ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের বিকল্প নেই

শেখ এনামুল হক : প্রতিবেশী মিয়ানমারে (সাবেক বার্মা) রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। এর অংশ হিসেবে রাখাইন রাজ্যের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে নতুন করে কার্ফু জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের সরকার। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, নতুন করে অভিযানের প্রাক্কালে সেখানে মোতায়েন করা সৈন্যের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। সেনা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার নতুন করে সেনা মোতায়েনের খবর দিয়েছে।
প্রতিবেশী মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা বেড়েই চলেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর তকমাধারী অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা নির্যাতন এতটুকু কমেনি। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ কারো অনুরোধে সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। রোহিঙ্গা নির্যাতনে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী অং সান সু চির সামরিক বাহিনীর রশি টেনে ধরার কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। এমতাবস্থায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নতুন করে আরোপের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন তথ্যাভিজ্ঞ মহল। তবে এই নিষেধাজ্ঞা হতে হবে সর্বাত্মক।
অতি সম্প্রতি ইয়াংগুন থেকে প্রচারিত খবরে বলা হয়, রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ তদন্তের জন্য জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধিদলকে মিয়ানমারে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে না বলে মিয়ানমার জানিয়েছে। নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির সরকার জানিয়েছে, চলতি বছর মার্চ মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী মিয়ানমারে একটি তদন্ত মিশন আসার কথা। কিন্তু সুচির সরকার জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘের এ ধরনের কোন মিশনকে সহযোগিতা দেবে না।
মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব কাইয়া জেয়া বলেছেন, এ ধরনের অনুসন্ধানী কোন মিশনকে মিয়ানমারে স্বাগত জানানো হবে না। বিশ্বব্যাপি আমাদের মিশনকে এব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের মিশনের কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে মিয়ানমার সরকার ভিসা দেবে না।
গত বছর সাধারণ নির্বাচনের পর বহু বছরের সামরিক শাসনের অবসান হলে অং সান সুচির সরকার ক্ষমতাসীন হয়। এ সময় বিশেষভাবে সৃজনকৃত ‘স্টেট কাউন্সিলর’ পদে আসীন হন অং সান সুচি। অবশ্য তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদেও আসীন। অং সান সূচির দলীয় লোকজন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনে জড়িত বলে বিশ্বব্যাপি মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদের পাশাপাশি মিয়ানমারে জাতিসংঘ মিশনকে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি সমার্থক। অবশ্য রোহিঙ্গা নির্যাতনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সূচির কর্মী-সমর্থকদের জড়িত থাকার সংবাদে সূচি বা তার সরকার কখনও প্রতিবাদ করেনি। এ কারণে সূচির নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন দেশে। চলতি মাসে সুইডেন সফর শেষে সুচি বলেন, জাতিসংঘ মিশনের সফর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈরীতার সৃষ্টি করবে।
রাখাইন প্রদেশের বেশিরভাগ গোষ্ঠী হচ্ছে রাখাইন মুসলিম যারা যুগ যুগ ধরে সে দেশে বাস করছে। অবশ্য বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের বেশির ভাগ মানুষ রোহিঙ্গাদের বহিরাগত বাংলাদেশী হিসেবে গণ্য করা হয়। গত বছর কথিত রোহিঙ্গা হামলায় ৯ জন মিয়ামনার সীমান্তরক্ষী নিহতের পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে রাখাইন রাজ্য হতে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম নর-নারী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সাথে আলাপ করে জাতিসংঘ এবং ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকরা রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ, তাদের নাগরিকত্ব প্রদান ও মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সাথে সাক্ষাৎ শেষে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়, রোহিঙ্গারা ব্যাপক গণহত্যা ও গণধর্ষণের শিকার এবং এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী নির্মূলের শামিল।
মার্চ মাসে জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উত্থাপিত রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা ও ধর্ষণের তদন্তে একটি জাতিসংঘ মিশন পাঠানোর প্রস্তাবে মিয়ানমার প্রতিবেশী চীন ও ভারতের সাথে নেতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগের নীতিই অনুসরন করছে মিয়ানমার : এদিকে রোহিঙ্গাসহ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের বর্তমান সরকার পূর্বেকার জান্তার নীতিই অনুসরন করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি।
মিয়ানমারে ১২ দিনের সফর শেষে ২৪ শে জুলাই জেনেভায় দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যা, নির্যাতন, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার, নিরাপত্তা হেফাযতে মৃত্যু, সরকারকে মানবাধিকার লংঘনের সব অভিযোগ তদন্ত, বৈষম্য দূর ও অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, নিজ ঘর থেকে পালিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। রাখাইন ছাড়াও কাচিন ও শান রাজ্যের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এসব অঞ্চলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে।
মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার গত ১০ থেকে ২১ জুলাই ইয়াঙ্গুন, নেপিডো এবং রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যের কয়েকটি এলাকা সফর করেছেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সামাজিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভিকটিমদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। অং সান সুচীর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমারে এটি তার তৃতীয় সফর। ২০১৪ সালে মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার নিযুক্ত হওয়ার পর দেশটিতে তিনি ছয়টি তথ্যানুসন্ধান মিশন পরিচালনা করেছেন।
আগামী অক্টোবরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইয়াংহি লি মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর তার পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থান করবেন।
এদিকে রয়টারের খবরে বলা হয়, মিয়ানমারে মুসলিম বিদ্বেষ অব্যাহত রয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধরা মুসলমানদের ওপর আবারো হামলা শুরু করেছে। মুসলিম যুবকদের উপর মুখোশধারী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে হামলা চলছে। তারা ভেঙে দিচ্ছে ধর্মীয় উপাসনালয়। বাংলাদেশে সম্প্রতি ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমাদ আল-অথাইসিন’র সফরের সময় এ ঘটনা ঘটেছে।
খবরে আরো বলা হয়, অনেক স্থানে মসজিদ মাদরাসা ভেঙে ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি মুসলিম অধ্যুষিত লোক হামলা চালায়। স্থানটি মান্দালয়ে। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে হামলায় দু’জন মুসলিম যুবক আহত হয়েছে। মান্দালয়ের অধিবাসীরা বলছেন, এ ঘটনা ছিল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মতই।
২০১৪ সালে একই এলাকায় এ ধরনের দাঙ্গা হয়েছে। ২০১২ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ হামলায় কমপক্ষে ২০০ মানুষ নিহত ও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত হয়।  মিয়ানমারে মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত ২০টি গ্রুপ সম্মিলিতভাবে অং সান সুচীর কাছে একটি চিঠি লিখেছে। এতে মুসলমানদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আরো পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সুচীর কাছ থেকে এ পর্যন্ত এ চিঠির কোন সদুত্তর আসেনি।
চিঠিতে বলা হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদীরা ধর্মীয় ঘৃণাপ্রসূত বক্তব্য দিচ্ছে, ভীতি প্রদর্শন করছে এবং মুসলমানদের প্রতি সহিংসতা সমর্থন করছে। এটা যেন রকার প্রশংসা না করে বা মেনে না নেয়। রাখাইন রাজ্য জুড়ে মুসলিম বিরোধিতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে চরম উদ্বেগজনকহারে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি তীব্র নির্যাতন করা হচ্ছে। এ ঘটনা ইয়াংগুনের মত বড় শহরেও ঘটছে। মে মাসে ইয়াংগুনে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দুটি মাদরাসা। স্থানীয় মিডিয়ার খবরে প্রকাশ, ইয়াংগুনের উপকণ্ঠে একটি মসজিদ ও একটি মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কক্সবাজার সীমান্ত উপজেলা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমাদ আল অথাইসিন। ৪ঠা আগস্ট কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। পরে ওআইসি মহাসচিব কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জেলা প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক  দাতাসংস্থাসহ বিভিন্ন এনজিও কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বসে এক সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের ভয়াবহ নির্যাতনের কথা শোনেন। বৈঠকশেষে ওআইসি মহাসচিব রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন ক্যাম্পের ব্লকগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ সময় কক্সবাজারের ডিসি মোহাম্মদ আলী হোসেন, পুলিশ সুপার একেএম ইকবাল হোসেনসহ পদস্থ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ এবং আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং বিভিন্ন এনজিও’র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে ওআইসি মহাসচিব সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ