ঢাকা, শুক্রবার 01 September 2017, ১৭ ভাদ্র ১৪২8, ০৯ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বকেয়া না পাওয়ায় কাঁচা চামড়া কেনার উদ্যোগ নেই ব্যবসায়ীদের

 

এইচ এম আকতার : কুরবানির চামড়া কিনতে দেয়া ঋণের টাকা খুব একটা কাজে আসবে না। ব্যাংক ঋণের টাকায় চামড়ার বকেয়া পরিশোধ না করে চলছে সাভারের ট্যানারি পল্লী উন্নয়ন কাজ। এতে করে হতাশ হয়ে পড়ছেন সারা দেশের ক্ষুদ্র চামড়ার ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন বকেয়া টাকা পাওয়া না গেলে চামড়া কিনার কোনো পরিকল্পনাই নাই তাদের। আর ট্যানারি মালিকরা বলছেন, এখনও ৫০ ভাগ চামড়া অবিক্রিত রয়ে গেছে। উন্নয়ন কাজ চলায় নতুন করে বেশি চামড়া তারা কিনতে পারছে না। এ অবস্থায় চামড়া পাচারের আতঙ্ক করছে ব্যবসায়ীরা। 

জানা গেছে, সরকার প্রতি বছরই চামড়া কিনতে নতুন করে ব্যাংক ঋণ দিয়ে থাকেন। সে টাকায় সারা দেশের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ করা হলে সে টাকায় কাঁচা চামড়া কিনেন তারা। লবনজাত করে সে চামড়া সংরক্ষন করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পরে ট্যানারি মালিকরা তাদের চাহিদা মত সে চামড়া ক্রয় করে থাকেন।

কিন্তু এ বছর অবস্থা ঠিক তার উল্টো। ব্যাংক ঋণের টাকা বকেয়া পরিশোধ না করে সাভারের ট্যানারি পল্লীতে কারখানা তৈরি করছে মালিকরা। তারা বলছেন, আমাদের রফতানি অর্ডার বাতিল হওয়াতে গত বছরের চামড়াই অবিক্রিত রয়ে গেছে। নতুন চামড়া কিনে কি হবে। তা ছাড়া এ বছর অনেকে ব্যাংকের আগের ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। আর যারা পরিশোধ করতে পারেনি তারা নতুন করে ঋণ পায়নি। আর এ কারণেই তারা নতুন করে চামড়া কিনতে পারছে না। একইভাবে বকেয়াও পরিশোধ করতে পারছে না।

তাই সাভারে পুরোদমে কাজ শুরু না করা পর্যন্ত সংকট থেকেই যাচ্ছে। ট্যানারি শিল্পের জন্য কাঁচা চামড়ার বড় অংশ আসে ঈদুল আজহায়। তাই প্রতিবছরই চামড়া সংগ্রহ করতে ঋণ দিয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। এবারও প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়,  অনেকই ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে আর ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। তাছাড়া রয়েছে চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। অনেকে আবার ঋণ না পেয়ে পুঁজির অভাবে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। এ অবস্থায় চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে স্থানীয়দের অনেকেই গড়ে তুলেছেন অটোবাইক ও রিকশার দোকান। ফলে চামড়াপট্টি এখন পরিণত হয়েছে অটোপট্টিতে।

এখনো পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ীর দাবি,  সরকারিভাবে চামড়া কেনাবেচায় নীতিমালা তৈরি,  চামড়া শিল্পে ঋণের ব্যবস্থাসহ কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। চামড়া শিল্পে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রংপুরের চামড়া ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে,  এ অঞ্চলে চামড়া কেনাবেচার সবচেয়ে বড় হাট হচ্ছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানার কালিবাড়ী হাট। সপ্তাহে দুদিন শনি ও বুধবার এখানে হাট বসে। এছাড়া লালমনিরহাটের বড়বাড়ী,  চাঁপারহাট ও রংপুরের তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জেও ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনাবেচা করেন।

চামড়া ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান,  চামড়াপট্টি থেকে এখনো প্রতি সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার পিস গরুর চামড়া কালিবাড়ী হাটে আসে। বর্তমানে ভালো মানের চামড়া প্রতি পিস ৫০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া খাসির চামড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পলাশবাড়ী চামড়া হাটে রিলায়েন্স,  বিএলসি,  আরকে লেদার,  আজমেরি লেদার,  পান্না লেদার,  মুক্তা ও মুক্তি ট্যানারির প্রতিনিধিরা চামড়া কিনে থাকেন।

তবে এই ঋণ খুব একটা কাজে আসবেনা বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন,  হাজারিবাগ থেকে উচ্ছেদের কারনে অনেকেরই গত বছরের চামড়া অবিক্রিত রয়ে গেছে। তাই আগের ঋণই পরিশোধ করতে পারেননি ট্যানারি মালিকরা। আর কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারকরা বলছেন,  ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা বকেয়া পরিশোধ করা না হলে এবার চামড়া সংগ্রহ করাই কষ্ট হয়ে যাবে তাদের জন্য। তারা বলছেন,  একদিকে হাজারিবাগে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি সাভারের আধুনিক চামড়া শিল্পনগরী। তাই এবারের কোরবানির ঈদের চামড়া সংগ্রহ নিয়ে সংকট এবং দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। 

চট্টগ্রাম, নাটোর এবং যশোরের চামড়ার ব্যবসাযীরা এখনও তাদের চামড়া বকেয়া টাকা পায়নি। এ কারনে তারা নতুন করে চামড়া কিনার পরিকল্পনাও করতে পারেনি এখন পর্যন্ত। তারা সামনে শুধু অন্ধকার দেখতে পাচ্ছেন। তারা ভরছেন, অতীতে চামড়া ব্যবসায়ীরা এত বড় দুর্যোগ আর আসেনি। তারা এ অবস্থায় কি করবে তা বুঝতে পারছে না।

এদিকে চামড়ার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সরকার কুরবানির চামড়া সংরক্ষনের জন্য ৫ লাখ লবন আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজে আসেনি। তার কোনো প্রভাবও নেই বাজারে। ৬৫০ টাকা বস্তার লবন এখনও বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১২ থেকে ১৩’শ টাকা। প্রতি বস্তা লবনে দাম বেড়েছে প্রায় ৬৫০ টাকা।এতে করে লোকসানে আশঙ্কা করছেন কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন প্রতিটি চামড়া সংরক্ষনের তাদের যেখানে লবনে খরচ হওয়া কথা ছিল ৭০ টাকা। সেখানে তাদের এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা।

অথচ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাজার মনিটরিং নেই। আর এ সুযোগে ইজেদের ইচ্চঅ মত কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে লবন ব্যবসায়ীরা। আর ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা। যেখানে পুঁজির অভাবে চামড়াই কিনতে পারছে না ব্যবসায়ীরা সেখানে লবন সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে লা পাত্তা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এসব দেখার কেউ নেই।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ জানান,  গত বছর কোরবানির ঈদে ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি করা হয়েছিল। এ বছর এখন পর্যন্ত ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু প্রস্তুত আছে। আইনগত বিষয় ঠিক থাকলে এবার ভারতীয় গরু আনা প্রয়োজন হবে না। ১ হাজার কেজি ওজনের বাহামা জাতের গরু উৎপাদনে খামারিদের উৎসাহিত করেন প্রতিমন্ত্রী।

এজন্য দেশের পশু খামারিরা ব্যস্ত কুরবানীর পশু প্রস্তুত নিয়ে। দেশে এবার পশুর কোনো সঙ্কট নেই। কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা একটি মহলের সহযোগিতায় হঠাৎ করেই ভারত থেকে গরু আসা শুরু হয়েছে। এতে করে শঙ্কায় পড়েছে দেশীয় পশু ব্যবসায়ীরা। ২০১৬ সালে কুরবানীর ঈদের আগে জুলাই ও আগস্ট মাসে একমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে ১২ হাজার ৭৯৮টি গরু এসেছিলো। অথচ এবছর শুধু জুলাই মাসেই গরু এসেছে ৬৮ হাজার ৫০১টি। যা গত বছরের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,  চলতি ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ১৭ হাজার গরু এসেছে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে,  গরু আসার পরিমাণ ততই বাড়ছে।

সরকারি হিসাব মতে, এখন পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে বৈধভাবে মাসুল দিয়ে ভারত থেকে গরু এসেছে ১ লাখ ৩২ হাজার। আর অবৈধভাবে গরু এসেছে সাড়ে আট লাখের বেশি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হাটগুলোতে ভারতীয় গরুতে সয়লাব।

 বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন যদি চামড়ার ব্যবসায়ীরা বাকি টাকা না পায় তাহলে তারা চামড়া কিনবেন কি দিয়ে। এখনও প্রায় ৩ শ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে ট্যানারি মালিকদের কাছে। তারা উন্নয়ন কাজ করছেন। তাই এবার তারা কাঁচা চামড়া কিনবেন না। তাহলে এত চামড়া কিনার ক্ষমতা লোকাল চামড়া ব্যবসায়ীদের নাই। তাই চামড়া পাচারের আশঙ্কা বেশি। 

এদিকে সাভারের ট্যানারি পল্লীর কাজ এখনও শেষ না হওয়াতে চিন্তিত সারা দেশের চামড়ার ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন আমরা চামড়া কিনবো কি দিয়ে। ট্যানারি মালিকরা আমাদের আগের বকেয়া টাকাই পরিশোধ করেননি। 

বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন,  ট্যানারির বর্তমান যে অবস্থা সেটি শতভাগ চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এখনও অনেক কিছু ঘাটতি আছে। সেগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর বলা যাবে শতভাগ চামড়া প্রক্রিয়াকরণে কতটা সময় লাগবে। এছাড়া এ বছরই প্রথম চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য সাভারের ট্যানারি পল্লী ব্যবহার করা হবে। 

তিনি আরও বলেন, দেশের মিডিয়াগুলো বলছে চামড়া কিনতে সরকারী ব্যাংকগুলো প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। আসলে এটি তেমন কোনো ঋণ না। কারন হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি ঋণ পুনঃতফসিল মাত্র। অর্থাৎ গত বছরের ঋণ পরিশোধ করা শর্তে তা তফসিলি করা হয়। যারা ঋণ পরিশোধ করতে পরেনি তারা খেলাপি।

তিনি বলেন, সাভারের উন্নয়ন কাজ চলার কারনে অনেকেই তাদের পুঁজি ব্যয় করে কারখানা নির্মান কাজ করছে। তাহলে তারা চামড়া কিনবে কি করে। আর ব্যবসাযীদের বকেয়াই বা কিভাবে পরিশোধ করবে। সরকারের উচিৎ হবে জেলা পর্যায়ে চামড়া ক্রয়ের  জন্য ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া। তাহলে চামড়া পাচাররোধ করা যাবে। তা না হলে চামড়া দেশের রাখা খুবই কঠিন হবে।

ট্যানারি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন,  ঈদের বাকি আর মাত্র একদিন। কিন্তু আমাদের মাঝে হতাশা আরও বাড়ছে। যে ঋণ দেয়া হয়েছে তা দিয়ে ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করে উল্টো কারখানা উন্নয়ন কাজ করছেন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বকেয়া তারা এ বছর পরিশোধ করতে পারছে না। একইভাবে তারা নতুন করে খুব বেশি চামড়াও কিনতে পারছেন না। তাহলে কি হবে চামড়া ব্যবসায়ীদের। এই ব্যবসায় এখন টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার যদি এগিয়ে না আসে তাহলে এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। চামড়া পাচার হয়ে যাবে প্রতিবেশি দেশে। যা আমাদের কারো কাম্য নয়। সরকার যদি কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীদের ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে পারে তাহলেই কেবল এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

 জানা গেছে, এখনও সিইটিপি আর ডাম্পিং স্টেশনের কাজও বাকি অনেক। তাই উৎপাদন বন্ধ,  ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চামড়া রপ্তানী। এখন ঈদকে সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষের আশংকা করছেন ট্যানারি মালিকরা। এক সময় দিন রাত কাজ চলতো এসব ট্যানারিতে। এখন নিস্তব্ধ আর পরিত্যাক্ত হয়ে পরে আছে সব কিছু। 

সাভারে স্তানান্তরের জন্য গেলো মে মাসের ৮ তারিখ হাজারিবাগে গ্যাস,  বিদ্যুৎ আর পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর এখন চরম বিপাকে এই শিল্প। হাজারিবাগে সব কাজ বন্ধ,  আবার সাভারের আধুনিক চামড়া শিল্প নগরী পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় সেখানে শুরু করা যাচ্ছেনা কাজ।

সীমান্ত পথে চামড়া ভারতে পাচারের কোনো শঙ্কা আছে কিনা-এ প্রসঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী বলেন,  এ আশঙ্কা এ বছর আরও বেড়েছে। এবার বড় সঙ্কট হলো অর্থ। চামড়ার প্রকৃত মূল্য না পেলে তা পাচার হবেই। কোনোভাবেই তা ঠেকানো যাবে না। অর্থ সংকটের কারনে ভারতীয় টাকা এবার চামড়া কিনতে হবে। এবং তা পাচার হবে বাধ্য। জানিনা এ বছর কি হবে। আজ দাম নির্ধারনী বৈঠক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ