ঢাকা, মঙ্গলবার 29 August 2017, ১৪ ভাদ্র ১৪২8, ০৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অবশেষে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের উদ্বোধন ১০ সেপ্টেম্বর

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নানা অজুহাতে ব্যয় ও নির্মাণের সময় দফায় দফায় বাড়িয়ে যে উড়াল সড়কটি (ফ্লাইওভার) নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়ে নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটির কাজ এখন শেষ। এখন এটি উদ্ধোধনের প্রহর গুনছে। আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধনের পরই যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করবেন বলে গতকাল সোমবার জানিয়েছেন প্রকল্পটির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক। যানজট নামক যন্ত্রণা থেকে রাজধানীবাসীকে নিস্তার দিতে উন্নয়নের দীর্ঘ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ানো এই আলোচিত প্রকল্পটির নাম ‘মগবাজার-মৌচাক’ উড়াল সড়ক (ফ্লাইওভার)।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে যখন এই ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর পর কয়েক ধাপে ব্যয় বেড়ে হয়েছে এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। তিনটি উৎস থেকে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে, এর মধ্যে সরকার অর্থায়ন করেছে ৪৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ৭৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা অর্থায়ন করেছে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি)।এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। 

চার লেনের এ ফ্লাইওভারে ওঠানামার জন্য ১৫টি র‌্যাম্প রয়েছে। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, বাংলামটর, মগবাজার, মালিবাগ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং শান্তিনগর মোড়ে ওঠানামা করার ব্যবস্থা রয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেয়া হচ্ছে রাজধানীর মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার। ঈদের পর প্রধানমন্ত্রী সময় পেলে তিনি ফ্লাইওভারটির উদ্বোধন করবেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এরই মধ্যে উড়াল সড়কটির কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে ধোয়ামোছার কাজ। ঈদের আগেই এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া চেষ্টা চললেও প্রধানমন্ত্রীর সময় না পাওয়ায় সময়টা পিছিয়ে গেছে।

গতকাল সোমবার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ বলেন, “ফ্লাইওভারের কাজ শেষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঈদের আগে সময় দিতে পারছেন না। ঈদের পরপরই সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি উদ্বোধন করবেন। এরপর সে ফ্লাইওভার দিয়ে যান চলাচল শুরু হবে।”

জানা গেছে, ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ তিন ভাগে করা হয়েছে। একটি অংশে রয়েছে সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত, আরেকটি অংশে শান্তিনগর-মালিবাগ-রাজারবাগ পর্যন্ত এবং শেষ অংশটি বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক পর্যন্ত।

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ ফ্লাইওভারের হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত অংশটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা উদ্বোধন করেন। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লাইওভারের ইস্কাটন-মৌচাক অংশের যান চলাচল উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তৃতীয় ধাপে ফ্লাইওভারের এফডিসি মোড় থেকে সোনারগাঁও হোটেলের দিকের অংশটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় এ বছর ১৭ মে। এবার এটির চতুর্থ দফায় উদ্বোধন হবে।

ফ্লাইওভারের কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্পের পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল জানান, তারা চেষ্টা করছেন এটি খুলে দেয়ার। “ফ্লাইওভারের মৌচাক, মালিবাগ অংশের কাজ শেষ। এখন ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে, সেটাও শেষ পর্যায়ে। আমরা ফ্লাইওভারটি চালু করার চেষ্টা করছি। এলজিইডির চিফ ইঞ্জিনিয়ার মহোদয় আমাদের সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন। সেভাবেই কাজ এগোচ্ছে।”

তবে উদ্বোধনের আগেই তাতে যানবাহন চলাচল শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন এ উড়াল সড়কের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক। তিনি গতকাল সোমবার সকালে বলেন, “আমাদের কাজ সব শেষ। এখন ধোয়ামোছার কাজ শেষ। চাইলে এখনই সেখানে যানবাহন চলাচল শুরু করা যায়। আমি এখনও (সোমবার সকাল) ফ্লাইওভারের ওপরে। গাড়ি নিয়ে ঘুরে দেখছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি আগামী ১০ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি। তবে তার আগেও যানবাহন চলাচল শুরু হতে পারে।”

২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৯ কিলোমিটার লম্বা ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। প্রথম ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ। কিন্তু সময় বাড়ানো হয় কয়েক দফা। শেষবার যখন সময় বাড়ানো হয়, তখন বলা হয়েছিল পুরো কাজ শেষ করে চলতি বছরের জুন মাসে উদ্বোধন হবে। কিন্তু সেই কাজ শেষ করতে আরও দু‘মাস লেগে আগস্ট‘র শেষ পর্যন্ত গড়ায়। আর এই বিলম্বের জন্য অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন প্রকল্প পরিচালক।

সরজমিনে উড়াল সড়কে গিয়ে দেখা গেলো কয়েকজন রঙমিস্ত্রী ব্রাশ দিয়ে রঙের আঁচড় দিচ্ছেন। কথা হয় রঙমিস্ত্রি মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রোজার ঈদের পর থেকে রঙ করা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে এখোন কাজ শেষের পথে,আর কয়েকটা দিন লাগবে।’

উড়াল সড়কের দুই পাশের দেয়ালে সাদা রঙ এবং লোহার পাইপে লাল রঙ করা হচ্ছে। পাশেই কাজ করছিলেন ইলেট্রিক মিস্ত্রী শ্রী শ্যামল পাল। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করছি। পিলার বসাচ্ছি। ঈদের আগেই সব কাজ ওকে হয়ে যাবে।’

উড়াল সড়ক পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী জহুরা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা দেড়মাস ধইরে রাস্তা পরিষ্কার করছি তয় কতদিন লাগবে কইবার পারতাম না। আমরা ৫০ জন কাম করতাছি। ফ্লাইওভারের ময়লা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলতাছি, ঝাড়ু দিতাছি।’

দেখা গেলো তাদের কেউ কেউ কোদাল দিয়ে ময়লা অন্য জায়গায় নিতে ব্যস্ত। কেউ শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ময়লা তুলছেন। পাশেই রাজ মিস্ত্রী রবিউল ইসলাম কথার পিঠে কথা তুলে বলেন, ‘কাজ তো প্রায় শেষ। আর বেশিদিন লাগবে না। আমরা এখন জয়েন্টে জয়েন্টে জোড়া লাগানোর কাজ করছি।’

কেউ করছিলেন ঝালাইয়ের কাজ। কেউ কেউ আবার রড কাটছিলেন। পিচ ঢালাইয়ের কাজও চলছে সমান তালে। উড়াল সড়কের উপরে রঙের কৌটার স্তুপ। কোথাও ময়লার স্তুপ। আবার কোথাও কোথাও তাবু টাঙিয়ে ইলেক্ট্রিকের সামগ্রী রাখা হয়েছে।

কথা হয় উড়াল সড়কের সুপারভাইজার আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখন ফিনিসিং এর কাজ চলছে। ঈদের পর পরই শেষ হয়ে যাবে সব কাজ। এখন মূলত ক্যাস বেরিয়ার, এক্সপানসং জয়েন্ট। পাইপ লাইন, ল্যাম্পপোস্টের কাজ চলছে।’ 

জানা গেছে, দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তির সমাধানে রাজধানীতে ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যেগ নেয়া হয়। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভারেরও নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হয় গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। এটির দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার। এরপরই মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। 

২০১১ সালের ৮ মার্চ একনেক এই প্রকল্প অনুমোদন করে। প্রথমে প্রকল্পের আকার ছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে এক হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা করা হয়। ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়।

এই ফ্লাইওভার প্রকল্পটি ঢাকা শহরের স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের (এসটিপি) অন্তর্ভুক্ত। ফ্লাইওভারটি রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে। প্রতিটি পিলার পাইলের গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার গভীর। ফ্লাইওভারটি আটটি মোড় যথাক্রমে- সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর, মালিবাগ, চৌধুরীপাড়া ও রমনা থানা। ফ্লাইওভারটি মগবাজার, মালিবাগ ও সোনারগাঁসহ তিনটি রেলক্রসিং অতিক্রম করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ