোনো এজেন্সি দায়ী। তবে সেটা আমরা চিহ্নিত করে হজ্বের পর ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরো বলেন, কোনো কর্মকর্তা যদি অভিযোগ না নিতে চায় বা হাজীদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি আপনার কথাটি আমলে নিচ্ছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হজ্ব এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মাহাসচিব মো. শাহাদাত হোসাইন তসলিম বলেন, এখন পর্যন্ত যাদের ভিসা হয়েছে তাদের সবাই হজ্বে যাবে। কেউ বাকি থাকবে না। যে এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা হয়েছে তারাই এসব যাত্রীদের টিকেট দিবে। যাদের ভিসা হয়েছে তাদের সবার বিমানের টিকেটের টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা আছে। কেউ ইচ্ছা করলেই এই টাকা তুলতে পারবে না। সুতরাং চিন্তার কোনো কারণ নেই। সবাই হজ্বে যাবে।

এছাড়াও কোনো এজেন্সি যাদি কোনো যাত্রীর কাছে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে তাহলে সেই এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তসলিম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ