ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বন্যার আগাম বার্তা পাওয়া যাবে ৬ মাস আগেই

এম এস শহিদ : মাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বৎসর বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বিপুল পরিমান সম্পদের ক্ষতির সাথে অসংখ্য প্রাণহানি ঘটছে। তাই বন্যা, খরা ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তা নিয়ে গবেষকরা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধরী এ ব্যাপারে আশার বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী এমন একটি মডেল আবিষ্কার করতে ব্যর্থ, তখন আবিষ্কারক হিসেবে বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিলেন নরসিংদী জেলার ছেলে জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধরী। দূর্যোগ পরবর্তী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বিপদকে কিছুটা লাঘব করতে সমর্থ হলেও তা পুরোপুরি সক্ষম নয়। সেজন্য দুর্যোগ পূর্ববর্তী ব্যবস্থা নেয়া থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শূণ্যের কোঠায় আনা সম্ভব। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ড. রাশেদ চৌধরী ছয় মাস আগে দুর্যোগ পূর্বাভাস প্রদানে মডেল উদ্ভাবন করেন। ড. রাশেদ চৌধরী এল নিনো ও লা নিনার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বন্যা পূর্বাভাসের নতুন এ পদ্ধতিটি বা মডেল আবিষ্কার করেন। তার উদ্ভাবিত এনসোভিত্তিক আগাম পূর্বাভাস হয়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য। বন্যার দু-তিন দিন আগে পূর্বাভাস দিলে বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ ফসল ও সম্পদ রক্ষা করার প্রয়োজনীয় সময় পায় না। তাই যতো আগে পূর্বাভাস দেয়া যাবে ততোই সাধারন মানুষের সুবিধা হবে। মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ড. রাশেদ চৌধরী এ ব্যাপারে কৃষকদের সাথে কথা বলেন এবং কৃষকরা তাকে বলেন দু’ থেকে তিন মাস আগে বন্যার পূর্বাভাস পেলে তাদের খুবই সুবিধা হয়। সহজ সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত রাশেদ চৌধরী ঢাকা শহরে ছোট থেকে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ঢাকায় মাধ্যমিক পাস করেই চুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সম্মান ও বুয়েট থেকে সম্মানোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে রাশেদ চৌধরী ১৯৮৩ সালে পানি উন্নয়ন বিভাগে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। অবশ্য পরে তাকে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন থেকে তার চিন্তা ছিল মানুষ যাতে আগে থেকেই বন্যার পূর্বাভাস যথাযথ সময়ে পেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু সেসময় খুব বেশি কিছু করতে সক্ষম হননি। এরপর ১৯৯১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে জাপানে যান। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি পুনরায় বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন ৪৮ ঘন্টা আগে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া হতো। উজানের পানি ও বৃষ্টিপাতের ধরন দেখে তারা বলে দিতেন, দেশের কোন কোন নদীতে পানির প্রবাহ বাড়বে। কোথায় কোথায় বন্যার পানি বাড়তে পারে। তখন থেকেই রাশেদ ভাবছিলেন, কীভাবে সাত-আট মাস পূর্বে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া যায়। কিন্তু তার উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি আশানুরূপ সাড়া পাননি। ছয় মাস পরে আবার তিনি জাপানে যান। সেখানে তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর আর্থ সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাষ্টার রিস্ক রিডাকশন সেন্টারে দুই বৎসর মেয়াদি পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের জন্য যোগ দেন। ওই সময় তিনি ঢাকার বন্যার পানি গভীরতা ও ধরন নিয়ে কিছু গবেষণাও করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে এসে তার কাজে সহায়তার জন্য সরকারকে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। ২০০১ সালে রাশেদ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন এবং ওই দেশের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং সায়েন্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন। সেখানে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে জলবায়ু পূর্বাভাস নিয়ে গবেষনা শুরু করেন। ওই গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ছয় মাস আগে থেকে ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার আগাম বার্তা দেয়া। বাংলাদেশের বন্যা ও ঝড়ের পূর্বাভাসও তার গবেষণার অন্তর্ভূক্ত ছিল। গঙ্গা, ব্রক্ষপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা, পানিপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ধরন ও পানিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিমাপ করে বন্যার আগাম পূর্বাভাস দেয়া যায় কিনা তা নিয়ে তিনি গবেষণা শুরু করেন। ২০০৩ সালে দেশে এসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রে আবারও যোগ দেন তিনি। বন্যার পূর্বাভাস ও আলোচনাও করেন। কিন্তু হতাশ হয়ে তিনি এ ব্যাপারে গবেষণা বন্ধ করে দেন। ঠিক এ সময় রাশেদের ডাক আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারে যোগদান করার। নিজের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাজে লাগানোর এ সুযোগে সাড়া দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া বিভাগ ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা নিয়ে তিনি গবেষণা শুরু করেন। তাছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপের হনুলুলুতে এ বিষয়ে গবেষণার জন্য একটি পৃথক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি ও তার সহকর্মীদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দ্বীপবাসীকে দূর্যোগ সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস দেয়া। একটি গবেষণা প্রকল্পের অধীনে তিনি ২০০৩ সালে যোগ দেন হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারে। স্বীয় যোগ্যতা ও প্রতিভাবলে খুব শীঘ্রই তিনি ওই গবেষণা সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলাই দ্বীপবাসী আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে পারছে। ফলে ফসলের চাষ করা থেকে শুরু করে মাছ ধরার পরিকল্পনা নেয়ার মতো বিষয়ে ওই পূর্বাভাস তাদের জীবনে সুফল বয়ে এনেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ওই দ্বীপগুলোর প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির পরিমানও অনেকাংশ হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দ্বীপগুলো এবং প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী অনেক দেশ এই পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করার জন্য রাশেদের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক এনসো ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের কাছে আবেদন করতে শুরু করেছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে ছয় মাস আগেই যখন এ ধরনে পূর্বাভাস পাওয়া যায় তখন রেডিও, টিভি, বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা যায়। এর ফলে জনগণ দূর্যোগ সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক হয়। মানব কল্যাণে রাশেদ চৌধরী সর্বতোভাবে কাজ করে চলেছেন। নিজ দেশের জন্য কাজ করার জন্য বারবার তিনি ফিরে এসেছেন দেশের মাটিতে। তিনি তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে প্রতি বৎসরই দেশের মানুষকে আবহাওয়া সম্পর্কে পূর্বাভাস দিচ্ছেন। তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, আমাদের দেশ দূর্যোগ পরবর্তী মোকাবেলায় অনেকটা এগিয়ে গেছে। দূর্যোগ পরবর্তীকালে দুর্গতরা যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন। কিন্তু তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস সম্পর্কে তার আবিষ্কৃত মডেল এখনো সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়নি। তিনি আরও বলেন, দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পেলে এখনো তা করতে চান। দেশের বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কবলিত মানুষের জন্য পূর্বাভাস দিয়ে তা প্রতিরোধের জন্য তিনি জনগণকে সচেতন করতে চান। প্রিয় জন্মভূমির টানে প্রতি বৎসর একবার হলেও তিনি ছুটি কাটাতে আসেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে যান। তিনি বলেন, কেবল সরকার নয়, এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য দেশের গণমাধ্যমকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। পূর্বাভাস পাওয়া মাত্রই তার সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যাতে বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ শুরু হওয়ার আগেই জনগণ সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারে। এর ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। 
বজ্রপাতের পূর্বাভাস: বজ্রপাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অগনিত লোক মারা যায়। আমাদের বাংলাদেশেও প্রতি বৎসর বজ্রপাতে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটছে। ঝড়বৃষ্টির সময় কিংবা ঝড়-বৃষ্টি  শুরু হওয়ার পূর্বে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। কোনো স্থানে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটবে কিনা তা পূর্বেই অবহিত হওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বজ্রপাত মানে কয়েক লাখ ভোল্টের একটি কারেন্ট, যার তাপ ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড যা সূর্যের পাঁচগুণ বেশি। তাই বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতের ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি এ ব্যাপারে তারা কিছুটা অগ্রগতি লাভ করেছেন। গবেষকরা একটি হাই টেনশন ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম বজ্রপাত সৃষ্টি করে দেখেছেন- পরীক্ষাগারের বজ্রের শক্তি প্রকৃতির বজ্রপাতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, কয়েক লাখ ভোল্ট। এর ফলে প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপ উৎপন্ন হয়, যা কিনা সূর্যের উপরিভাগের চেয়ে পাঁচগুন বেশি। বজ্রপাত গবেষক ভল্ফগাং সিশাঙ্ক মনে করেন, অনেক বাড়িতে লাইটেনিং কন্ডাক্টর লাগানো থাকেনা। ফলে কাজ পড়ে প্রায়ই ওইসব বাড়িতে আগুন লেগে যায়। হাই টেনশনের ফলে ওইসব বাড়ির ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্রের ক্ষতি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বসতবাড়ি ও ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জামকে বজ্রপাতের হাত থেকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে চান। অনেক সময় নিকটবর্তী কোনো স্থানে বাজ পড়লেই ইলেক্ট্রনিক যঙন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না- যেমন ইলেক্ট্রনিক এ্যালার্ম। সিশাঙ্ক জানালেন, বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ রেখার চতুর্দিকে যে ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক আবহ সৃষ্টি হয়, তার ফলে ইলেক্ট্রনিক সরঞ্জামগুলোতে উচ্চ ভোল্টেজের সৃষ্টি হয়- যার ফলে যন্ত্রগুলো আর সঠিকভাবে কাজ করে না। বর্তমানে এমন এ্যান্টেনা তৈরি হয়েছে, যা বজ্রপাত চিনতে পারে। এ এ্যান্টেনার সাহায্যে বজ্রপাত সতর্কতা পরিবেশগুলো সময়মতো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে ইমেইল, এসএমএস কিংবা ফ্যাক্সের মাধ্যমে গ্রাহকদের অবহিত করে। এর ফলে কলকারখানা, হাসপাতাল, বিমান বন্দর, ইত্যাদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। সারাদেশে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে তার হিসেব কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। আশপাশের দেশগুলোকেও সেই হিসেবে ধরা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী স্টেফান ট্যার্ন বলেন, এ্যান্টেনার সাহায্যে বজ্রপাতের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সংকেত রেজিষ্টার করা হয়। কোথায় কতো বজ্রপাত হয়েছে তা থেকে হিসেব করে দেখা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ