ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চামড়ার চোরাচালান

এবারের ঈদুল আযহায় ধারণার চাইতে অনেক বেশি পশু কুরবানি দেয়া হলেও সে তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণ চামড়া ট্যানারি মালিক এবং চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে আসেনি। এর কারণ জানাতে গিয়ে চামড়া ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, বিপুল পরিমাণ চামড়া চোরাচালানের অবৈধ পথে ভারতে পাচার হয়ে গেছে। পাচারের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্ক্রিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বলেছেন, সরকারের বেঁধে দেয়া স্বল্প হারের মূল্যের কারণেই চামড়া ভারতে পাচার হয়ে গেছে এবং এখানো পাচার হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে চামড়ার মূল্য বেশি, এমনকি দ্বিগুণেরও অনেক বেশি হওয়ার কারণে মৌসুমী ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ট্যানারির এজেন্টরা এবার ভারতে পাচারের জন্যই বেশি তৎপর রয়েছে।
পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, ঈদের প্রাক্কালে সরকার ঢাকার জন্য প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ঢাকার বাইরের জন্য প্রতি বর্গফুটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। অন্যদিকে ভারতে বর্তমানে প্রতি বর্গফুট অতি নিম্নমানের চামড়ার মূল্যও ৯০ টাকা, যা বাংলাদেশে নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ। আর এই চামড়া মোটামোটি মানসম্পন্ন হলে তার প্রতি বর্গফুটের মূল্য ভারতে আরো বেশি টাকা দেয়া হচ্ছে। খাসি ও বকরির ক্ষেত্রেও সরকার অনেক কম মূল্য নির্ধারণ করেছিল। খাসির চামড়ার জন্য প্রতি বর্গফুটে ২০ থেকে ২২ টাকা এবং বকরির চামড়ার জন্য প্রতি বর্গফুটে ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ভারতে খাসি ও বকরির চামড়াও সরকার নির্ধারিত এই দরের চাইতে অনেক বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। মূলত সে কারণেই গরু-মহিষ থেকে শুরু করে খাসি, ভেড়া ও বকরি পর্যন্ত কোনো পশুর চামড়াই বাংলাদেশের ট্যানারি মালিক ও চামড়ার প্রকৃত ব্যবসায়ী তথা প্রান্তিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায়নি। সবই পাচার হয়ে গেছে ভারতে।
নগদ টাকার অভাবকেও বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একটি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্ক্রিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে ঈদের অনেক আগে থেকেই তারা আশংকা প্রকাশ করে আসছিলেন। তারা সেই সাথে দাবি জানিয়েছিলেন, যাতে ট্যানারির মালিকরা প্রান্তিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করে দেন। অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বলেছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করার খরচ এবং ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ঋণ ও নগদ অর্থে সহযোগিতা না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ট্যানারি মালিকরা অগ্রিম দেয়া দূরে থাকুক, বকেয়া টাকারও প্রায় কিছুই পরিশোধ করেননি। এর ফলে দেশের প্রান্তিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর পাশাপাশি ছিল সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া মূল্য, যা ভারতের বাজার দরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। একই কারণে একদিকে বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে গেছে ও যাচ্ছে, অন্যদিকে লালবাগের পোস্তাসহ দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে চামড়া আসেনি বললেই চলে।
পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ থাকে গরুর চামড়া। খাসি ও ছাগলের চামড়া থাকে ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ। বাকি চামড়া আসে ভেড়া ও মহিষের। এসব চামড়ার বেশির ভাগই পাওয়া যায় ঈদুল আযহার সময়। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। চামড়া শুধু কমই আসেনি, ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিগত একশ বছরের মধ্যে এ বছরই সবচেয়ে কম চামড়া পেয়েছেন তারা। অবস্থায় পরিবর্তন না ঘটানো গেলে দেশকে চামড়ার প্রচন্ড সংকটে পড়তে হবে, যার ফলে দেশের ট্যানারি শিল্পের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হবে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এর নেতারা ট্যানারি মালিকদের যথেষ্ট পরিমাণে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। বলেছেন, অতীতে ঈদুল আযহার প্রাক্কালে বিভিন্ন ব্যাংক ট্যানারি মালিকদের চার থেকে পাঁচশ’ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দিত। গত বছরও দুইশ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গিয়েছিল। এই ঋণের অর্থ দিয়েই তারা প্রান্তিক ও মৌসুমী ব্যবসায়ীসহ আড়তদারদের চামড়ার জন্য অগ্রিম টাকা দিতেন। কিন্তু এ বছর কোনো ঋণই পাননি ট্যানারি মালিকরা। একই কারণে তাদের পক্ষেও কাউকে অগ্রিম টাকা দেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রান্তিক ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চামড়া ভারতে পাচার করেছে। এখনো তারা ভারতের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, চামড়া চোরাচালান পরিস্থিতি এরই মধ্যে অত্যন্ত বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে চোরাচালানের যেসব কারণের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিকেই আমরা সঠিক এবং যুক্তিসঙ্গত মনে করি। মূল্য নির্ধারণের আগে সরকারের উচিত ছিল এই সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রাখা যে, লাভজনক মূল্য না দেয়া হলে চামড়া ভারতে চোরাচালান হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা বিষয়টিকে পাশ কাটানোর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ভারতের স্বার্থেই সুকৌশলে ভূমিকা পাল করেছেন। একই কারণে প্রায় সব চামড়াই ভারতে পাচার হয়ে গেছে। ট্যানারি মালিকরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, এখনো চোরাচালান প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট সময় রয়েছে। সরকারের উচিত বিভিন্ন ব্যাংককে নির্দেশ দেয়া, তারা যাতে ট্যানারির মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দেয়ার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। চোরাচালান প্রতিহত করার জন্য র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীগুলোকেও তৎপর করে তোলা দরকার। একথা বুঝতে হবে যে, চোরাচালান প্রতিহত না করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। বন্ধ হয়ে যাবে সকল কারখানা। সুতরাং চোরাচালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার সময় নষ্ট না করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ