ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রয়োজন অ্যাকশন

ঈদুল আযহার ছুটির পর রাজধানী ঢাকা আবার কর্মচঞ্চল হতে শুরু করেছে। বেঁচে থাকতে হলে প্রয়োজন হয় রুটি-রুজির। এই বিষয়টি কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না। বাস্তব প্রয়োজন থেকেই মানুষ বিষয়টি উপলব্ধি করে থাকে। তাই মানুষ কাজ করবে, ঢাকা কর্মচঞ্চল হবে- এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু এই যে এত কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গেল, পশু কুরবানি করলো- এর তাৎপর্য কি? একটা বিষয় তো সহজেই উপলব্ধি করা যায় যেটাকে আমরা বলি ‘নাড়ির টান’। গ্রাম থেকেই তো মানুষ শহরে এসেছে, অনেকের পূর্ব পুরুষতো এখনো গ্রামেই অবস্থান করছেন। ফলে ঈদের মতো পবিত্র আনন্দ অনুষ্ঠানে মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে যাবেন এটাইতো স্বাভাবিক। তবে এই ঈদের মূল কাজ কুরবানি। এখন প্রশ্ন হলো, শুধু পশু জবাই করে গোস্ত ভক্ষণের নামই কি কুরবানি?
কুরবানিকে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের আবার পুনঃপাঠ করতে হবে কুরবানির ইতিহাস। এই ইতিহাসে আমরা লক্ষ্য করেছি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে পিতা-পুত্রের অপূর্ব ত্যাগের উদাহরণ। পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এবং পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) এর কুরবানির ইতিহাস এই বার্তাই পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে- আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন, আমার মৃত্যু এবং কুরবানি সবই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই নিবেদিত। যে ঈদের সাথে এমন বার্তা জড়িয়ে আছে, সেই ঈদকে আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। আর তা করতে গেলে কুরবানির পশুকেন্দ্রিক যে ব্যস্ততা তা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে এর দার্শনিক ব্যঞ্জনাকে আমাদের অন্তরে লালন করতে হবে।
ঈদের পর আমরা আবার কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি। এখন প্রশ্ন হলো, কর্মজীবনে প্রবেশের পর কি আমাদের ঈদের সৌরভ কিংবা ঈদের বার্তা শেষ হয়ে যাবে? আসলে প্রকৃত মুসলিমের জীবনে ঈদের বার্তা কখনো শেষ হয়ে যায় না। কারণ ঈদতো শুধু এক দিনের জন্য আসে না। কুরবানির চেতনাকে লালন করতে হলে আমাদের পরিবারে, সমাজে, অফিসে-আদালতে, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান চর্চায় এবং বিশ্বপরিস্থিতিতে বান্দা হিসেবে সচেতন ও শুদ্ধ আচরণ করতে হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে ত্যাগের, প্রয়োজন হবে কুরবানির। সেই কুরবানি দিতে আমরা প্রস্তুত আছি কী?
বর্তমান সভ্যতা কুরবানির চেতনা থেকে অনেক দূরে। নইলে মিয়ানমারে আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর জুলুম-নির্যাতন, সহিংসতা ও বর্বরতার এমন সীমালঙ্ঘন করে কিভাবে? দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বসতিতে ঢুকে নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলী চালাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নারীদের সম্ভ্রমহানি করছে। এমন দুর্বিষহ অবস্থায় রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোঁড়া অনেক গুলী বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে এসে পড়ছে। ফলে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এমন অবস্থায় সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে বাংলাদেশের ভূ-খ-ে আর একটি গুলী পড়লে তার পাল্টা জবাব দেয়া হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বর্ডারগার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এত ব্যাপক বর্বরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা যেন সভ্যতার শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হচ্ছে না। রোহিঙ্গারা মুসলমান এটাই কি তার বড় কারণ?
আরও বড় আশঙ্কার খবর হলো, রাখাইন রাজ্য থেকে অমুসলিম মিয়ানমার নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম রাখাইনে চলমান সংঘাতের মধ্যে অ-মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলো থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার মিয়ানমার নাগরিককে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এটি সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর বড় ধরনের দমন অভিযানের প্রস্তুতি বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশৃঙ্খল অবস্থা ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রবেশের কড়াকড়িতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা জটিল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি পুলিশ স্টেশন ও সেনাছাউনিতে আক্রমণের যে ঘটনা ঘটেছে তা এত ব্যাপকভত্তিক ছিল যে, এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার চেয়ে আন্দোলন বা বিদ্রোহ বলাই শ্রেয়।  একটি সেনাসূত্র জানায়, ‘সব গ্রামবাসী চরমপন্থীতে পরিণত হয়েছে। তারা যা করছে তা বিদ্রোহের সামিল। হামলাকারীরা মরবে কি বাঁচবে তা নিয়ে পরোয়া করছে না। আমরা বলতে পারছি না তাদের মধ্যে কারা বিচ্ছিন্নতাবাদী।’ পর্যবেক্ষকদের মতে, আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (এ আর এসএ) নেতা আতাউল্লাহর নেতৃত্বে অনেক রোহিঙ্গাই সংগঠিত হচ্ছে। ৩০টি পুলিশ স্টেশন ও ১টি সেনা ছাউনিতে একযোগে আক্রমণ রোহিঙ্গাদের ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ আরএসএ এ হামলার দায় স্বীকার করেছে।
রাখাইন রাজ্যের সংকট নিরসনে গঠিত কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনে অতিমাত্রায় শক্তি প্রয়োগ করলে রোহিঙ্গা চরমপন্থীদের উত্থান হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া, তাদের চলাফেরা নিশ্চিত করা, শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মানবিক সেবার অধিকার দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এদিকে রাখাইন পরিস্থিতিতে ভূমিকা পালনের ব্যাপারে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেয়িশার উপর স্থানীয়ভাবে চাপ বাড়ছে। মালয়েশিয়ান কনসালটেটিভ কাউন্সিল অব ইসলামিক অরগানাইজেশন (মাপিম) রোহিঙ্গাদের রক্ষায় আশিয়ানের প্রভাবশালী রাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরস্ত্র নাগরিক, বিশেষত চরম ঝুঁকিতে থাকা নারী-শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপযুক্ত নিরাপত্তা এবং আশ্রয় নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর যে বর্বরতা ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার দায় শুধু মিয়ানমার সরকারের উপরই বর্তায় না, মানবতা বিরোধী এমন অপরাধ অব্যাহতভাবে চলতে দেয়ায় ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে বর্তমান সভ্যতার শাসকদেরও। লক্ষণীয় বিষয় হলো, রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জুলুম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে জাতিসংঘসহ কোনো কোনো মানবাধিকার সংগঠন কিছু কথা বললেও এখনও কার্যকর কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
পরিস্থিতির পরিবর্তনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো লক্ষ্য করা না গেলেও বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সভা-সমাবেশ হয়েছে। নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে ফোন করে রোহিঙ্গাদের সাথে মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে মালদ্বীপ। কিন্তু এসব বিষয়কে তেমন গুরুত্ব দিচ্চে না মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা অব্যাহত রেখেছে তারা। বিষয়টি হয়তো লক্ষ্য করেছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। জাকার্তায় রাষ্ট্রীয় প্রাসাদে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা শিগগিরই বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধুমাত্র সমালোচনামূলক বিবৃতিতে কাজ হবে না, রাখাইন সংকট সমাধানে বাস্তব অ্যাকশন দরকার। আমাদের হাতে সময় কম। দুঃখের বিষয় হলো, সভ্যতার শাসকরা অ্যাকশনে যেতে চাইছে না। জ্বালানি ও বাণিজ্য স্বার্থসহ মুসলমানদের ব্যাপারে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এখনো কোনো যৌক্তিক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। আর মুসলিম বিশ্বও কুরবানির চেতনায় মজলুমের পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে এখনো সমর্থ হয়নি। ফলে জালেমদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ