ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছাত্রলীগ নেতা মশু হত্যার পেছনে ‘আধিপত্য বিস্তার আর ইয়াবার কারবার’

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর আদাবরে ছাত্রলীগ নেতা মশিউর রহমান মশুকে হত্যার একদিন আগেই তাকে মেরে ফেলার হুমকী দেয়া হয়েছিল । এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় মশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার বাবা এবং সংগঠনটির এক নেতা। মশুর বাবা জুলহাস মিয়া এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদের ভাষ্য, লেদু হাসান ও তার সহযোগীদের ইয়াবা ব্যবসায় বাধা দেওয়াতেই খুন হতে হয়েছে মশুকে।

এদিকে , মশুর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে । রোববার হত্যাকান্ডের পর মশু আদাবর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন বলে জানা যায়। তবে পরদিন সোমবার থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদ জানান, তার কমিটির পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন মশু।

 রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শেখেরটেক ১০ নম্বর সড়কে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় মশুকে। স্থানীয়রা জানান, রাতে মোটর সাইকেলে করে যাওয়ার পথে কয়েকজন রড ও লাঠি নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মশুকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় মশুর বাবা জুলহাস মিয়া সোমবার একটি করে মামলা করেছেন। সেখানে লেদু হাসান, মোল্লা স্বপন, সেলিম, সাগরসহ আটজনকে আসামী করা হয়েছে বলে আদাবর থানার এসআই হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন। মোল্লা স্বপন এর আগে মশুর বিরুদ্ধে মারামারির অভিযোগে একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় মশু জামিনে ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার বাবা। আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে আদাবর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন।

একদিন আগে হত্যার হুমকি

মশুর বাবা জুলহাস মিয়া জানান, সেলিমের মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় লেদু হাসান তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “গত শনিবার শেখেরটেকে সেলিমের বাসা থেকে লেদু বের হওয়ার সময় মশুর সাথে দেখা হয়। এসময় সেলিমের কাজে বাধা না দিতে মশুকে সতর্ক করে লেদু। “তাদের মধ্যে এই গন্ডগোল মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলে লেদুর এক পরিচিত লোক রোববার মশুকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।”

 লেদু থানা যুবদলের আহ্বায়ক দাবি করে থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদ বলেন, “ লেদু হাসান, সেলিম, সাগর, মোল্লা স্বপনসহ এলাকার কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছে। লেদুর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ তার লোকজনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মাদক মামলা রয়েছে। পুলিশ বেশ কয়েকবার তাদের গ্রেপ্তারও করেছিল। “এদের ইয়াবা ব্যবসায় সব সময় বাধা দিত মশু। কখনো সরাসরি, কখনো পুলিশকে তথ্য দিয়ে।”

গত শনিবার লেদুর কাছ থেকে মশুর হুমকি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে রিয়াজ বলেন, “দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং মশুকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হলে মশুও তাকে জানিয়ে দেয়, দিন পাল্টেছে সহজে মেরে ফেলা যায়না।”

পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা , আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় মশু (২৭) হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে । তারা বলছেন, ‘মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই হত্যাকান্ড ঘটেছে। হত্যার সঙ্গে জড়তিরা একাধিক হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামী। তারা মাদক ব্যবসাতেও জড়িত।’

নিহতের ছোট ভাই মজিবর রহমান বলেন, ‘মশুকে এলাকার সবাই পছন্দ করতেন। অল্প সময় রাজনীতি করে ছাত্রলীগের পদ-পদবি পেয়েছেন। আদাবরে মোল্লা স্বপন, লেদু হাসান, সেলিম, সাঈদ, মধু মিয়াসহ কয়েকজন ইয়াবা ব্যবসা করে। মশু ইয়াবা ব্যবসায় বাধা দিতেন। এ কারণেই তারা ক্ষেপে যায়। মশুকে লেদু ও মোল্লা স্বপন কয়েকবার হুমকি দেয়। রোববার রাত ৮টার দিকে লেদু হাসানের সঙ্গে মশুর কথা কাটাকাটি হয়। এরপর মশিউর মোটর সাইকেলে করে সাভারে ফরহাদ নামে একজনের কাছে যায়। ফরহাদের সঙ্গে লেদুর সম্পর্ক আছে। লেদুর সঙ্গে ঝামেলার কথা ফরহাদকে জানায় মশু। ফরহাদ মশুকে লেদুর কাছে মাফ চাইতে বলে। সাভার থেকে ফিরে মাফ চাওয়ার জন্য লেদুর কাছে শেখেরটেক ১০ নম্বরে যায় মশিউর। তখন তারা ইটদিয়ে আঘাত করে। এতেই মারা যায় মশু। হত্যা করার সময় ৬/৭ জন ছিল বলে জেনেছি আমরা। এরা হলো লেদু হাসান, মোল্লা স্বপন, পিচ্চি সাঈদ, হাসান, মধু, সেলিম ও সাগর।’ তিনি বলেন, ‘ওরা সবাই যুবদল ও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে নিয়মিত এলাকায় থাকে না। অন্য ছেলেদের দিয়ে এলাকায় মাদক ব্যবসা করায়।’

মজিবর রহমান বলেন, ‘চার মাস আগে একটা মেয়ে ও একটা ছেলে শ্যামলী হাউজিংয়ের দিকে ঘুরতে আসেন। মোল্লা স্বপন ও লেদুর অনুসারীরা তাদের ক্লাব ঘরে আটকে রাখে মুক্তিপণ চায়। তারা স্বামী-স্ত্রী বলার পরও তাদের ছাড়েনি। বিষয়টি মশু জানার পর তাদের ছেড়ে দিতে বলে। তখন এই বিষয় নিয়ে ওদের সঙ্গে মশুর ঝামেলা হয়েছিল। এ রকম অনেক ঘটনা আছে, এ নিয়ে ওদের সঙ্গে শত্রুতা।’

নিহতের ছোট বোনের স্বামী রাজু বলেন, ‘মশিউর রহমানের সঙ্গে আদাবরের সিনিয়র ও জুনিয়র সব নেতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। তাকে সবাই পছন্দ করতো। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মশু সবার বড়। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা শেষ করে, রাজনীতি শুরু করেন। এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়েই ঝামেলা ছিল। মশু চাইতেন না এলাকায় মাদক ব্যবসা চলুক।’

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে, আদাবরে মশিউর রহমান মশুর খুব প্রভাব রয়েছে। সে নিজেও মাদক ব্যবসার সঙ্গে পরিচিত। এলাকায় তাকে গরু মশু বলেও ডাকে। তার বিরুদ্ধে আদাবর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। গত ৩ আগস্ট তার বিরুদ্ধে আদাবর থানায় একটি মামলা হয়। মামলা নম্বর ০৫। মামলার বাদি শহিদুল ইসলাম সবুজ এজাহারে অভিযোগ করেন, তার ছোটভাই স্বপনকে মশু চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে।

সবুজ সোমবার রাতে মুঠোফোনে বলেন, ‘মশু এলাকায় মাদক ব্যবসা করে। এতে আমার ছোট ভাই স্বপন বাধা দেয়। গত ৩ আগস্ট আমার ভাই তার এক বন্ধুর দোকানে বসা ছিল, তখন তাকে তুলে নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে মশু ও তার অনুসারীরা। এই ঘটনায় আমি মামলা করি। কিন্তু পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। পরবর্তীতে তারা কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে আসে। জামিনে আসার পর মামলার সাক্ষী রিপনকে ফোন দিয়ে ৯০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। কারণ তাদের নাকি জামিন পেতে দেড়লাখ টাকা লেগেছে। সেই ঘটনায়ও আমরা জিডি করেছি। কিন্তু পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘নিহত মশু ও যারা মেরেছে এরা সবাই বন্ধু-বান্ধব। নিজেরা নিজেদের বন্ধুকেই খুন করছে। একসঙ্গে মাদক নেয়, দুই একটা ইয়াবা বিক্রিও করে। এসব নিয়েই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এ থেকেই হত্যাকান্ড। এলাকাতে একটু প্রভাব বিস্তারও করতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সবগুলোকে গ্রেফতার করা হবে। ইতোমধ্যে তথ্য পেয়েছি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ