ঢাকা, মঙ্গলবার 29 August 2017, ১৪ ভাদ্র ১৪২8, ০৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঈদ যাত্রায় প্রস্তুত লক্কর-ঝক্কর গাড়ি

ইবরাহীম খলিল : বেশ কিছুদিন ধরেই রাস্তায় ফিটনেস বিহীন গাড়ী না চালানোর নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন আইন শৃঙ্খলা-বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রতি বছর ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর অপেশাদার চালকের কারণে সড়কে প্রাণহানি বেড়ে যায় এ আশঙ্কা থেকেই মূলত এই সতর্কতা দেওয়া হয়।  কিন্তু কে শুনে কার কথা। ঈদ সামনে রেখে অনুমোদন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ ও অপেশাদার চালক দ্বারা গাড়ি চালানোর পরিমাণ বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদে গাড়ির সংকট কাজে লাগিয়ে রাস্তায় নামে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি। রাস্তায় দুর্ভোগসহ শত শত প্রাণ হাণি ঘটলেও ভ্রক্ষেপ নেই গাড়ির মালিকদের।
গতকাল সোমবার ফিটনেস বিহীন গাড়ি দমনে রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় মোবাইলকোর্ট বসানোর কথা শোনা যায়। কিন্তু এই খবর আগেই জেনে যায় গাড়ির লোকজন। ফলে তারা মোবাইল কোর্ট এলাকা এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। মোবাইল কোর্টও বসে আবার লক্কড়-ঝক্কড় গাড়িও চলে অবস্থা। গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর কমলাপুর থেকে বাহন নামের একটি গাড়িতে উঠেন এই প্রতিবেদক। প্রথমে গাড়ির চালকের পক্ষ থেকে যাত্রীদের বলা হয় এই গাড়ি মতিঝিল যাবে না। যদিও সব সময় এই গাড়ি কমলাপুর থেকে আরামবাগ, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, পল্টন মোড়  প্রেস ক্লাবের সামনে দিয়ে শাহবাগ হয়ে মিরপুর যায়। কিন্তু গতকাল গাড়িগুলো মতিঝিল যায়নি। আগেই তাদের কাছে খবর আসে যে মতিঝিলে ভ্রাম্যমান আদালত বসেছে। তাই তারা কমলাপুর থেকে আরামবাগের দিকে না গিয়ে পীরজঙ্গির মাযার হয়ে আইডিয়াার স্কুল এ- কলেজের সামনে দিয়ে ফকিরাপুল হয়ে দৈনিক বাংলা হয়ে পল্টন মোড় হয়ে বাসটি গন্তব্যে চলে যায়।
 বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেব অনুযায়ী  দেশে গণপরিবহন সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঈদযাত্রার বহরে নিবন্ধিত যানবাহনের আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার ক্ষেত্রে ২৯ শতাংশ, সিটি সার্ভিসে ৪৭ শতাংশ ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করে। এতে প্রতি বছর ঈদে সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনায় শত শত  যাত্রীকে প্রাণ হারায় এবং কয়েক হাজার যাত্রীকে আহত ও পঙ্গু হতে হয়।
সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রাণহানি বন্ধে অবিলম্বে সকল ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। যাত্রী হয়রারি বন্ধে ভিজিলেন্স টিমকে প্রতিদিন টিকিট কাউন্টারের কার্যক্রম মনিটরিং এবং যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে কাজ করতে হবে।
গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চলছে দেদারছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চলেন। একারণে মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন তাদের পক্ষে লক্কর ঝক্কর গাড়ি ধরা সম্ভব হয় না। ব্যবস্থা নিতে পারে না লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে। এসব  গাড়ি এবং ড্রাইভারদের ধরলে উল্টো সমস্যা হয় রাস্তায় থাকা সার্জেন্টদের।
অপরদিকে অনুমোদন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে বিআরটিএ ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ একে অপরের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু ঈদের সময় এলেই ঠিকই তৎপরতা শুরু হয় লক্কর ঝক্কর গাড়ির। রংচং মাখিয়ে সেগুলো প্রস্তুত করা হয় ঈদের যাত্রী বহনের। বিশেষ করে কম আয়ের লোকজনকে এসব গাড়ি দিয়ে বহন করা হয়। 
মজার বিষয় হলো মনিটরিংয়ের অভাবে ঈদে কতগুলো আনফিট গাড়ি রুটে নামানো হয় তার কোন হিসেব নাই কারো কাছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, অকালে ঝড়ে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ, পঙ্গু হয়ে জীবন যাপন করছে অনেকেই। এরপরও থেমে নেই অতি মুনাফালোভী বাস মালিকরা। এরা ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহণ করে, বাড়তি আয় করতে দীর্ঘ দিনের পুরানো অকেজো পড়ে থাকা বাসগুলো মেরামত ও রং-চোঙ করে রাস্তায় নামাচ্ছে। এসব বাস ঘন ঘন রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ায় ভোগান্তীতে পড়ছে যাত্রীরা।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীতে হঠাৎ কিছু রঙ মাখানো বাসের দেখা মিলে। এসব গাড়ির বেশীরভাগই লক্কর-ঝক্কর মার্কা ফিটনেস বিহীন। রঙ মাখলেও এসব বাসের কোনটি’র গ্লাস ভাঙ্গা, কোনটি’র লুকিং গ্লাস নাই, কোনটি’র সামনের পিছনের বাম্পার খোলা, কোনটি’র জানলার কাঁচ অর্ধভাঙ্গা হয়ে ঝুলে আছে, কোনটি’র বডি দুমড়ানো-মুচরানো। বৃষ্টি এলেই পানি পড়ে যাত্রীদের শরীর ভীজে যায়। অন্যান্য বছরের মত এবারও ঢাকার আশপাশের এলাকায় ওয়ার্কশপগুলো উক্ত লক্কর-ঝক্কর মার্কা পুরানো বাসগুলো মেরামত ও রংকরণ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্যরেজ মালিকরা বলেন, ঈদের আগে প্রতিবছরই পুরাতন গাড়ির মেরামত ও রংকরণ কাজের ধুম পড়ে যায়। তারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পরিবহন শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক শ্রেণীর অতি মুনাফা লোভি গাড়ির মালিকরা ঈদকে টার্গেট করে রাখে। তারাই সুযোগ বুঝে পুরাতন লক্কর-ঝক্কর ফিটনেসবিহীন গাড়ি রং করে রাস্তায় নামায়। এসব গাড়িই মানুষের মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে দাড়ায়। পথিমধ্যে নষ্ট হয়ে সৃষ্টি করে যানজটের। আইনের তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলাচলের অযোগ্য এসব গাড়ি দিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করছে এক শ্রেণির পরিবহণ মালিকরা। সেবা তো দুরের কথা যাত্রীদের কোন নিরাপত্তা নেই এসব ঝুকিপূর্ণ গাড়িতে।
চালকরা বলেন, গাড়ির মালিকরা ত্রুটিপূর্ণ অকেজো গাড়িগুলো কোন মতে মেরামত, রং চং করে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের করার কিছুই নেই।
গাড়ির মালিক ও পরিবহণ নেতারা বলেন, গাড়ির জালানী এবং যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবসায় বেশী লাভ হচ্ছে না। দুই ঈদ এবং পুজার সময় যাত্রীদের চাপ বেড়ে গাড়ির সংকট দেখা দেয়। এসময় একটু বাড়তি আয় করতে পুরাতন গাড়িগুলো ঠিক করে রাস্তায় নামানো হয়। এতে যাত্রী সেবাও হলো আমাদের ইনকামও হলো।এছাড়া গাড়ির ফিটনেস থাকলেও রোডে পুলিশকে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে পুলিশ নানা ধরনের হয়রানি করতে থাকে। ফলে গাড়িগুলো কোন রকম জোড়া তালি দিয়ে চালানো ছাড়া কোন উপায় নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ