ঢাকা, শুক্রবার 25 August 2017, ১০ ভাদ্র ১৪২8, ০২ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘আপনা আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : ‘আপনা আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’ মধ্যযুগের এক গীতিকবির কাব্যে স্থান করে নিয়েছিল এই কালজয়ী বাণীটি। মর্মটা হলো কাউকে উপদেশ দেয়ার আগে নিজে তা পালন কর। যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীতিবাক্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আছে। এর প্রয়োগটা অতীতে সর্বসাধারণের মধ্যে থাকলেও রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে এ কথার তেমন প্রতিফলন ছিল না। কিন্তু হালে তা হতে দেখা যাচ্ছে। কথাটাকে আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিক আরও জীবনঘনিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। কারণ, তাদের মুখে আমরা যেসব অমৃত বচন শুনি, কিন্তু তা তাদের চরিত্রে থোরাই প্রতিফলন দেখা যায়। কোন কিছু নিজেদের স্বার্থে গেলে তা হয় অলঙ্ঘনীয় আর প্রতিকূলে গেলে তা হয় অচ্ছুত-অপয়া-পরিতাজ্য। আমরা আয়নায় নিজের চেহারা দেখার পরিবর্তে অন্যের চেহারাটা বেশী দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আর এই আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের মহাসর্বনাশটা করেছে। আর এর কুপ্রভাবটা পড়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। 

সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়কে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশের উচ্চ আদালত কর্তৃক জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধান সংশোধনী বাতিল এটাই প্রথম নয় বরং এর আগেও একাধিকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াটা হয়েছে আমাদের দেশের নেতিবাচক রাজনীতির প্রথাসিদ্ধ নিয়মে। যখন আদালতের রায় যাদের পক্ষে গেছে তখন রায়ের মহত্ব বর্ণনায় তারা পঞ্চমুখ হয়েছেন। আবার ব্যতিক্রম হলেই আদালত-বিচারক কাউকেই ছেড়ে কথা বলেন নি সংশ্লিষ্টরা। মূলত বিচার মানলেও তালগাছটা নিজেদের অনুকূলে রাখতেই যেন আমাদের এক প্রাণান্তকর চেষ্টা। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদেরকে এই দ্বিচারিতা পরিহার করা অপরিহার্য। 

সম্প্রতি আপীল বিভাগ দেশের উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত বিষয়ক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও রায়ের পর্যবেক্ষণে দেশের সামগ্রিক অবস্থার একটি নাতিদীর্ঘ চিত্রও উপস্থাপন করা হয়েছে। যা আমাদের জাতীয় জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসেবে মনে করছেন দেশে প্রায় সকল শ্রেণির মানুষ। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক অতিক্রান্ত হবার পরও আমাদের জাতীয় জীবনের এমন বেহাল অবস্থা আমাদেরকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কিন্তু আপীল বিভাগ এমন একটি বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ দেয়ার পর তা কাজে লাগিয়ে আগামী দিনের জন্য নিজেদের কর্মপন্থা নির্ধারণ খুবই জরুরি ছিল। সকল ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়াও ছিল সময়ের দাবি। আর এ উপলব্ধিটা জাগিয়ে তুলেছেন আমাদের সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ। কিন্তু আমরা বোধ হয় সে সুযোগটাও কাজে লাগাতে পারছি না। বরং আরও বেশী করে আত্মকলহে লিপ্ত হচ্ছি বলেই মনে হচ্ছে। অতীত কাসুন্দি ঘাটার অপরাজনীতি আমাদের মোটেই পিছু ছাড়ছে না।

আপীল বিভাগের রায় প্রকাশের পর দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা। অধিকাংশ মানুষই মনে করছেন এ রায়ে গণমানুষের বোধ-বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতির এবং উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে জনগণের ভোটাধিকার, জনপ্রতিনিধিত্বহীন বর্তমান সংসদ, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্র, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, সেনা শাসন, জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব, সংসদ ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, আইনের শাসন, রাজনৈতিক দলগুলোর আমিত্বের আচরণ, প্রশাসনে নির্লজ্জ দলীয়করণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়সহ নানা অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। 

বিচারপতিদের জবাবদিহিতা ও ৩৯ দফা আচরণবিধি, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, বিচারপতিদের নিয়োগ, বিচারবিভাগের পৃথকীকরণের বিষয়াদি রায়ের পর্যালোচনায় এসেছে। দেশের রাজনীতি নিয়ে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাজনীতি এখন আর মুক্ত নয়। এটি এখন ‘বাণিজ্যে’ পরিণত হয়ে গেছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চেয়েছিলেন; ক্ষমতাধর দৈত্য জন্ম দিতে চাননি। অথচ এখন সেই দৈত্যই দেশের মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। গণতন্ত্রের পূর্বশর্তই হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন; নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি ৪৪ বছরেও। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা আত্মঘাতীর মতো সংসদের হাতে দেয়া হয়েছে। কোনো একজন ব্যক্তির দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি, হয় না; অথচ এক ব্যক্তির বন্দনায় মশগুল আছি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ হয়নি। 

এছাড়াও উচ্চ আদালতের বিচারক, নির্বাচন কমিশনার, মহাহিসাব নিরীক্ষক, পিএসসির সদস্যসহ সবকিছুতেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার একটা অশুভ তৎপরতার কথাও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেয়ার মতো কোনো নজরদারি প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ আমরা স্বাধীন জাতি। এমন একটি বিকলাঙ্গ সমাজে আমরা বসবাস করছি; সেখানে ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে; কিন্তু খারাপ লোকেরা আরো লুটপাটের জন্য বেপরোয়া।

বর্তমান গণতন্ত্রকে মেকি হিসেবে অবিহিত করে আপীল বিভাগের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আমাদের সংবিধানের ভিত্তি হচ্ছে, ‘আমরা জনগণ’ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জাতীয় সংসদ সংবিধানের পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না। কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা বিচার করার অধিকার সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষের অবদানের প্রসঙ্গে আরো বলা হয়েছে, আমরা একটি মুক্ত-স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ নীরবে ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলছি। কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ-জাতি তৈরি হয়নি। 

৫ জানুয়ারির কথা উল্লখ করে পর্যালোচনায় বলা হয়, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুপস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে কারণে আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সংসদ এখনো শিশু অবস্থায় রয়ে গেছে। জনগণ এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা অর্পণ করতে পারছে না। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের এ বেঞ্চে ছিলেন ৭ সদস্য। প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য ৬ জনের মধ্যে ৫ জন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত পোষণ করে নিজেরাও পৃথক পৃথক পর্যবেণ দিয়েছেন। শুধু বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার রায়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করে নিজস্ব কোনো পর্যবেক্ষণ দেননি বলে জ্ঞাত হওয়া গেছে।

আপীল বিভাগের এই রায় ও পর্যবেক্ষণে বিরোধী দলগুলোসহ দেশের সাধারণ মানুষ খুশী হলেও সরকার পক্ষ সংক্ষুব্ধ হয়েছে। এই সংক্ষুব্ধ হওয়াকে আমরা কাক্সিক্ষতই মনে করছি। কারণ, প্রত্যেক মামলার পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। তাই আদালতের পক্ষে সকল পক্ষকেই খুশী করা সম্ভব হয় না বা ন্যায়বিচারে মানদেন্ড তা গ্রহণযোগ্যও নয়। তাই ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত আপীল বিভাগের রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের সংক্ষুব্ধ হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আর সংক্ষুব্ধ পক্ষ তার প্রতিকার চাইতেও পারেন আইনী প্রক্রিয়ায়। কিন্তু আপীল বিভাগের রায়ের পর সরকার পক্ষ যেভাবে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেছে সে প্রক্রিয়াটাকে কেউই গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না। বরং সরকার পক্ষ ছাড়া আর সকলেই সরকারের অনিয়মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াকে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অশনিসংকেতই মনে করছেন। আর এমনটা মনে করার যৌক্তিক কারণও রয়েছে। 

 ষোড়শ সংধোধনী সংক্রান্ত আপীল বিভাগের রায়ের পর মন্ত্রী সভায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। যা কেউই সঙ্গত ও কাক্সিক্ষত মনে করছে না। সরকারের মন্ত্রীরা তো আপীল বিভাগকে একহাত নিয়েছেন। রায় পরিবর্তনে একহাত আদালতের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টির প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতোমেধ্যই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী মি. ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন যা আদালতের প্রতি চাপ সৃষ্টি হিসেবে দেখছেন সকল শ্রেণির মানুষ। এমনকি মন্ত্রিসভার বৈঠকে আপীল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে যে, বিচার বিভাগ জনগণের আবেগ দিয়ে চলে না বরং তা আইন ও সংবিধান দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। যা সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করলেও ক্ষমতাসীনরা কেন বুঝলেন না তা মোটেই বোধগম্য নয়।

এ বিষয়ে বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিত তো নিজেদেরকে বিচারকদের Appointing authority দাবি করে বিচারকদের এ রায় দেয়ার এখতিয়ার নেই বলে বলে মন্তব্য করেছেন এবং সংবিধানের এই সংশোধনী বারবার পাস করা হবে বলেও বিচার বিভাগকে শাসিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর কথায় মনে হয়েছে যে, তারা একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেদেরকে মধ্যযুগীয় নবাব ভাবতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তারা এখনো গণতন্ত্রমনা হয়ে উঠতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। যা কখনো শুভ ইঙ্গিত বহন করে না। বরং গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক শাসনের ক্ষেত্রে মারাত্মক অন্তরায় বলে মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। 

মন্ত্রিসভার অপরাপর সদস্যরাও আপীল বিভাগের রায় নিয়ে অতিপ্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বলেই মনে করা হচেছ। পিছিয়ে নেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলও। তারা আপীল বিভাগের রায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, আদালতের হাত সংসদ পর্যন্ত যাওয়ার মত প্রলম্বিত নয়। আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক দাবি করেছেন ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়ে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। আবার খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম আদালতের বিরুদ্ধে কর্মসূচি দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। যা ক্ষমতায় থেকে আদালতের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করার অতীত ঘটনাকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বস্তুত আদালতের রায় নিয়ে এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও তীর্যক সমালোচনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আসলে সরকারই যদি আইন ও সংবিধানের প্রতি এমন বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে সে দেশের আইন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। অথচ আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হওয়া এবং এর প্রতিকার পাবার আইনী পথই খোলা আছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী এ বিষয়ে সরকার পক্ষকে একটি সুন্দর দিক-নির্দেশনাও দিয়ে বলেছেন, এখনও সরকারের জন্য দু’টি পথ খোলা আছে। প্রথমত রায়ের পর্যবেক্ষণে সংক্ষুব্ধ পক্ষের কাছে বিবেচিত অপ্রাসঙ্গিক শব্দগুলো ‘এক্সপাঞ্জ’ চাইতে পারেন অথবা রিভিউ করারও সুযোগ আছে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যে অনাকাক্সিক্ষত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে মোটেই কাক্সিক্ষত নয়। যা আগামী দিনে আমাদেরকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে বলেই মনে হচ্ছে। 

যাহোক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া তুঙ্গে ওঠার মধ্যেই জ¦ালানো আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। অযাচিতভাবে আইন কমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আপীল বিভাগের পর্যবেক্ষণকে অপ্রাসঙ্গিক ও রায়কে পূর্বপরিকল্পিত বলে তীর্যক সমালোচনা করেছেন। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে তীর্যক সমালোচনা আর কখনো শোনা যায়নি। এমনকি তার এমন প্রতিক্রিয়াকে এখতিয়ার বহির্ভূতও মনে করছেন দেশের শীর্ষ আইনজ্ঞরা। শুধু তাই নয় সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগও উঠেছে প্রায় সর্বমহল থেকেই। 

ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণের বিষয়ে প্রাসঙ্গিকতা ও পূর্ব পরিকল্পনার প্রশ্ন তোলায় অনেকে টেনে এনেছেন মুন সিনেমা হলের রায় দিতে গিয়ে তিনি কিভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়েছিলেন সে বিষয়টি। সরকারি একটি লাভজনক পদে থেকে সরকারের বেতন ভোগ করে তিনি এভাবে রায়ের সমালোচনা করতে পারেন কি না, তিনি যে পদে আছেন সে পদের দায়িত্বের মধ্যে এটি পড়ে কি না এসব বিষয় এখন আলোচনায় এসেছে। কারণ এ বি এম খায়রুল হক নিজের রায়েই বলেছিলেন, অবসর গ্রহণের পর কোনো বিচারপতি প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু তিনি নিজেই এখন একটি লাভজনক পদে রয়েছেন। ফলে কেঁচো খুঁড়তে এখন সাপ বের হতে শুরু করেছে।

দেশে দীর্ঘকাল ধরে চলা রাজনৈতিক সঙ্কট ও অনাকাক্সিক্ষত অনেক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া এ বি এম খায়রুল হকের রায়। সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক রায়ে অন্তত আরো দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে বলে বলা হলেও অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পরে লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সে বিষয়টি একেবারে তুলে দেয়ার কারণেও খায়রুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। ফলে একথা বলার সুযোগ থাকছে যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর ঘোষিত রায় পরিবর্তন করে বিচারিক অপরাধ করেছেন। এমনকি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তথা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন, তা ভয়ানকভাবে আদালত অবমাননার শামিল। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি এ ধরনের কথা বলতে পারেন না।

উল্লেখ্য, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান ছিল সেটি তিনি বাতিল করে বললেন আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চলতে পারে। কিন্তু তিনি যখন এ রায় লিখলেন সেখানে লিখিত রায়ে তিনি এ দুই টার্মের কথা তুলে দিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জুডিশিয়াল ক্রাইম (বিচারিক অপরাধ) করেছেন। আর আইন কমিশন আইন, ১৯৯৬-এর ৬ নম্বর ধারায় কমিশনের কার্যাবলীর যে তালিকা দেয়া আছে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সমালোচনা অন্তর্ভুক্ত নেই। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায় মানতে আমরা বাধ্য। তাই সাবেক প্রধান বিচারপতির বক্তব্যই এখতিয়ার বহির্ভূত বলেই মনে করা হচ্ছে।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে কেন্দ্র করে সরকার ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করছেন দেশের আত্মসচেতন মানুষ ও আইনজ্ঞরা। মূলত সরকার আদালতকে দিয়ে দেশের পুরো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে নিকট অতীতে। অনেক রাজনৈতিক বিষয় অনাকাক্সিক্ষতভাবে আদালতে টেনে আনা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষক বিষয়ক একটি রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতে টেনে সরকারই আদালতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। সংবিধানের ৫শ ও ত্রয়োদশ সংশোধনী আদালত কর্তৃক বাতিলের সুবিধাভোগীও বর্তমান সরকার। কিন্তু এসব রায় ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যাওয়ায় তারা তা লুফে নিয়েছিলেন। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় তাদের বিপক্ষে যাওয়ায় তারা সরাসরি আদালতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কৃত্রিম একটা অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছেন। আসলে সরকার নিজেদের খোঁড়া গর্তে নিজেরাই পরেছে বলেই মনে হচ্ছে।

আর একথা বলতে কোনভাবেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয় যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বিচারিক অসদাচারণের কারণেই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়েছে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন এবং দেশে কৃত্রিম রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে বিচারকদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করছেন এসব সকল দোষেই তিনি নিজেই দুষ্ট। তাই তো রসিকজনদের মুখে সোভা পাচ্ছে, ‘চালুনীর পেছন ঝড়ঝড়ে, চালুনী সূঁচের বিচার করে’। তিনি রায়ের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মুন সিনেমা হলের মালিকানা সংক্রান্ত মামলায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল করেছিলেন। তিনি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় পরিবর্তন করে যে খারাপ নজীর সৃষ্টি করেছেন যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তাই সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে মানুষ নসিহত করতেও ছাড়ছেন না বরং অনেকটা খেদোক্তি করেই বলছেন, ‘আপনা আচরি ধর্ম পরকে শিখাও’। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির জন্য এর চেয়ে বড় অসম্মানের কথা আর কী-ই বা হতে পারে। 

smmjoy@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ