ঢাকা, শনিবার 26 August 2017, ১১ ভাদ্র ১৪২8, ০৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

জিবলু রহমান : [নয়]
বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রায়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান আইনি সার্বভৌম ক্ষমতা তিনটি বিভাগের ওপর ন্যস্ত করেছে। আইন বিভাগ তথা সংসদ আইন প্রণয়ন করবে, নির্বাহী বিভাগ আইন বাস্তবায়ন করবে এবং সংবিধানের বেঁধে দেয়া সীমানার মধ্যে থেকে বিচার বিভাগ আইনের ব্যাখ্যা দেবে। তবে সংবিধানের কোথাও ক্ষমতার পরিপূর্ণ পৃথকীকরণ সম্পর্কে বলা হয়নি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমের ঘটনা ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে তিনটি বিভাগের মধ্যে সমঝোতা সূত্র অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তাহলে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে না।
তিনি লিখেছেন, ভারতের সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। সরকারের অন্য দুটি বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ যথেষ্টই স্বাধীন। সংবিধানের ব্যাখ্যার অধিকারও বিচার বিভাগের। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে, যাকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা। সংবিধানের সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং এর পক্ষাবলম্বনের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য ভারতে তিনটি বিভাগের মধ্যেই চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস রয়েছে। এতে কেউ সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না। তিনি লিখেছেন, তিনটি বিভাগেরই একে অন্যের ক্ষমতার লাগাম টানার সক্ষমতা থাকতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে। আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা সংসদের, নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রিসভার হাতে আর বিচার বিভাগের কর্তৃত্ব থাকবে সুপ্রিমকোর্টের হাতে।
বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী লিখেছেন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ মানে বিচারিক জগতে বিচার বিভাগ স্বাধীন ও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিচারিক কাজের সর্বময় ক্ষমতা বিচার বিভাগের। নির্বাহী ও আইন বিভাগ বিচার বিভাগের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
এটা সত্য যে, কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই ক্ষমতার চূড়ান্ত পৃথকীকরণ অথবা এর একদম অনুপস্থিতি থাকতে পারে না। সরকারের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব যথেষ্ট জটিল এবং কেন্দ্রীভূত। ফলে সরকারের বিভাগগুলোর মধ্যে সহজাত প্রতিযোগিতা ও সংঘাত রয়েছে। সংসদ ও বিচার বিভাগের উচিত তাদের মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। রায়ে তিনি মত দিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সুশাসনের জন্য ক্ষমতার পৃথকীকরণের ধারণা একটি আদর্শ। রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ তিনটি পৃথক কাজ করে এবং এর মাধ্যমে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। তবে আমাদের সংবিধানে ক্ষমতার পৃথকীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
তিনি লিখেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকে কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। এতে প্রত্যেকেরই পৃথক দায়িত্ব ও স্বাধীনতা থাকে, যাতে একটি বিভাগের ক্ষমতার সঙ্গে আরেকটি বিভাগের সংঘাত না হয়। সাধারণত তিনটি বিভাগ থাকে-আইন, নির্বাহী ও বিচার। ক্ষমতার পৃথকীকরণ এ কারণে করা হয় যাতে একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের মূল কাজে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতা যাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, ভারসাম্য থাকে এবং কোনো একটি বিভাগ যাতে সর্বময় হতে না পারে। যে সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতার পৃথকীকরণ থাকে সেখানে প্রত্যেকটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য দরকার। চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস বা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা হয়। এ ব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
রায়ে তিনি লিখেছেন, নিউজিল্যান্ডের সংবিধান সাংবিধানিক সুরক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতার পৃথকীকরণ করেছে। নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত প্রায়ই আইন বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। আইন বিভাগের (সংসদের) সদস্যরা নির্বাচিত হন আনুপাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলে একক কোনো দল সাধারণত সরকার গঠন করতে পারে না, জোট সরকার হয়। বিচার বিভাগ সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত। আইনের কোনো ব্যাখ্যা যদি সরকারের মনঃপূত না হয় তবে সেটা পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয় নির্বাহী বিভাগ। তবে নির্বাহী বিভাগ সরাসরি কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে সেটা পর্যালোচনা কিংবা পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে বা অনুরোধ করতে পারেন না। আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বিচার বিভাগ বা তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়ার এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের নেই। নির্বাহী বিভাগকেও নির্দেশ দিতে পারে না বিচার বিভাগ।
তিনি লিখেছেন, হজরত ওমর (রা.) রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করার মত দিয়েছিলেন। তিনি হজরত আবু দারদাকে (রা.) মদিনার, হজরত আবু মুসা আল আশরিকে কুফার এবং হজরত সুরেকে বসরার বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারা যেন পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে স্বাধীনভাবে বিচার করেন সেই ফরমান জারি করেন হজরত ওমর (রা.)। ফরমানে বলা হয়, বিচারের ক্ষেত্রে আইনের চোখে সবাই সমান।
বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার লিখেছেন, নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। এটা আইনের শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যথায় বিচারের ওপর জনগণ আস্থা হারাবে। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। এজন্য ঘোষিত নীতি থাকতে হবে এবং কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বিচারপতিরা যেন কোনো মহলের বাধা, অযাচিত প্রভাব, প্রলোভন, চাপ, হুমকি ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। বিচারপতিদের নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার বাধাহীন ক্ষমতা থাকতে হবে। যেখানে নিজের বিবেক ও বিদ্যমান আইনই মুখ্য হবে। তিনি লিখেছেন, অন্যান্য দেশে কোনো ব্যক্তিকে উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের আগে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মেধার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করা হয়। যারা সংবিধান ও জনগণের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন তাদেরকেই নিয়োগ দেয়া হয়। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করেই বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। আগেকার দিনে প্রধান বিচারপতি তার সহকর্মী ও সিনিয়র বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন যে কাকে হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ দেয়া যায়। এরপর সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হতো। কিন্তু এখন আর সেই ব্যবস্থাও বিদ্যমান নেই। এখন নির্বাহী বিভাগ একটি তালিকা তৈরি করে নিয়মরক্ষার জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠান। মনে হতে পারে যে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় একটি পোস্ট বক্স।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ