ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘পানির দরে’ চামড়া

কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সারা দেশেই এবার অভূতপূর্ব কান্ডকারখানা চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যেমন গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, রাজশাহীতে চামড়া বিক্রি হয়েছে একেবারে ‘পানির দরে’। পবিত্র ঈদুল আযহার কয়েকদিন আগে সরকার রাজধানীর বাইরের সকল এলাকার জন্য প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। খাসির চামড়ার ক্ষেত্রে রাজধানীর জন্য প্রতি বর্গফুটে সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিল ২০ থেকে ২২ টাকা। বকরির চামড়ার জন্য সরকার আরো কম মূল্য নির্ধারণ করেছিল। প্রতি বর্গফুটে মাত্র ১৫ থেকে ১৭ টাকা ছিল রাজধানীতে সরকার নির্ধারিত মূল্য। রাজধানীর বাইরে তথা রাজশাহীসহ দেশের অন্য সকল স্থানে এই দর কমে গিয়েছিল স্বাভাবিক নিয়মেই।
এমন অবস্থার শিকার হয়েছেন ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলিমরা। তারা কুরবানি দিলেও চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে ভালো বা যথোচিত মূল্য পাননি। অধিকাংশ মুসলিমকে বরং ব্যবসায়ী নামধারী সিন্ডিকেটের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। টাকার পরিমাণও বিস্ময়কর। গত বছরও রাজশাহীতে যে গরুর চামড়া দু’ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল সে একই মাপের চামড়ার জন্য এবার ছয়শ’ থেকে আটশ’ টাকার বেশি পাওয়া যায়নি। একইভাবে তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে এমন সব গরুর চামড়া, গত বছর যেগুলোর জন্য গড়ে এক হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। খাসির চামড়ার ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট যথেচ্ছভাবে ঠকিয়েছে মানুষকে। কোনো খাসির চামড়াই এবার ৫০ থেকে ৬০ টাকার বেশি দিয়ে কেনা হয়নি। অথচ একই মাপের খাসির চামড়া গত বছর বিক্রি হয়েছিল দুইশ’ থেকে তিনশ’ টাকায়।
সিন্ডিকেটের লোকজন যুক্তি বা অজুহাতও ভালোই হাজির করেছে। তাদের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালিয়ে বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশে রাজধানীতে কয়েক মাস ধরে ট্যানারির কারখানা স্থানান্তরের যে কার্যক্রম চলছে তা এখনো শেষ হয়নি। এখনো বেশিরভাগ কারখানা হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করে চালু করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া গত বছরের বিপুল পরিমাণ চামড়া গুদামে পড়ে আছে। এসব কারণে ট্যানারির মালিকরা এবছর চামড়া কিনতে পারবেন না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। সিন্ডিকেটের প্রচারণায় একথাও জানানো হয়েছিল যে, মূলত ট্যানারি মালিকদের অক্ষমতার কারণেই সরকার এবার বাধ্য হয়ে চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ করেছে!
ব্যবসায়ী নামধারী সিন্ডিকেটের এ ধরনের প্রচারণায় কাজও হয়েছে। সে জন্যই রাজশাহীতে চামড়ার দাম শুধু কমে যায়নি, মানুষ চামড়া বিক্রি করেছে ‘পানির দরে’। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, মহানগরীর কোনো কোনো এলাকায় মানুষ এমনকি দেড় থেকে দুইশ’ টাকায়ও চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভালো বা ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এবং চামড়া পচে নষ্ট হয়ে যেতে পারেÑ এমন আশংকায় অনেকে এমনকি কোনো দাম ছাড়াই সিন্ডিকেটের লোকজনের হাতে চামড়া তুলে দিয়েছে। বহু মানুষ আবার চামড়া ফেলে দিয়েছে রাস্তায় এবং ডাস্টবিনে। এভাবে সব মিলিয়েই এবার রাজশাহীতে কুরবানির পশুর চামড়া নিয়ে যথেচ্ছাচার চালিয়েছে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এর ফলে একদিকে কুরবানিদাতা মুসলিমরা ন্যায্য মূল্য পেতে পারেননি, অন্যদিকে দরিদ্রদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদ ও মাদরাসার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
কারণ, কোনো কুরবানিদাতাই চামড়া বিক্রির টাকা নিজে নেন না। ওই টাকা দিয়ে নিজের বা পরিবার সদস্যদের জন্য কিছু কেনেন না। সম্পূর্ণ টাকাই তারা সাধারণত মসজিদ ও মাদরাসার জন্য দান করে থাকেন। অনেকে টাকার একটি অংশ গরীবদের মধ্যেও বিলিয়ে দেন। অন্যদিকে কুরবানিদাতা মুসলিমরা এ বছর ভালো দাম না পাওয়ায় মসজিদ ও মাদরাসার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দারুণভাবে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান পবিত্র ঈদুল আযহার সময় পাওয়া চামড়া এবং চামড়া বিক্রির টাকা থেকে মানুষের দেয়া দানের অর্থে নানা রকমের উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর চামড়ার দাম একেবারে তলানিতে চলে যাওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা যেমন যথেষ্ট পরিমাণে নগদ অর্থ দিতে পারেননি, তেমনি নিজেরা চামড়া বিক্রি করে মসজিদ ও মাদরাসাগুলোও পারেনি প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাজেট সংকটের সম্মুখীন হতে হবে। একই কথা দরিদ্রদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে সত্য। কারণ, তারাও বছরের এই উৎসবের দিকে অনেক আশায় তাকিয়ে থাকে। এ সময় দানের অর্থও তারা যথেষ্টই পায়। কিন্তু চামড়ার দাম হঠাৎ কমে যাওয়ায় এ বছর তারাও বঞ্চিত হয়েছে।
এভাবে সব মিলিয়েই এবার রাজশাহীর ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ব্যবসায়ী নামের সিন্ডিকেটের কারসাজির শিকারে পরিণত হয়েছেন। এমন অবস্থার অশুভ প্রভাবে মসজিদ ও মাদরাসার মতো ধর্মীয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো তো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেই, একই সঙ্গে বঞ্চিত হয়েছে দরিদ্র মানুষেরাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের পক্ষ থেকে যদি আগে থেকেই প্রচারণা চালানোসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে সিন্ডিকেটের আড়ালে কোনো গোষ্ঠীর লোকজনই চামড়ার বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার সুযোগ পেতো না। তেমন অবস্থায় কুরবানিদাতারা পশুর চামড়ার ন্যায্য মূল্য যেমন পেতেন তেমনি উপকৃত হতো মসজিদ, মাদরাসা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও। বলা দরকার, রাজশাহীর পাশাপাশি দেশের অন্য সকল স্থানেও চামড়ার মূল্য নিয়ে একই ধরনের কর্মকান্ড চালানো হয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। কারণ, এই খবর এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে যে, এবার বিপুল পরিমাণ চামড়া ভারতে পাচার হয়ে গেছে। এখনো পাচার অব্যাহত রয়েছে। এর কারণ, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের বাজারে চামড়ার মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি। মূলত সেজন্যই সুচিন্তিতভাবে প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে দেশের বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। তারাই চামড়ার দামে পতন ঘটিয়েছে। অন্যদিকে সরকারও এ বিষয়ে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি। চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ করার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে বরং পরোক্ষভাবে চোরাচালানীদেরকেই প্রশ্রয় দেয়া হয়েছিল। আমরা মনে করি, বর্তমান পর্যায়ে সরকারের উচিত আইন-শৃংখলা বাহিনীগুলোকে এমনভাবে তৎপর করে তোলা, যাতে কুরবানির পশুর চামড়া ভারতে পাচার না হতে পারে। আমরা আগেও বলেছি, চামড়ার পাচার প্রতিহত না করা গেলে বাংলাদেশের ট্যানারি শিল্প মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে, যার অশুভ প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতিও বিপুল ক্ষতির শিকার হবে। সুতরাং চামড়ার পাচার প্রতিহত করতেই হবে। আমরা বিভিন্ন এলাকার সকল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ