ঢাকা, বুধবার 30 August 2017, ১৫ ভাদ্র ১৪২8, ০৭ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হিরোশিমায় বেঁচে যাওয়া ৩৯১ বছরের বনসাই বৃক্ষ

আবু হেনা শাহরীয়া : মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ কলঙ্কের দিন ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। দিনটি নিয়ে বারাক ওবামার কণ্ঠের নির্মম স্বীকারোক্তি-‘৭১ বছর আগে একদিন হিরোশিমার আকাশ থেকে মৃত্যু নেমে এসেছিল। মানবসভ্যতা যে চাইলে নিজেকেই ধ্বংস করতে পারে, সেদিন তা বোঝা গিয়েছিল। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে।’ হ্যাঁ। সে ঘটনারই এক নীরব সাক্ষী ৩৯১ বছরের এক বনসাই বৃক্ষ। বনসাই অর্থাৎ বামনগাছ। তবে দেখতে ছোট হলেও এ গাছটির জীবনকাল অনেক দীর্ঘ। প্রায় ৪০০ বছরের বেশি বাঁচে এ গাছ। এ বনসাই অন্তত সেই সত্যেরই প্রতিধ্বনি করে। উচ্চতায় খাটো, একে জাপানিজ হোয়াইট পাইনও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রবীণ এ বনসাই ‘হিরোশিমা গাছ’ নামেই বেশি পরিচিত। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো দিনের ইতিহাস বুকে লালন করে দাঁড়িয়ে আছে এখনও। কিন্তু কেমন করে এ গাছ পারমাণবিক বোমার নিষ্ঠুর আঘাত থেকে বেঁচে গেছে, আর এখন সে কোথায় আছে? কেমন আছে?
গাছটির জন্ম আনুমানিক ১৬২৫ সালে। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছিল জাপানের হিরোশিমা থেকে মাত্র ২ মাইল দূরে এক সম্ভ্রান্ত ইয়ামাকি পরিবারে। আজ এত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও বেঁচে আছে গাছটি। বহু ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী। গত তিন শতক ধরে বিশ্বজুড়ে ঘটে গেছে বহু ঘটনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অতিক্রম করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং সেখান থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীনতা লাভ, বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক যুগান্তকারী ঘটনা- সব কিছুর সাক্ষী থেকেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ তেমনভাবে না লাগলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হয়ে দেখেছে যুদ্ধের ভয়াবহ নির্মম পরিণতি।
৬ আগস্ট ১৯৪৫ সাল। সময় ৮টা ১৫ মিনিট। জীবিকার জন্য ছুটে চলা হাজার হাজার মানুষের কেউ জানতেন না সেদিন তাদের জীবনে কী ভয়াবহ অন্ধকার নেমে আসছে। জাপানের রাজধানী টোকিও মহানগর থেকে ৫০০ মাইল দূরে হিরোশিমা শহরের ওপরে ঘটে গেল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম নৃশংসতা। প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপে ইতিহাস সৃষ্টি করল যুক্তরাষ্ট্র। বোমাটির ডাকনাম যদিও ছিল ‘লিটল বয়’, তার কার্যক্রম কিন্তু মোটেও লিটল ছিল না। যে কোনো নির্মম ধ্বংসযজ্ঞকে হার মানায় সে। সেদিনের সেই ঘটনার জন্য আজও জাপানবাসী প্রতিনিয়ত মাশুল দিয়ে যাচ্ছেন। বোমার তীব্রতার কারণে দুই কিলোমিটারের মধ্যে যত কাঠের স্থাপনা ছিল সব মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ৫০০ মিটার বৃত্তের মধ্যে আলিশান দালানগুলো চোখের পলকে ভেঙেচুরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ৫ বর্গমাইল এলাকা মোটামুটি ছাই এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সময় হিরোশিমা নগরীর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। পারমাণবিক বোমার তীব্রতায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার অধিবাসীর মৃত্যু ঘটেছিল। আহত হয় আরও কয়েক লাখ মানুষ। শুধু তাই নয়, এ বিধ্বংসী পারমাণবিক বোমার অভিশাপের নির্মম শিকার হয় পরবর্তী প্রজন্মও। বেঁচে ফেরা অনেক পরিবারে জন্ম নিতে থাকে বিকলাঙ্গ শিশু।
হিরোশিমার যে এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেখান থেকে মাত্র ২ মাইল দূরে থাকত ইয়ামাকি পরিবার। সে সময় বনসাইটি ছিল ওই পরিবারের সঙ্গেই। বোমার আঘাতের তীব্রতায় এ পরিবারের বসতবাড়ি সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বৈদ্যুতিক সব সংযোগ। বিকল হয়ে পড়ে টেলিফোন লাইন। আশপাশের পরিবারগুলো যে কাউকে সাহায্য করবে সে অবস্থা পর্যন্ত তখন কারও ছিল না। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয়, এত কিছুর পরও কোনো এক অলৌকিক কারণে ওই বিস্ফোরণ থেকে কোনোমতে রক্ষা পায় ইয়ামাকি পরিবার। বেঁচে গিয়েছিল সেই গাছটিও। বোমার চরম বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়ে বেঁচে গেল সেই পরিবার আর তার সঙ্গে এ বনসাই বৃক্ষটি। এরপর থেকে এ গাছের নাম হয়ে যায়- হিরোশিমা বনসাই।
এরপরের কাহিনী আরও চমকপ্রদ। ইতিহাস তার যোগ্যতম স্থান খুঁজে নেয়- এ কথার যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন সেই ইয়ামাকি পরিবারের এক বংশধর মাসারু ইয়ামাকি। তিনি ১৯৭৫ সালে এ বনসাই বৃক্ষটি দান করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। বর্তমানে এটি রাখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান ইউনাইটেড স্টেটস ন্যাশনাল আরবোরেটুমে।
 কিন্তু খুবই আশ্চর্যের বিষয়, গাছটি যুক্তরাষ্ট্রকে দান করার সময় ইয়ামাকি পরিবারের তরফ থেকে সেদিন জানানো হয়নি, এ গাছটির সঙ্গে হিরোশিমার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কেন? কেনই বা তিনি বা তার পরিবার গাছটি যুক্তরাষ্ট্রকে দিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর এখনও তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। হয়তো তিনি বা তার পরিবার এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার নিষ্ঠুরতার কথা নীরবে জানান দিতে চেয়েছেন। এ বৃক্ষের মধ্য দিয়ে হিরোশিমার ঘটনা মানুষ আবার নতুনভাবে জানতে পারবে, হয়তো বা পরবর্তী প্রজন্ম এ ঘটনা সারা পৃথিবীকে জানান দেবে এমন মনোবাসনা ছিল ইয়ামাকি পরিবারের।
হয়তো ঠিক এ উদ্দেশ্যেই ২০০১ সালে মাসারু ইয়ামাকির নাতিরা যখন এ গাছটি দেখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন সেদিন তারা বিশ্ববাসীর সামনে আনলেন এই সত্য ঘটনা, যা ঘটেছিল আজ থেকে ৭২ বছর আগে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ ইয়ামাকি পরিবারের দেয়া তথ্যকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। এ তথ্য ভিত্তিহীন বলে তারা জানিয়ে দেয়, দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়াতেই এই উপহার দিয়েছিলেন ইয়ামাকি পরিবার। নিশ্চয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মই এ সত্যতার ভিত্তি খুঁজবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ইতিহাসের এক অংশীদার এই হিরোশিমা বৃক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ