ঢাকা, শুক্রবার 25 August 2017, ১০ ভাদ্র ১৪২8, ০২ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

[আট] 

জিবলু রহমান: প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রায়ে লিখেছেন, বিচারপতিদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কয়েকটি দেশে আচরণবিধি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারপতিরা নিজেরাই এটা তৈরি করেছেন আবার কোথাও সরকার আচরণবিধি তৈরি করে দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, বিচারপতির আচরণ নিয়ে ব্যাঙ্গালোর নীতিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, নিষ্ঠা, সমতা, যোগ্যতা, সভ্য-ভব্যতা ও অধ্যবসায়ের মতো মূল্যবোধ থাকতে হবে ।

এ মামলার রায়ে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, বিচারপতিরা সর্বশক্তিমান আল্লাহ, দেশের আইন, নিজের বিবেক ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, একজন বিচারক সর্বশক্তিমান আল্লাহ, দেশের আইন, তার বিবেক, জনগণ, আপিল বিভাগ কর্তৃপক্ষ এবং রায় প্রকাশের ক্ষেত্রে মামলাকারীর কাছে জবাবদিহি করবেন। বিচারের যুক্তিই বিচারকের ব্যাখ্যা।

তিনি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন : হে ইমানদাররা, ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় থাক। কারণ আল্লাহ তা দেখছেন। যদি তা তোমাদের নিজেদের, তোমাদের বাবা-মায়ের অথবা তোমাদের আত্মীয়দের বিরুদ্ধেও যায়। হোক সে ধনী অথবা গরিব। আল্লাহ উভয়ের ক্ষেত্রে (তোমাদের চেয়ে) উত্তম সুরক্ষাদানকারী। কাজেই লোভের বশবর্তী হয়ে তোমরা যেন ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে না যাও। যদি তোমরা সাক্ষ্য বিকৃত কর অথবা তা দিতে অস্বীকার কর তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত (পবিত্র কোরআন : ৪ : ১৩৫)।

বিচারপতি ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা এখন বহু দেশেই বহুল প্রচলিত বাণীর মতো। জনগণ প্রায়ই বিচারকদের যে সমালোচনা করে থাকেন তা হল-তারা সামাজিকভাবে জবাবদিহিতার মধ্যে আসেন না। তারা জনগণের প্রয়োজন ও স্বার্থ রক্ষায় সাড়া দেন না।

তিনি বলেন, জবাবদিহিতা মানে দায়বদ্ধতা। বিচারকের জবাবদিহিতা আর গণতন্ত্রে নির্বাহী বা আইন বিভাগ অথবা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা একই রকম নয়। এর কারণ অন্যান্য সংস্থা থেকে যেমনটা করা হয় তা থেকে ভিন্নভাবে বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা আশা করা হয়।

রায়ে তিনি তিনটি বিভাগের কাজের ধরন ব্যাখ্যা দেন এভাবে-নির্বাহী বিভাগ স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করে। দেশ কিভাবে চলবে সেই সিদ্ধান্ত নেয় এ বিভাগ। আইন বিভাগ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। নির্বাহী বিভাগের প্রস্তাব অনুসারে অর্থ সরবরাহের নীতি প্রণয়ন করে এ বিভাগ। বিচার বিভাগের হাতে থাকে ব্রেকের নিয়ন্ত্রণ।

তিনি লিখেছেন, বিচারপতিরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে অবশ্যই। কাজেই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসনের মাধ্যমে বিচারিক একনায়কত্বের অবসান সম্ভব। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গ। বিচারপতিদের সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। একজন বিচারপতি হলেন ন্যায়বিচারের প্রতিভূ। কাজেই তার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর তার কালো ছায়া পড়ে।

তিনি লিখেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে জবাবদিহিতার বাইরে থাকা নয়। বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা মূূলত সাধারণ জনগণের কাছে। বিচার বিভাগের দরকার জনগণের সমর্থন এবং এই সমর্থন অবশ্যই অর্জন করে নিতে হয়। এই সমর্থন আদায়ের উত্তম পন্থা হল এটা নিশ্চিত করা যে জনগণ যেন তাদের সিদ্ধান্ত বুঝতে পারে। বিচারিক আদালতের (বিচারপতি) জবাবদিহিতা আপিল বিভাগের কাছে এবং তারপর আপিল ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতে। জনগণের জন্য বিচার প্রক্রিয়া উন্মুক্ত রাখলে এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

বিচারপতি ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, কেউ কেউ মনে করেন বিচারপতিরা একই সঙ্গে স্বাধীন এবং চরমভাবে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে পারেন না। এমনকি ব্যাখ্যামূলক জবাবদিহিতাও বিচারিক স্বাধীনতার জন্য মানানসই নয় বা বিপজ্জনক। লর্ড কুক বলেছেন, বিচারপতিদের জবাবদিহিতা হবে মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণ। অন্যথায় বিচারপতিদের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা বিপন্ন হতে পারে।

মোহাম্মদ সি ওথম্যান তার ‘বৈধতা, জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের কার্যকারিতার জন্য বিচারিক স্বাধীনতা’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, জবাবদিহিতার জন্য বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজগম্য বা অবারিত, স্বচ্ছ, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং কার্যকর রাখতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া বোধগম্য, জনগণের জন্য উন্মুক্ত এবং সিদ্ধান্তসমূহ মুক্ত ও দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তিনি লিখেছেন, জবাবদিহিতা মানে বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাজ, সিদ্ধান্ত, কার্যকারিতা এবং বিচারিক কর্মকর্তাদের আচরণ ও পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী থাকতে হবে। জবাবদিহিতা থাকলে স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততাও সহজ হয়। এতে আইনের চোখে সবাই সমান তার গ্যারান্টি মেলে। গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ে, বিচার বিভাগ ও পুুলিশের মতো সংস্থার ওপর জনগণের আস্থার সংকট দূর হয়।

বিচারপতি ফয়েজ লিখেছেন, বিচারপতিরা উন্মুক্ত আদালতে বসেন। তাদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। বিচার বিভাগ তাদের কাজের মূল্যায়ন করে। তারা সিদ্ধান্তের জন্য কারণ ব্যাখ্যা করতে আইনত বাধ্য। তাদের নিয়ে গণমাধ্যমে মন্তব্য করা হয়। আইনগত কারণে তাদের কর্তৃপক্ষ সরিয়ে দিতে পারে। তারা সহকর্মীদের কাছে জবাবদিহি করেন। দায়মুক্তি সংস্কৃতি নির্মূল করা, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন সমাজ নির্মাণ এবং ব্যক্তির মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের জন্য বিচারিক জবাবদিহিতা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ