ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

টেস্ট ক্রিকেটেও উন্নতির রেখা বাংলাদেশের

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ক্রিকেট পরাশক্তি নয় উঠতি শক্তি হিসেবে এখন বাংলাদেশ সবার উপরে। বিশেষ করে টানা তিনটি সিরিজে ইংল্যান্ড, শ্রীলংকা আর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সাদা পোশাকে এখন বড় শক্তিধর দেশগুলোর আতঙ্কের নাম লাল সবুজ পতাকাধারীরা। বর্তমান সময়ে এশিয়ার ক্রিকেটশক্তিতে বদল এসেছে। এত দিন এ অঞ্চলের ক্রিকেট মানেই ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ ছিল শিখতে থাকা ছাত্র। সেই শিক্ষা পূর্ণ করে এখন উঁচু স্থরে বীরদর্পে হাঁটছেন মাশরাফি-মুশফিকরা। এশিয়ায় নতুন ক্রিকেটশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলাদেশ। একের পর এক সাফল্য জুড়ে যাচ্ছে তাদের নামের পাশে। তাই এশিয়ার সবচেয়ে নবীন টেস্ট খেলুড়ে দেশটি এখন প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটশক্তি। বাংলাদেশের জয় এখন আর অঘটন নয়; পরিকল্পিত, রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সে ভরা সাফল্যময়। গত ৩ বছরে তাকিয়ে কেউ যদি এশিয়ান ক্রিকেটশক্তির নাম বলে, তবে ভারতের পরই আসবে বাংলাদেশ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে ক্রিকেটের বড় টেবিলে নিজেদের উঠে আসার প্রমাণ প্রতিনিয়ত রাখছেন মাশরাফি-মুশফিকরা। এ বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগ পর্যন্ত সাফল্য বিচারে ভারতের সঙ্গে এশিয়ার ক্রিকেট সুনামটা ছিল বাংলাদেশের। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর কুলীন শক্তি পাকিস্তান নিজেদের সুনাম ফিরিয়ে এনেছে। তবে উল্টো পথে হাঁটছে শ্রীলঙ্কা। ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ীদের অর্জনের খাতা ক্রমেই ব্যর্থতায় ভরে যাচ্ছে। এশিয়ার ক্রিকেট রূপকথায় এ জায়গাটাই নিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার ব্যর্থতায় এখন ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম উঠে আসছে উপমহাদেশের ক্রিকেট আড্ডায়। আলোচনার মূল বিষয়বস্তুÑ বাংলাদেশ কি তাহলে নতুন শ্রীলঙ্কা? ১৯৯০-এর দিকে ১৯৮৩ ও ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী ভারত এবং পাকিস্তানের মতো ক্রিকেটের কুলীন দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে খেলত শ্রীলঙ্কা। বর্তমান বাংলাদেশ ওই শ্রীলঙ্কার মতোই ক্রিকেটের সুপারপাওয়ারদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এগোচ্ছে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে ওয়ানডেতে বেশ ভালো দল হিসেবে সম্মান পাওয়া শুরু বাংলাদেশের। ২ বছরের ব্যবধানে টেস্ট ক্রিকেটেও নিজেদের প্রাপ্য সম্মান আদায় করে নিয়েছে। বিশেষ করে ঘরের মাঠে সব দল যেমন সুবিধা নিয়ে ম্যাচ জিতে নেয়, সেই অভ্যাসে নিজেদের রাঙিয়েছে মুশফিকুর রহিমের দল। এখন র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলও বাংলাদেশে এসে মুশফিকদের সমীহ করছে, মাশরাফিদের এগিয়ে রাখছে। গত বছরের শেষদিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় দিয়ে সিরিজ ড্র করেছে বাংলাদেশ। দেশের বাইরে শ্রীলঙ্কার মাটিতে লঙ্কানদের টেস্টে হারিয়েছে। আর সর্বশেষ সাফল্যÑ ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়া। এ সাফল্যগুলো এখন আর অঘটন নয়। বাংলাদেশের সর্বশেষ তিনটি টেস্ট জয় যথাক্রমে ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। মোট ১০১ ম্যাচে ১০টি। এর মানে বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সময় এসেছে বাংলাদেশের। এর মানে বিশ্বের যে কোনো দলকেই হারানোর ক্ষমতা এসেছে বাংলাদেশের। ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কা দলের সঙ্গে বাংলাদেশের এ দলটির বেশ পার্থক্য রয়েছে। অর্জুনা রানাতুঙ্গার ক্রিকেট  সৈন্যভা-ারে অরবিন্দ ডি. সিলভা, সনাৎ জয়সুরিয়া, মুত্তিয়া মুরলিধরন, রমেশ কালুভিথারানাদের মতো গ্রেটরা ছিলেন। একা হাতেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার সামর্থ্য রাখতেন তারা। এ সময়ের বাংলাদেশ দলে তাদের মতো গ্রেট ক্রিকেটারের আধিক্য নেই, তবে সাকিব-তামিম আছেন। বাংলাদেশের এ দুই গ্রেটকে ঘিরেই বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন শক্তি হিসেবে ধেয়ে আসবে টাইগাররা। সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনও এমন ভবিষ্যৎ দেখছেন, ‘অবশ্যই ওই লঙ্কান দলটি ছিল বিশেষ কিছু, এক্সেপশনাল। তবে আমাদের দলেও তামিম, সাকিবসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বমানের ক্রিকেটার আছে, যারা তরুণদের নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দিচ্ছে। ওরা দীর্ঘদিন এ জার্সির হয়ে খেলছে। আমি অবাক হব না যদি তামিম, সকিব, মুশফিক ও মাশরাফিরা ওই শ্রীলঙ্কান গ্রেটদের মতো সম্মান পেয়ে থাকে। আমার মনে হয়, নিকট অতীতে এমনটাই হবে। ওদের কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বদলে যাবে এবং ওরা রানাতুঙ্গা-ডি সিলভাদের মতো গ্রেটদের কাতারে দাঁড়াবে।’ বর্তমান বাংলাদেশ দলটির সঙ্গে ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কা দলের বেশ মিল দেখেন রাসেল আরনল্ড। বর্তমানে ধারাভাষ্য করা সাবেক লঙ্কান ক্রিকেটার নিকট অতীতে বাংলাদেশের বড় সাফল্য কামনা করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের এমন বদলে যাওয়ার পেছনে কোচ চান্দিকা হাথুরুসিংহের বড় ভূমিকাও দেখছেন, ‘দুই দলই একরকম। শ্রীলঙ্কা যেমন লড়াকু ক্রিকেট খেলত, বাংলাদেশও এখন সেই রকম খেলছে। এর পেছনে হাথুরুসিংহের অবদান ভুললে চলবে না। সে ওই সময়ে শ্রীলঙ্কার হয়ে টেস্ট খেলেছে। সে জানে, কীভাবে একটি দলকে দাঁড় করাতে হয়। সেটাই বাংলাদেশের জন্য কাজে দিয়েছে। নিকট অতীতে বাংলাদেশ বড় সাফল্য পেলে অবাক হব না।’ রানাতুঙ্গার ওই ক্রিকেট সৈন্যবাহিনী থেকেই বেরিয়ে এসেছেন মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারা। যাদের ঘিরে শ্রীলঙ্কা নিজেদের হোমকে বানিয়েছে অভেদ্য দুর্গ আর হয়েছে শক্তিশালী ওয়ানডে ইউনিট। বাশারের মতে, ঠিক একই পথে হাঁটছে বাংলাদেশ, ‘ভুললে চলবে না, এখন ওয়ানডে টুর্নামেন্টে আমরা শিরোপা লড়াই দিচ্ছি। আর ঘরের মাঠে টেস্ট পারফরম্যান্স আমাদের সামর্থ্যরে প্রমাণ রাখে। আমরা এখন নিজেদের মাঠে যে কোনো শক্তিকে পরিকল্পিতভাবেই হারাতে পারি।’
এমন অর্জনে বেশি করেই উচ্চারিত হচ্ছে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহীমের নাম। বৃষ্টি, স্পিন এবং সাকিব-তামিমের ৫০তম টেস্ট ম্যাচ। ঢাকা টেস্ট শুরুর আগে আলোচনার শীর্ষে ছিল এ ক’টি বিষয়। তবে বৃষ্টি বাধা হয়নি ঢাকা টেস্টে। কিন্তু স্পিন যথারীতি দাপট দেখিয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছে সাকিব ও তামিমের পারফরম্যান্স। দু’জনের সাফল্যের সেই স্কোর জানিয়ে দিই আগে। তামিম ইকবাল প্রথম ইনিংসে ৭১। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৮ রান। ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ১৪৯ রান তার। সাকিব আল হাসান প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান। উভয় ইনিংসে ৫টি করে উইকেট। ম্যাচে ১৫৩ রানের বিনিময়ে ১০ উইকেট। কেন তাকে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বলা হয় সেটা হাতে-কলমের পারফরম্যান্সে আরেকবার দেখিয়ে দিলেন সাকিব আল হাসান। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো টেস্টে ১০ উইকেট পেলেন। ২০ রানে ঢাকা টেস্টে হারের পর সিরিজে ০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর নিজ দলের ভুল কোথায় হল-সেই ব্যাখ্যার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ তার সংবাদ সম্মেলনে তামিম ও সাকিবের প্রশংসাই বেশি করলেন। ব্যাটে-বলে বিশ্বসেরা। তাও শুধু একটা মাত্র কোনো ফরম্যাটে নয়। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আস্থার নাম সাকিব। সম্ভবত এজন্য মানুষ তাকে ভালোবাসে ডাকেও-বাংলাদেশের জান, সাকিব আল হাসান! তবে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার আবেগী দুনিয়ায় বেশি ভেসে বেড়াতে রাজি নন। আত্মতুষ্টি তাকে স্পর্শ করে না। আর তাই শতাব্দী পুরনো টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারদের পাশে তার নাম এখন উচ্চারিত হলেও নিজেকে দলের ১১ জনের একজন ভাবতেই বেশি ভালোবাসেন সাকিবÑ ‘যে কোনো ম্যাচ জেতাটা আনন্দের। আর ম্যাচ জেতায় আমি অবদান রাখতে পেরেছি এ অনুভূতিটা অনেক আনন্দ দিচ্ছে। দলের জন্য আমি সবসময় অবদান রাখতে চাই। নিজেকে সেরা অলরাউন্ডার বা ওরকম কিছু মনে হচ্ছে না। আমি যেহেতু ব্যাটিং-বোলিং দুটোই করি সেহেতু চেষ্টাটা থাকবে উভয় দিক দিয়ে সমানভাবে অবদান রাখার।’ টেস্টে বাংলাদেশের পাওয়া ১০ জয়ের ৯টিতেই খেলেছেন সাকিব। আর তার সময়ে জেতা এই ৯টি টেস্ট ম্যাচের অন্তত পাঁচটিতে ব্যাটে-বলে মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তিনি। কাল ঢাকা টেস্টের হিসাবটা যোগফলে আনলে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ছয়বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন সাকিবই। নিজেকে আলাদা করে চেনানোর জন্য সবকিছুই আছে সাকিবের। কিন্তু তারপরও একক কৃতিত্বের চেয়ে দলীয় চেতনায় বিশ্বাস তার। তাই তো বলতে পারছেন-‘এ টেস্ট জেতার কথাই ধরুন। কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।
 অনেক কঠিন ছিল। তামিম দুই ইনিংসেই অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। ব্যাটিংয়ে ছোট ছোট আরও অনেকের অবদান ছিল। এই উইকেটে রান করাটা অনেক কঠিন ছিল। তাই ব্যাটসম্যানদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। তামিমের দুর্ভাগ্য দুটি ইনিংসেই তার সেঞ্চুরি হতে পারত। ব্যাটিংয়ে মুশফিকের অবদান, প্রথম ইনিংসে নাসিরের ব্যাটিং, দ্বিতীয় ইনিংসে সাব্বিরের ব্যাটিংও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সঙ্গে মিরাজের ব্যাটিংয়ের অবদানের কথাও বলতে হবে। টেস্ট জেতার এসব সহায়তা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। আমি হয়তো একপাশ থেকে ৫টি উইকেট পেয়েছি। কিন্তু অন্যপাশ থেকেও তো আমাদের বাকি বোলাররা উইকেট নিয়েছে। দিন শেষে আসলে ক্রিকেট টিম গেম। এতে সবার অবদানই আছে। কারও হয়তো একটু বেশি’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ