ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিমানের পরিবর্তে বাস!

আবু হেনা শাহরীয়া: ব্যবসার কাজে কোথাও যেতে চান  যেখানে আপনার জরুরী মিটিং আছে। ভোরবেলায় বিমান ফ্লাইট ধরার জন্য রওনা দিয়েছেন। কিন্তু ছোটখাটো ফ্লাইট প্রায়শই বিলম্বিত হয়। তার মানে আপনার মিটিং মিস করার আশঙ্কা থাকে। তদুপরি বিমানের চেয়ে এয়ারপোর্টের চৌহদ্দীর মধ্যে আপনাকে বেশি সময় কাটাতে হবে। এখন বিকল্প যাত্রা কি কি আছে? আপনি ট্রেনে যেতে পারেন। তবে মিটিংয়ের আগে যে বেশ একটা জম্বেশ ঘুম দিয়ে নেবেন সে সুযোগ পাবেন না। নিজে গাড়ি ড্রাইভ করেও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে ট্রাফিক জ্যামের ঝক্কি পোহাতে হতে পারে। রাতভর গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত বিপর্যস্ত হবেন। অনেকের কাছে প্রধান প্রধান কর্মকেন্দ্রের মধ্যে চলাচল করা এক রীতিমতো মাথাব্যথার ব্যাপার। যেমন ধরুন, লস এঞ্জেলেস থেকে সান ফ্রানসিসকো পর্যন্ত যারা নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন তাদের কাছে ব্যাপারটা বেশ ঝকমারি ও জটিল। অনেকে এটাকে ৫শ’ মাইলের সমস্যা বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন।
এখন সানফ্রানসিসকোর ব্যবসায় উদ্যোক্তা টম কুরিয়ার ও তার সিলিকন ভ্যালির পার্টনার গায়েটানো ক্রুপি এ সমস্যার একটা সমাধান বের করেছেন। সমাধানটির নাম ‘কেবিন’ এটি আসলে একটি ডাবল ডেকার লাক্সারি বাস সার্ভিস যেখানে ওয়াই ফাই আছে, আরামদায়ক লাউঞ্জ আছে, ঘুমানোর মতো বিছানা আছে। গত জুলাই মাস থেকে লস এঞ্জেলেস ও সান ফ্রানসিসকোর মধ্যে কেবিনের রাত্রিকালীন সার্ভিস শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর দূরপাল্লার বাস সার্ভিস চালু হওয়াটা মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। তবে কুরিয়ারের যুক্তি হলো কেবিনে যাত্রীদের রাতে ভাল ঘুম হওয়ার ব্যবস্থা থাকাটাই এই বাস সার্ভিসটিকে অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থা থেকে আলাদা করেছে। কুরিয়ার তাদের এই নৈশবাস সার্ভিসকে টেলিপোর্টেশনের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, যাত্রীরা যখন ৩০০-৫০০ মাইল পথ পাড়ি দেয়ার এই বাস সার্ভিসকে উবার ও লিফটের সঙ্গে যুক্ত করবেন তখন তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির একেবারেই কোন প্রয়োজন হবে না।
লস এঞ্জেলেস ও সানফ্রানসিসকোর মধ্যে যাতায়াতের অসুবিধাটা ক্যালিফোর্নিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের হতাশার একটা কারণ। এই যাতায়াত সমস্যা থেকেই দুই নগরীতে ছোট ছোট বিমানবন্দর গড়ে উঠছে। তাছাড়া দুই মেট্রোপলিসকে সংযুক্ত করে হাইস্পিড রেল যোগাযোগ গড়ে তোলারও উদ্যোগ চলছে। সেই রেল না থাকায় এবং বিমানবন্দর ও সড়কগুলোতে যাত্রীদের অত্যধিক চাপ থাকায় একজন সৃজনশীল উদ্যোক্তা যে এই দুই নগরীর মধ্যে যাতায়াতের এক বিকল্প পথ বের করবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কেবিন হলো সেই বিকল্প।
তবে ‘কেবিন’ বাস সার্ভিসকে যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে সেই একই প্রশ্ন হাইস্পিড রেলকে ঘিরে বহু বছর ধরে চলেছে। এটাই কি পরিবহনের সেই বিকল্প রূপ যা লোকে সত্যিই গ্রহণ করতে চায়? দুই নগরীর মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি। যাত্রীদের আরামদায়ক বিছানায় সারারাত ঘুমিয়ে কাটানোর যত সুব্যবস্থাই থাক, এ দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৯ ঘণ্টা। বিমানে পাড়ি দিতে যত সময় লাগে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু বিমানে ফ্লাইট বিলম্বিত বা বিঘিœত হওয়ার অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক যাত্রী ‘কেবিন’ বাসের টিকেট যেভাবে আগাম কিনে নিচ্ছে তা থেকে স্পষ্ট বোঝায় যায় যে লোকে গাড়ি চালিয়ে এত লম্বা পথ পাড়ি দেয়া এবং হতাশাজনক বিমান ফ্লাইট দু’টোই পরিহার করতে চায়।
কেবিন বাস সার্ভিস প্রথমে সিøপ বাস নামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে গত বছর চালু করা হয়েছিল কেবিনের টিকেট তিনদিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায় এবং কোম্পানির ওয়েট লিস্টে ২০ হাজারেরও বেশি নাম থাকে। এ মুহূর্তে কেবিনে ২৪ জন যাত্রী বহনক্ষম ২টি বাস চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত শত শত যাত্রী নিয়ে গেছে জনপ্রতি ১১৫ ডলার ভাড়ায়। বাসগুলো রাত ১১টার দিকে ছাড়ে এবং গন্তব্যে পৌঁছে পরদিন সকাল ৭টায়। ঐ দূরত্ব পাড়ি দিতে ৬ ঘণ্টা লাগার কথা।
তথাপি ৮ ঘণ্টা লাগানো হচ্ছে যাতে করে যাত্রীরা পুরো রাত ঘুমিয়ে কাটানোর মতো পর্যাপ্ত সময় পায়। এজন্য বেছে নেয়া হয় দীর্ঘতর রুট। প্রতিটি বিছানার সঙ্গে প্রাইভেসী রক্ষার জন্য পর্দা টানানোর ব্যবস্থা আছে। লাক্সারি বিমানেও প্রাইভেসীর একইরকম ব্যবস্থা থাকে তবে তার জন্য কয়েক হাজার ডলার ব্যয় করতে হয়।
কেবিন বাসের ড্রাইভাররা গতি ও কম্পনে পরিবর্তন মাপার জন্য এক্সেলোমিটার এ্যাপ ব্যবহার করে। সেই এ্যাপের ড্যাটা নিয়ে নতুন নতুন রুট পরীক্ষা করে দেখা হয় এই আশায় যাতে যাত্রাটা সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যকর হয় এবং যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারে। বিছানায় না থেকে যাত্রীরা চাইলে লাউঞ্জে গিয়ে লেদারের চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিতে অথবা মুভি দেখতে পারে। চাইলে তারা ক্যামোমিলা চা অথবা কফিও খেতে পারে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বা আরামের ব্যবস্থাটা এয়ারলাইন বা ট্রেনের চেয়ে বরং হোটেলের সঙ্গে তুলনীয়। এটেনডেন্ট শান্ত সুরেলা কণ্ঠে মাইক্রোফোনে জানাবে যে বাসে পানি পান করার ব্যবস্থা আছে। তেমনি আছে জুতা খুলে রাখার ব্যাগ। কোম্পানির নিয়োজিত একদল ইঞ্জিনিয়ার নতুন সাসপেনশন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করছে যাতে বাস যাত্রাটা এমনই ঝাঁকুনিবিহীন হয় যেন যাত্রীরা বলতে না পারে তারা রাস্তায় বাসে করে চলেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ