ঢাকা, সোমবার 28 August 2017, ১৩ ভাদ্র ১৪২8, ০৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

করনাই-হাটপাড়ার মানুষপোড়া আঁশটে গন্ধ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আগুনঝরা গনগনে দিনগুলো অতিক্রম করছি। প্রতিদিনই দুঃসংবাদ আসছে। তবে সহস্র দুঃসংবাদের মধ্যে অন্তত একটা সুসংবাদ ছিল। আর সেটা হলো: স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের মনে আতঙ্ক। কখন কী হয় বলা মুশকিল। সবার মাঝে ভয়। উদ্বেগ। চরম উৎকণ্ঠা। সীমাহীন অনিশ্চয়তায় দিনযাপন করছে সারাদেশের মানুষ। আমাদের এলাকাটিও এর বাইরে নয়।
দিনাজপুর, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, বোচাগঞ্জে লুটপাট হয়েছে। বাঙালি, বিহারি কেউ রেহাই পায়নি। প্রথমে বিহারিরা লুট করে বাঙালিদের বাড়িঘর, দোকানপাট। তারপর বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কোথাও কোথাও প্রতিশোধও নেয়। পাকিস্তানি আর্মি এলাকায় ঢোকবার আগেই সবশেষ। অনেক লোকও মারা যায় এসময়। এরপর এসব শহর ও থানা এলাকায় পাকিস্তানি আর্মি ঢুকে ক্যাম্প স্থাপন করলে আবারও লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটে অবলীলায়।
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, সৈয়দপুর, বোচাগঞ্জ, পীরগঞ্জ প্রভৃতি শহর ও থানা এলাকায় আর্মি, পুলিশ, রেজাকার ক্যাম্প থাকলেও জাবরহাট, করনাই, হাটপাড়া, চন্দরিয়া, বৈরচুনা এসব এলাকা ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শত্রুমুক্ত। তবে বোচাগঞ্জ, হরিপুর, আটোয়ারী, দেবীগঞ্জ ও রাণীশংকৈল থানা এলাকা ছিল আর্মি, পুলিশ ও রেজাকার বাহিনীর কবজায়।
পীরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে পাক আর্মি, পুলিশ, রেজাকার ও আলবদরদের দাপট থাকলেও করনাই, হাটপাড়া, চন্দরিয়া, গিলাবাড়ি বা এসব গ্রামের আশপাশে দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী পাকসেনা, পুলিশ বা তাদের কোনও সহযোগীকে দেখা যায়নি। তবে একদিন রেজাকারদের একটি ছোটদল বন্দিয়ারা-বড়বাড়ি গ্রাম হয়ে জাবরহাট পর্যন্ত এসে খুব দ্রুত সটকে পড়ে। কারণ এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল খুব দৃঢ় এবং সার্বক্ষণিক।
জাবরহাট, করনাই, হাটপাড়া, চন্দরিয়া, মালঞ্চাসহ আশপাশের এলাকা মোটামুটি সমৃদ্ধ। হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে বসবাস করে। কারুর মধ্যে বিরোধ বা বৈরিতা নেই। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন চমৎকার। সামাজিক সম্পর্কও সুদৃঢ়। স্বাধীনতাযুদ্ধ যখন তীব্রতর হয়ে ওঠে তখন এ এলাকার পরিস্থিতিও বেশ উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। এলাকার কিছু উদ্দেশ্যবাদী স্বার্থহাসিলের জন্য তৎপর হয়। সুযোগ বুঝে রাতারাতি বড়লোক হবার স্বপ্ন দেখে। ন্যায়-অন্যায় বিসর্জন দিয়ে বসে। লুটপাট, রাহাজানিসহ অন্যের বাড়িঘর এমনকি বউ-ঝিদের প্রতি কুনজর দেবার দুঃসাহস দেখায়।
যুদ্ধের সময়টাতে একদিকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি; অন্যদিকে উদ্দেশ্যবাদীদের লুটতরাজ এলাকাটিকে বিশৃঙ্খল করে তোলে। সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তা। সবার মনে আতঙ্ক। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে এক গভীর রাতে করনাই ও হাটপাড়া গ্রাম দুটোয় ব্যাপক হামলা চালানো হয়। প্রচণ্ড গোলাগুলি। অগ্নিসংযোগ। নারীশিশুসহ মানুষের আর্তচিৎকার। বুকফাটা কান্নাকাটি। মানুষ আর গোয়ালে জ্বলন্ত গবাদি পশুর গোঙানিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। অসহায় মানুষ ও গরু-ছাগলপোড়ার উৎকট গন্ধে ভরে যায় রাতের পরিবেশ।
করনাই গ্রামের সঙ্গে লাগোয়া আমাদের ছোটগ্রাম গিলাবাড়ি। আমরা সবাই ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেশ দূরে একটি পুকুরের পাটক্ষেতে লুকিয়ে থেকে রাতকাটালাম। আশপাশের সবার একই অবস্থা।
ভোর পর্যন্ত গ্রাম দুটোয় তাণ্ডব চলে। বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সকালে ১৯ জনের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এদের মধ্যে অনেকেই নারী ও শিশু। নিহতরা অনেকেই গুলিবিদ্ধ। কেউ কেউ অগ্নিদগ্ধও। আহতও হন অনেক। এদের কেউ কেউ এখনও সেই ভয়াল রাতের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন।
একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটি হচ্ছে : এ অঞ্চলে সাচ্চল্লিশে দেশবিভাগের পর ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু লোক বসতি গড়েন। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা থেকেও নদীসিকস্তির শিকার অনেকে এ এলাকায় এসে খাসজমিতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা অনেকেই বেশ প্রভাবপ্রতিপত্তিসম্পন্নও হয়ে ওঠেন। এটাই স্থানীয়দের অনেকের কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনগুলোতে একশ্রেণির অসৎ অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধার মুখোশ পরে স্থানীয় কারুর কারুর ইন্ধনে হাটপাড়া ও করনাই গ্রামের বাদিয়াপাড়ায় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা মুখোশপরাদের লুটপাটসহ নানা অপকর্ম পছন্দ না করলেও করনাই-হাটপাড়া ও চন্দরিয়ায় অগ্নিসংযোগসহ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে পারেননি। এটাই হচ্ছে এলাকার জন্য সেসময়কার সবচাইতে অনাকাক্সিক্ষত ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।
উল্লেখ্য, সেসময় ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং পরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল থেকে আসা এ এলাকায় বসতিস্থাপনকারীদের স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'বাদিয়া'।
একই কারণে হরিপুর ও রাণীশংকৈলেও সেসময় বসতিস্থাপনকারীদের ওপর জুলুম চলে। ঘটে অনেক হত্যাকাণ্ডও। তবে এই বসতিস্থাপনকারীদের কেউ কেউ যেমন রেজাকার ও আলবদরে যোগ দিয়েছিল সামান্য বেতন ও রেশনের আশায়। তেমনই স্থানীয়দেরও অনেকে রেজাকার-আলবদরে যোগ দেয়। 'রেজাকার' শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে 'স্বেচ্ছাসেবক'। পরে পাকবাহিনীর এই সহযোগীদের কারুর কারুর দুষ্কর্মের জন্য এদের 'রাজাকার' বলে গালি দেয়া শুরু হয়।
করনাই ও হাটপাড়া ম্যাসাকারের কিছুদিন পর চন্দরিয়া গ্রামেও হামলা চলে। এখানেও ঘটে মর্মান্তিক হত্যাকা-। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। চলে লুটপাটও। এই খুনি ও হামলাকারীরা না ছিল পাকিস্তানি আর্মি, পুলিশ অথবা রেজাকার-আলবদরের কেউ। কিন্তু এদের জুলুম-নির্যাতন ছিল পাক আর্মির  চাইতেও ভয়ঙ্কর ও লোমহর্ষক। নারীশিশুসহ এই সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করা কি মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়? এ হত্যাযজ্ঞের বিচার হয়নি। কোনওদিন হবে বলেও মনে হয় না। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের মূল নায়করা স্থানীয় ছোটবড় প্রায় সকলেরই পরিচিত। জানাশোনা।
উল্লেখ্য, সেসময় এলাকার প্রায় সব অপকর্মের নটের গুরুটি কয়েক বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তবে তার সহযোগীরা এখনও এলাকায় দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলা হতে পারে। এরা যেসব অপরাধমূলক কর্মকা- করেছে তাতে মৃত্যুদ- হওয়াই স্বাভাবিক।
সেই ভয়াল রাতের ঘটনার পর করনাই-হাটপাড়ায় বসতিস্থাপনকারীদের প্রায় সবাইকে এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়। কেউ কেউ ভারতে গিয়েও আশ্রয় নেন। নয় মাস পর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে দেশ স্বাধীন হয়ে গেলেও স্থানীয় নেতাদের রহস্যজনক বৈরিতার কারণে তারা দীর্ঘদিন বিরান বাড়িঘরে ফিরতে পারেননি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ত্রাণশিবির স্থাপন করে প্রায় দুই-আড়াই বছর সেখানে তাদের রাখা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কানে বিষয়টি গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁর নির্দেশেই বিরান ভিটেমাটিতে বাদিয়াদের ফিরবার সুরাহা হয়।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেছিলেন বাদিয়ার বাড়িঘর তো তারা লুট করেছেনই ; এবার জায়গাজমিও দখল করে নেবেন। কিন্তু ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে তাদের সে দুরাশা আর পূরণ হয়নি।
সেসময় এ এলাকার অনেকের খালি বাড়িঘর লুট হয়। ভারতের শরণার্থীশিবির থেকে এসে শরণার্থীরাই নিজেদের বাড়িঘর ভেঙে এবং অন্যের গাছগাছড়া, বাঁশের ঝাড় কেটে নিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল দেশে আর সহজে ফেরা যাবে না। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পর শরণার্থীরা দেশে ফিরলে তাদের বাড়িঘর, গাছপালা লুটের দায় চাপাতে চায় ভারতে না গিয়ে যারা দেশে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, খাইয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের ওপর। এটা দুর্ভাগ্যজনক ও ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কী!
এলাকার গাছগাছড়া, বাঁশঝাড়, ফলবান বৃক্ষ প্রায় সবই লুটে নেয় লুটেরার দল। এমনকি হাটপাড়া-করনাই গ্রামের স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ সব লুট হয়ে যায়। মাদরাসা-মসজিদের টিন পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয় দিনে-দুপুরে। এ ইতিহাস কি এলাকার নতুন প্রজন্ম জানে? প্রবীণদের মনে আছে কি সেই ভয়াল রাতের দুঃসহ স্মৃতি? মনে তো থাকবার কথা।
বলতে দ্বিধা নেই, এই লুটেরা খুনিদের দ্বারা আমরাও পারিবারিকভাবে যারপর নেই ক্ষতিগ্রস্ত হই। অন্যদের সঙ্গে আমাদের বাড়িঘর, হালের বলদ, দুধেল গাভি সবই লুট হয়। আর এসব করে আমাদের পরিচিতরাই। সব ঘটনা আমি জানতাম বলে আমার জীবনও বারবার বিপন্ন হয়ে পড়ে সেসময়। কিন্তু আল্লাহ আমাকে হিফাজত করেন।
উল্লেখ্য, করনাই-হাটপাড়ার মাদরাসা-মসজিদ সব চালু হয়েছে। নতুন নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় সবাই বাড়িঘরে ফিরেছেন। ফেরেননি কেবল সেরাতের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতভাগ্য মানুষগুলো! 
এলাকাটি মানুষের পদচারণায় আবারও গমগম করছে। বসেছে বাজারহাটও। সেসময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। এখন তাও এসেছে। কিন্তু সেই কালরাতের গোঙানি অন্য কেউ শোনেন কিনা জানি না। আমি শুনি! জীবন্ত নারীপুরুষ ও নিরপরাধ শিশুর গায়ে আগুন জ্বলবার সেই মর্মন্তুদ ও বীভৎস দৃশ্য আমার চোখে আজও ভেসে ওঠে ! জ্বলন্ত মানুষের 'বাঁচাও বাঁচাও' আর্তনাদ এখনও প্রতিধ্বনিত হয়। করনাই-হাটপাড়ার পথ দিয়ে হাঁটলে সে নিষ্ঠুর রাতের বারুদের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আর মানুষপোড়া আঁশটে গন্ধ আমি টের পাই। ভেতরটা যেন এখনও আঁতকে ওঠে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ