ঢাকা, মঙ্গলবার 05 September 2017, ২১ ভাদ্র ১৪২8, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমত


সোনার বাংলা শ্মশান হলো কেন
-আবু মহি মুসা
গত ৩ মে, ২০১৭ ‘দৈনিক আজকের জীবন’ পত্রিকায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, ‘এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা লাভ করে তখন তাদের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। ২০ লাখ মানুষের চাহিদার তুলনায় খাদ্য উৎপাদনও ছিল সামান্য। সে অবস্থা থেকে ৫২ বছরের মাথায় ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রটিই এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রাণভোমরা। ১৯৬০ সাল থেকে ৯০-এর দশক পর্যন্ত দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সিঙ্গাপুরসহ হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানকে এনে দিয়েছে এশিয়ান টাইগার উপাধি। এই তালিকায় যুক্ত হবার অনেক সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কি জানে বাংলাদেশের দুর্নীতির সূচক। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখা যায়, অনেক সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাংলাদেশের মানুষ জানে বাংলাদেশ বর্তমানে কোন অবস্থানে আছে। দেশটাকে বর্তমান সরকার এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেছে, কোনো কোনো মন্ত্রী বলছেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় যেতে না পারে তাহলে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া যাবে না।
স্বাধীনতা পূর্বকালে একটি জাতীয় স্লোগান ছিল, ‘সোনার বাংলা শ্মশান হলো কেন?’ এ রকম স্লোগানের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তান নামক দেশটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হলো। পাকিস্তানীরা এদেশের সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এ কারণেই রাজনীতিবিদরা আমাদের বুঝিয়েছেন, আমাদের দেশটাকে ওরা শ্মশানে পরিণত করেছে। এ থেকে নিস্তারের জন্যই তো এদেশকে স্বাধীন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই যা দেখতে পাই, তাতে আমাদের মত লোকদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে যাবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিউজের একটি শিরোনাম দেখে এ কথাগুলো বলতে বাধ্য হলাম। শিরোনামটি ছিল এরকম, ‘সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার’। জিএফআই প্রতিবেদনে ১০ বছরের চিত্র, ২০১৪ সালে পাচার হয়ে গেছে ৭২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১০ বছরে পাচার করা হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে এই অর্থ পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। সংস্থাটি প্রতি বছর বিশ্বের দেশগুলো থেকে অর্থ পাচারের পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ গত ১ মে ‘উন্নয়নশীল  দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার: ২০০৫-২০১৪’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে এ বিপুল অর্থ পাচারের কথা বলা হয়েছে। ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে মোট ৪৬ হাজার থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশাল অংকের এই অর্থে বাংলাদেশের দুইবারের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা সম্ভব। এই অর্থ দিয়ে সম্ভব তিনটি পদ্মা সেতু বানানো। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশ থেকে প্রতিবছর অর্থ পাচাররোধ করতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অর্থের পরিমাণ বেড়েই চলছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ এই দুবছরে বাংলাদেশীরা ৩৬০ কোটি টাকার বেশি সুইস ব্যাংকে পাচার করেছে। সে সঙ্গে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম নেয়া এবং কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি করেছে বাংলাদেশীরাই। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কারণ মূলত তিনটি। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থ পাচারও বেড়েছে। এছাড়া দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বেড়েছে।
দেশ থেকে অর্থ পাচার একটি বড় ধরনের অপরাধ। এ অপরাধ রোধের জন্য সরকার রয়েছে। সরকার কি তাহলে অর্থ পাচার রোধে ব্যর্থ? একমাত্র দুর্নীতির ক্ষেত্র ছাড়া কোন ক্ষেত্রে সরকার স্বার্থক। সরকার বলছে, আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে পৌঁছে গেছি। এ প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। গল্পটা ছিল এরকম: দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটা মুরগী নিয়ে প্রথমে ঝগড়া, পরে মারামারি। ফলে একজন নিহত হয়েছে। থানায় মামলা হয়েছে। এবার হত্যা মামলার বিচার। তাদের দুজনের মধ্যে মারামারি হয়েছে কেউ দেখেনি। কিন্তু সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে হবে। কোর্টে একজন সাক্ষী হাজির করা হলো। আসামী পক্ষের উকিল সাক্ষীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মারামারির সময় সেখানে ছিলেন? সাক্ষীর উত্তর জ্বি ছিলাম। যে মুরগী নিয়ে মারামারি হয়েছে, মুরগীটা কি দেখেছেন? উত্তর জ্বি দেখেছি। এবার প্রশ্ন মুরগীটা কত বড় ছিল? সাক্ষী সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শুধু ডান হাত উপুড় করে ধরছে। উকিল বললেন, মুরগীটা কি হাতির মত, না গরুর মত? তলে হাত দেন।
যারা উন্নয়নের মহাসড়কে পৌঁছে গেছেন তারা কিন্তু তলে হাত দেননি। দেশে ফ্লাইওভার ও পদ্মা সেতু নির্মাণ উন্নয়নের মাপকাঠি নয়। তাই যদি হয়, তাহলে উন্নয়ন দেখা যাবে মালিবাগ মোড়ে, উন্নয়ন দেখা যাবে যাত্রাবাড়ী। নদীতে ঢেউ উঠলে তারও একটা ছন্দ আছে। এ দুই জায়গার রাস্তার যে অবস্থা, যেভাবে বাসগুলো লাফিয়ে উঠে উন্নয়নের চোটে তাতে কখন কার মাজা ভেঙে যায় বলা যায় না।
যুব কর্মসংস্থা যুবকে ৩৫ লাখ লোক, ডেনটিনিতে ৪৫ লাখ এবং স্টকএক্সচেঞ্জে ৫০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করে আসছিল। এতগুলো লোক আজ পথে বসে গেছে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বললেন, যুবক নিয়ে আমাদের কারো কিছু নেই। কার করার আছে মন্ত্রী মহোদয়? পরিবহনের সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রীদের হয়রানি করা হচ্ছে। সড়ক মন্ত্রী বললেন, পরিবহনের মালিকরা প্রভাবশালী। আমরা ব্যর্থ। ব্যর্থ হলে আপনারা পদত্যাগ করুন।  এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। অযোগ্য লোকরা দেশ চালাচ্ছে। কাজেই দেশ যে কোথায় গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে এটা বোঝা যাবে ধীরে ধীরে। ৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মন্ত্রীরা গ্যানম্যানের বাসায় গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। বিএনপি সরকারের আমলে কোন কোন মন্ত্রী কত টাকার মালিক হয়েছিলেন এবং কোন কোন মন্ত্রীর সেকেন্ড হোম রয়েছে বিভিন্ন দেশে। এর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল দৈনিক ইনকিলাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর এর পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে, কে কত টাকার মালিক এবং কোন দেশে তাদের সেকেন্ড হোম রয়েছে। দেশপ্রেম হচ্ছে একটি দেশরক্ষার বজ্রকঠিন দেয়াল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, দেশপ্রেমের মধ্যে থাকতে হবে জ্ঞান, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ত্যাগ। আমাদের রাজনীতিবিদদের ত্যাগ আছে, তবে নিজের স্বার্থে। দেশ বা জনগণের স্বার্থে নয়।


দল নিবন্ধন আইন সংশোধন প্রসঙ্গে
-মোঃ ইয়ারুল ইসলাম
সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক ২০০৭-২০০৮ সালের সরকারের আমলে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের উদ্দেশ্যে Representation of People (Amendment) Ordinance, 2008 (পরবর্তীতে Representation of People Order (Amendment) Act, 2009 (Act No. XIII of 2009) নামে আইন আকারে প্রণীত) অনুসারে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে একটি অতিরিক্ত অধ্যায় (CHAPTER VIA) সংযোজন করা হয়। উক্ত অধ্যায়ে ৯টি ধারা (৯০এ-৯০আই) আছে যেগুলোতে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রদান ও বাতিল সংক্রান্ত বিভিন্ন শর্তাবলী যুক্ত করা হয়েছে।
উপরোক্ত আদেশের ৯০-বি ধারা অনুসারে নতুন দলের নিবন্ধন পেতে হলে যে সকল শর্ত পুরণ করতে হবে সেগুলো হচ্ছে-
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নিবন্ধনের দরখাস্ত প্রদানের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসন লাভ করতে হবে; অথবা
উপরোক্ত সংসদ নির্বাচনসমুহের যে কোন একটিতে আবেদনকারী দলের মনোনীত প্রার্থীদের আসনসমুহে মোট প্রদত্ত ভোটের পাঁচ ভাগ ভোট পেতে হবে; অথবা
অফিসসহ কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে ২২টি জেলা কমিটি ও ১০০টি থানা কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট থানাসমুহের প্রতিটিতে ২০০ ভোটার সদস্য থাকতে হবে। এবং
সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
উক্ত অরাজনৈতিক সরকার ২০০৮ সালে দল নিবন্ধনের যে কঠোর আইন করে যায় তা ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে তা আরো দ্বিগুণ কঠিন করে। ২০০৮ সালে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য অফিসসহ কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে ১০টি জেলা কমিটি ও ৫০টি থানা কমিটি গঠনের শর্ত ছিল। ২০১৩ সালে দেয়া হলো ২২টি জেলা ও ১০০টি থানা কমিটির শর্ত। এই শর্ত অনুসারে নতুন একটি দলকে কমপক্ষে ১২৩টি অফিস পরিচালনা করতে হবে যার মাসিক খরচ প্রায় ১৪,৯০,০০০/- (চৌদ্দ লক্ষ নব্বই হাজার) টাকা যা কোন নতুন দলের পক্ষে পুরোপুরি অসম্ভব।
উপরোক্ত ১০০টি থানার প্রতিটিতে ২০০ ভোটার সদস্য থাকার বিধানটিও ২০১৩ সালে করা যা একটি অগণতান্ত্রিক বিধান, কেননা কোন ভোটার কোন দলের প্রতি প্রকাশ্য হতে চায় না এবং তাকে দলীয় সদস্য হতে বাধ্য করা যায় না। তাছাড়াও বর্তমান সময়ের প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে চায় না। একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার সাথে সাথে অন্য দল তার সাথে নানান রকম শত্রুতা ও নোংরামী শুরু করে। সুতরাং একটি থানায় ২০০ সদস্য পাওয়া কঠিন।
বর্তমান নিবন্ধন আইন অনুসারে প্রতি কমিটিতে ৩৩% নারী থাকা বাধ্যতামূলক যার অর্ধেকও বাংলাদেশের কোন দলে নেই আর থাকাও সম্ভব নয়। কেননা বাংলাদেশের ১% নারীও রাজনীতিতে উৎসাহী নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক নারী এদেশে রাজনীতি করে। কোন অনুর্বর ব্রেন ছাড়া ৩৩% নারী থাকার শর্ত কেউ দিতে পারে না। কেননা শিক্ষার্থী ছাড়া বাংলাদেশের কোথাও ৩৩% নারী পাওয়া যায় না। সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে নারী কোটা বাধ্যতামূলক করা যায়, কিন্তু কোন ঐচ্ছিক সংগঠন বা দলে নারীদের অংশ গ্রহণের আবশ্যকতা সম্ভব হয় না।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বিধান অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। কেননা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করা, ভোটের মাধ্যমে মত প্রকাশ করা, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা বা নির্বাচিত হওয়া ইত্যাদি প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। বর্তমান নিবন্ধন আইন দ্বারা নাগরিকদের সেই অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। যে দল বা ব্যক্তিকে একজন নাগরিক পছন্দ করেনা তাকে ভোট প্রদানে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে গ্রহণযোগ্য নতুন কিছু করার সুযোগ থাকছে না এই আইনের কারণে। মূলতঃ এই আইনটি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনীতিকে কঠিন করা এবং স্বাধীন রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির পথ বন্ধ করা। রাজনীতিকে অভিজাতদের হাতে চিরস্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেয়ার জন্য এই ব্যবস্থা যার কারণে ২০১৩ সালে এটিকে আরো কঠিন করা হয়।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য বিশ্বের কোথাও এমন উদ্ভট আইন নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে Representation of People Act 1951 অনুসারে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেয়া হয়। সেখানে যে কোন সময় ইচ্ছা করলে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে নিবন্ধন নেয়া যায়। দিল্লীর মূখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিয়াল দল গঠনের দেড় বছরের মাথায় নির্বাচন করে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যক্রো দল গঠনের এক বছরের মাথায় নিজের দল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে দল নিবন্ধনের জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয়। একবার না হলে আবার পাঁচ বছর।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় প্রতীকে হচ্ছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ গ্রহণ করতে নতুন দলগুলিকে অপেক্ষা করতে হবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-বি(১)(১) ধারায় নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে দলীয় প্রতীকে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে একটি আসন লাভের কথা বলা হয়েছে। এটি একটি হাস্যকর শর্ত। নিবন্ধন ছাড়া দলীয় প্রতীক পাওয়া যাবে কিভাবে এবং দলীয় ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব কিভাবে? একই রকম শর্ত দেয়া হয়েছে ৯০-বি(১)(২) ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, কোন দলের প্রার্থীরা যদি মোট ভোটের ৫% পায় তবে সে দলকে নিবন্ধন দেয়া যাবে। এখানেও বলা হয়নি কিভাবে নিবন্ধন ছাড়া নির্বাচন করা সম্ভব, আর নির্বাচনে না গেলে ৫% ভোট কিভাবে পাওয়া যাবে? উল্লেখিত শর্ত দুটি কাদের জন্য বা কোন সময় কার্যকর তা বলা হয়নি।
বাংলাদেশে অনেক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে যাদের অফিস নেই, কমিটি নেই, লোকজন নেই, কর্মসূচী নেই। কোন কোন দল নিজস্ব দলীয় প্রতীক বাদ দিয়ে জোটের নামে অন্য দলের প্রতীকে নির্বাচন করে। তাদের দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কোন ব্যবস্থা হচ্ছে না। অথচ তারা নিবন্ধন নিয়ে বসে আছে। প্রতীক দখল করে নির্বাচন না করলে প্রতীকগুলো অব্যবহৃত থাকছে। সুতরাং সময় এসেছে এসব দলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার। বছরের পর বছর যাদের কোন কাউন্সিল বা কর্মসূচী নেই, নির্বাচন করে না, করলেও অন্য দলের প্রতীকে তাদের নিবন্ধন কেন থাকবে? আর যারা সক্রিয় থেকে সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের বেলায় এত কঠোরতা কাদের স্বার্থে?
বর্তমান আইনে নিবন্ধন নেয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সঠিক তদন্ত না হলে কমিটি, কার্যালয় ও সদস্য সংক্রান্ত অসত্য তথ্য প্রদানের মাধ্যমে দল নিবন্ধনের সম্ভাবনা রয়ে গেছে। টাকার বিনিময়ে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি ও অফিস দেখিয়ে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নেয়া সম্ভব হবে, তবে তার মাধ্যমে রাজনীতি পরিশুদ্ধ হবে না। এই আইনের সুযোগ নিয়ে কালো টাকাওয়ালারা প্রভাব খাটিয়ে রাজনীতিতে আসন গেড়ে বসবে এবং প্রচলিত দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সৎ রাজনৈতিক সংষ্কৃতি প্রতিষ্ঠার পথ সংকুচিত হয়ে যাবে।
সুতরাং গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন উন্মুক্ত করে দিতে হবে। ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-বি ধারা সংশোধন করে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিতে হবে এবং নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সারা বছর চালু রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের দায়িত্ব জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাহলেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভালো কর্মকান্ডের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে চাইবে। এই দৃষ্টিকোন থেকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনেরও কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।
*লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ কংগ্রেস, এ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ