ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিরপুরে ‘জঙ্গি আস্তানা’ ঘিরে র‌্যাবের অভিযান

জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে গতকাল মিরপুর মাজার রোডের একটি বাড়ি ঘিরে রাখে র‌্যাব সদস্যরা -সংগ্রাম

 

স্টাফ রিপোর্টার : জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডের একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। বাড়ির ভেতর থেকে র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ও পেট্রলবোমা ছোড়া হয়েছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার রাতে বাড়িটি ঘিরে ফেলে র‌্যাব। বাড়িটিতে জঙ্গি অবস্থান করছে বলে র‌্যাবের ভাষ্য। বাড়িটিতে অবস্থানরত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে র‌্যাব শুরু থেকেই বারবার আহ্বান জানায়। একই সাথে ভবনের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়ার কাজও শুরু করে র‌্যাব। এ অবস্থার মধ্যেই কয়েক দফা বিস্ফোরণ ও গুলীর শব্দ পাওয়া গেছে বলে সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই বাড়িটি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে র‌্যাব রয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে র‌্যাব জানায়, ঘিরে রাখা ছয় তলা ভবনের ভেতরে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক রয়েছে বলে ধারণা করছে তারা। যে কারণে ইতোমধ্যে ওই বাড়ির বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। পুরো এলাকা র‌্যাব ঘিরে রাখায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সময় কাটছে একপ্রকার বন্দি অবস্থায় উৎকণ্ঠার মধ্যে। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, মাজার রোডের বাড়িটি ঘিরে ফেলার পর জঙ্গিরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে হাতে তৈরি গ্রেনেড ও পেট্রলবোমা ছুড়েছে। বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়েছে।

এ বাহিনীর মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলছেন, আবদুল্লাহ নামের ‘দুর্ধর্ষ’ এক জঙ্গি, তার দুই স্ত্রী, দুই সন্তান ও দুই সহযোগীসহ মোট সাতজন ওই ভবনের পঞ্চম তলায় অবস্থান নিয়ে আছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। গতকাল বেলা পৌনে ১২টায় ঘটনাস্থলের কাছে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করতে বলেছি। সে সময় চেয়েছে। যেহেতু ভেতরে দুটি বাচ্চা রয়েছে, আমরা তাকে সময় দেব। চূড়ান্ত অভিযানের জন্য আমরা প্রস্তুত। এখন তার সিদ্ধান্তের ওপরই সব কিছু নির্ভর করছে।”

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ১৮ ঘণ্টা ধরে ঘিরে রাখা বাড়ির সন্দেহভাজন জঙ্গি আবদুল্লাহ আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছেন বলে জানিয়ে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলের কাছে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে সে আত্মসমর্পণ করবে বলে আমাদের জানিয়েছে। এর মধ্যে ধ্বংসাত্মক কিছু করতে চাইলে আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।”

তবে রাত সোয়া ৯ টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আবদুল্লাহর আত্মসমর্পণের সংবাদ জানা যায়নি ।

টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় সোমবার রাতে এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ‘জেএমবির জঙ্গি’ দুই ভাইকে ড্রোন ও দেশীয় অস্ত্র আটক করার পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মধ্যরাতে ঢাকায় র‌্যাবের এই অভিযান শুরু হয়। দারুস সালাম থানা এলাকায় মাজার রোডের পাশে বর্ধনবাড়ি ভাঙ্গা ওয়ালের গলির ২/৩-বি হোল্ডিংয়ে ছয় তলা ওই বাড়ির মালিক হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদ নামের এক ব্যক্তি। তিনি নিজেও পরিবার নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, র‌্যাব ওই বাড়ি ঘিরে ফেলার পর রাত ১টার দিকে সেখান থেকে চারটি বোমা ছোড়া হয়। “ওই বাড়ি থেকে ছোড়া বোমার মধ্যে পেট্রোল বোমাও ছিল। ফলে বাইরে পড়ার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। তবে কেউ হতাহত হয়নি। ওই বাড়ি থেকে র‌্যাবের দিকে গুলীও ছোড়া হয়।”

রাতে ওই বিস্ফোরণের পর ফায়ার ব্রিগেডের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং ওই বাড়ির সামনের অংশে পানি ছিটানো হয়। এরপর চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ওই ভবনের ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ২৩টির বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেন র‌্যাব সদস্যরা। গতকাল সকালের দিকে মুফতি মাহমুদ খান জানান, ওই ভবন থেকে ৬৫ জনকে সরিয়ে এনে স্থানীয় একটি স্কুলে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন শিশু, ২৪ জন নারী ও ২৬ জন পুরুষ। তিনি বলেন, মোবাইল ফোনে আবদুল্লাহ নামের ওই ‘জঙ্গির’ সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। জবাবে আবদুল্লাহ ভেবে দেখার জন্য সময় নেন। যাদের সরিয়ে আনা হয়েছে, তাদের মধ্যে আবদুল্লাহর এক বোনও আছে। আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করার সময় সেই বলেছে, যেন অন্যদের সঙ্গে তার বোনকেও সরিয়ে নেয়া হয়।”

র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে আসেন এবং পুরো পরিস্থিতি ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। আবদুল্লাহকে ‘দুর্ধর্ষ জঙ্গি’ হিসেবে বর্ণনা করে বেনজীর বলেন, ২০০৫ সাল থেকে সে জঙ্গিবাদে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে সে মিরপুর মাজার রোডে বসবাস করে আসছে। কবুতরের ব্যবসার পাশাপাশি আইপিএস ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী মেরামতের কাজেও সে জড়িত ছিল। “সে র‌্যাবকে বলেছে, তার কক্ষে ৫০টির মত আইইডি আছে। এছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ রয়েছে। গত রাতে অভিযান শুরুর পর ওইদিক থেকে গুলী করা হয়েছিল। তার কাছে একটি পিস্তলও থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি।”

মুফতি মাহমুদ খান বিকালে বলেছিলেন, বিভিন্ন পর্যায়ের আত্মীয় স্বজনদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আবদুল্লাহকে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন তারা। যতবারই ফোনে তার সঙ্গে র‌্যাব যোগাযোগ করেছে, ততবারই সে ভাবার জন্য সময় নিয়েছে। সময় নেওয়ার ছলে আবদুল্লাহ অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে পরামর্শ করছে কি না, সে প্রশ্ন তখন এড়িয়ে যান র‌্যাবের গণমাধ্যম পরিচালক । সন্ধ্যায় আবদুল্লাহর রাজি হওয়ার খবর জানাতে এসে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল কোনো ক্যাজুয়ালটি যাতে না হয়। আমরা আত্মীয়দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাকে রাজি করাতে চেয়েছি। কিছুক্ষণ আগে সে রাজি হওয়ার সংকেত দিয়েছে।”

কীভাবে এই সংকেত পাওয়া গেল- তা জানিয়ে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আবদুল্লাহ আত্মসমর্পণে রাজি থাকলে তার এক স্ত্রী ও এক সন্তান বারান্দায় এসে হাত নেড়ে কথা বলবে। সন্ধ্যার দিকে ঠিক তাই তারা করেছে।

এর আগে গত ১৫ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসের সকালে ঢাকার পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াট সদস্যদের অভিযানের মধ্যে নব্য জেএমবির সন্দেহভাজন এক জঙ্গি সুইসাইড ভেস্টে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয়। সাইফুল ইসলাম নামের ওই জঙ্গি জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান ঘিরে হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক সে সময় জানিয়েছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ