ঢাকা, বুধবার 06 September 2017, ২২ ভাদ্র ১৪২8, ১৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজশাহীতে পানির দরে চামড়া বিক্রি ॥ দুঃস্থ ও ধর্মীয়-সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাথায় হাত

রাজশাহী : এবার কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। রাজশাহীর চামড়া আড়তের দৃশ্য -সংগ্রাম

রাজশাহী অফিস : রাজশাহীতে এবার কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এই দাম ছিলো সর্বনিম্ন। এমনকি গরুর চামড়া ৩শ’ টাকা আর খাসির চামড়া ৫০ টাকা দামেও কিনেছে ব্যবসায়ীরা। এই মূল্য অবনতির বড় শিকার হয়েছে দুঃস্থ মানুষ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বছরের বৃহৎ এই আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মাথায় হাত পড়েছে।
প্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে, চামড়ার চাহিদা না থাকার অজুহাতে এবার ন্যায্যমূল্য দেয়নি এখানকার ব্যবসায়ীরা। ফলে কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন নগরবাসী। এ কারণে চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এবার কারসাজি করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ছলচাতুরি করে কমমূল্যে চামড়া কেনার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করেছে একটি সিন্ডিকেট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে এবার কুরবানির চামড়ার দাম ছিল গেল কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার কমিটির কাছে দান করা চামড়াগুলোর দামও ওঠেনি ভালো। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দরে চামড়া কিনে প্রতিবছরই তাদের লোকসান গুণতে হয়। এ জন্য এবার তারা বেশ ‘সতর্ক’ হয়েই চামড়া কিনেছেন। গতবছর ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট চামড়া ৪০ টাকা ও খাসির চামড়া সারা দেশেই ২২ টাকা দরে কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। এবারও তারা একই দর চূড়ান্ত করে নিয়েছিলেন সরকারের কাছ থেকে। অন্য বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে চামড়া বিক্রি হলেও এবার তা হয়নি। ফড়িয়াদেরও দৌরাত্ম্য ছিল এবার কম। ফলে চামড়া কেনার সময় ব্যবসায়ীরা এবার বেমালুম চেপে গিয়েছেন সরকার নির্ধারিত দাম। কোথাও কোথাও চামড়া বিক্রি হয়েছে নির্ধারিত দামের চেয়েও কম টাকায়। গত কয়েকটি কুরবানির ঈদে চামড়া এতো কম মূল্যে বিক্রি হতে দেখা যায়নি। অন্য বছরগুলোর তুলনায় এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীর দাপটও ছিল কম। ফলে চামড়ার বাজারে ‘রাজত্ব’ করেছেন প্রকৃত ব্যবসায়ীরাই। তারা চামড়া বিক্রেতাদের বলেছেন, গত বছরের চামড়ার প্রায় অর্ধেক এখনো রয়ে গেছে ঢাকার ট্যানারিগুলোতে। তাছাড়া ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করতে গিয়েও টালমাটাল ব্যবসায়ীরা। ফলে নতুন করে চামড়া কেনার আগ্রহ ছিলো না তাদের। তারা চামড়া কিনছেন ঝুঁকি নিয়ে। ট্যানারি মালিকরা চামড়া না নিলে তারা লোকসান গুণবেন। এ জন্য তারা চামড়া বেশি দামে কিনতে পারছেন না। চামড়া বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহীতে গরু যে চামড়া দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সে মাপের চামড়া এবার ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর গত বছর যে চামড়া এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এবার ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিকে খাসির চামড়া এবার মাত্র ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকায় কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। ভেড়ার চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকায়। শহর ও গ্রামের অনেকেই চামড়া মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানায় দান করে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি এসব চামড়া বিক্রি করে থাকে। আর শহরের বেশিরভাগ কুরবানিদাতা চামড়া বিক্রি করে সে টাকা দুঃস্থদের মাঝে বিতরণ করে দেন। কিন্তু পঁচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় প্রায় সবাই এবার কম দামেই চামড়া বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানা গেছে। কয়েকজন কুরবানিদাতা জানান, বেশি সময় ধরে রাখলে চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই অল্পমূল্যে চামড়া বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর তেরোখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা সামশুল করিম বলেন, ৭৮ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চামড়া তিনি বিক্রি করেছেন মাত্র সাড়ে ৪শ’ টাকায়। তার অভিযোগ সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমিয়েছেন।
কোন কোন ব্যবসায়ী বলছেন, গত দু’বছর ধরে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের বহু টাকা পাওনা রয়েছে। তাই তারা ছিলেন পুঁজি সংকটে। তাছাড়া ঢাকায় চামড়া পাঠিয়ে এবারেও টাকা পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও তারা ছিলেন অনিশ্চয়তায়। আবার লবণেরও দাম বেড়েছে। তাই লোকসান এড়াতে তারা একজোট হয়েই বেশি দরে চামড়া কেনেননি। এদিকে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন- বিটিএ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এবার চামড়ার দাম কম হওয়ায় কুরবানির পশুর চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ জন্য আগামী এক মাস যাতে চামড়া পাচার না হয়- সে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। বিটিএ’র তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪.৮৩ শতাংশ গরুর চামড়া, ৩১.৮২ শতাংশ ছাগলের, ২.২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১.২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। এর অর্ধেকের বেশি আসে কুরবানির ঈদের সময়। উল্লেখ্য, এবার সরকারিভাবে কুরবানির গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা ও বকরির চামড়া ১৫ থেকে ১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ