ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাকিব বর্তমান সময়ের সেরা অল রাউন্ডার

বাংলাদেশের ক্রিকেট সব সময় কিছু অসাধারণ খেলোয়াড় পেয়েছে। এদের মধ্যে প্রকৃতি প্রদত্ত মেধায় ভরপুর ছিলেন মো. আশরাফুল বা আফতাব আহমেদের মত তারকারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্বল নৈতিকতার কারণে তারা নিজেদের মেধার প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি নিজেদের। তবে এদের মধ্যে থেকে একজন খেলোয়াড় ঠিকই সঠিক পথটি খুঁজে নিয়েছেন। তিনি বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান।  বা এ যাবৎ কালে বাংলাদেশের  শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার। কঠোর পরিশ্রমের কারণে অর্জিত যোগ্যতার কারণে তিনি এখন তরুন ক্রিকেটারদের কাছে অনুকরণীয়।  কিন্তু প্রশ্ন হলো  সাকিব কিভাবে ক্রিকেটের তিন ফর্মেটেই বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডার হয়ে উঠলেন।  নিশ্চয়ই তার  ‘বিশ^ সেরা’ হওয়ার পিছনে কিছু কারণ আছে। এবার আমরা বিশ্লেষণ করবো এ কারণগুলো।
ব্যাটিং প্রতিভা : একজন স্পিন অলরাউন্ডার সব সময় ভাল মারমুখী ব্যাটসম্যান হয়ে উঠতে পারে না। বিশেষ করে স্লো-বাঁহাতি। কিন্তু গতানুগতিক প্রথা ভেঙে তিনি হয়ে ওঠেছেন বিশ্বের শীর্ষ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। যে কোন পরিস্থিতিতে  ব্যাট করার সামর্থের কারণে তিনি হয়ে উঠেছেন  প্রতিপক্ষের জন্য হুমকির কারণ। তিনি যেমন  দারুন দক্ষতার সঙ্গে বোলিং করতে পারেন তেমনি ব্যাট হাতে দলকে পৌঁছে দিতে পারেন বড় ইনিংসে। যে কারণে  সাকিবের রয়েছে আলাদা ভক্তকুল। বাংলাদেশে ক্রিকেট ভক্তদের একটা ধারনাহলো-সাকিব যতক্ষণ ক্রিজে আছে, ততক্ষণ আশা আছে। বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিংয়ের প্রতি সাকিবের ভালবাসা কিছুটা বেশী। সাকিব নিজেই বলেছেন বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিং নিয়ে তিনি  বেশি পরিশ্রম করেন। এ পর্যন্ত ৫০ টেস্টে ৯৪  ইনিংস থেকে ৫ সেঞ্চুরি ও ২২ হাফ সেঞ্চুরিসহ  ৩৫৬৮ রানের পাশাপাশি ১৬৭ ওয়ানডে  ইনিংস থেকে ৪৯৮৩ রান সংগ্রহে রয়েছে সাকিবের।  টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে তার বর্তমান ব্যাটিং গড় দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৩৭,৯৫ ও ৩৪.৮৪। যে কারণে দলে তিনি সেরা ব্যাটসম্যানের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বোলিং পারফর্মেন্স : সাকিব হচ্ছেন একজন বুদ্ধিমান বোলার। তার বোলিং দেখেই বুঝা বোলিংয়ে  প্রকৃতি পদত্ত  মেধা লুকিয়ে আছে। তিনি দলের মধ্যেও সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। নিজের জন্য এতকিছু করা সম্ভব হবার কারণ হচ্ছে তার  কঠোর পরিশ্রম। যার মাধ্যমে নিজের প্রতিভাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। সাকিবের বোলিং হচ্ছে একটি প্রকৃতিগত প্রতিভা। রবিন্দ্র জাদেজার পর  নিঃসন্দেহে সাকিব হচ্ছেন বিশ্বের সেরা স্লো-বাঁহাতি বোলার। যখন প্রতিপক্ষের উইকেট ফেলে দেয়ার প্রয়োজন হয়, কিংবা তাদের রান তোলার গতি কমানোর প্রয়োজন পড়ে তখনই সাকিবের হাতে বল তুলে দেয়া হয়। যেখানে  তিনি কখনো হতাশ করেননি।    
টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে সাকিব ক্রিকেট বিশ্বের সেরা বোলারদের একজন হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ধারাবাহিকতা : বাংলাদেশ দলের জন্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশী কিছু দিয়েছেন সাকিব। ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশে সব সময় প্রতিভাবান খেলোয়াড় বের হচ্ছে। তবে তাদের বেশীরভাগই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেন না। তাদের মধ্যে কেউ হয়তোবা একবার/দু’বার ভাল করে ভক্তদের বাহবা কুড়িয়েছেন। কিন্তু সাকিব বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি সব সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। তার আগে এমন ধারাবাহিক খেলোয়াড় বাংলাদেশ কখনো দেখেনি। ২০০৬ সালে সবার নজরে আসার পর থেকে ৩০ বছর বয়সি এই তারকা একই ধারাবহিকতা প্রদর্শন করে আসছেন। যা এর আগে কেউ দেখাতে পারেনি। যে কারণে তিন ফর্মেটের ক্রিকেটেই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি শীর্ষ র‌্যাংকটি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
মাঝপথে রবীন্দ্র জাদেজা টেস্টের একনম্বর অল রাউন্ডারের জায়াগাটি দখল করেছিল। কিন্তু সাকিব ফের দীর্ঘ ভার্সনের ক্রিকেটের এক নম্বর র‌্যাংকটি পুনরুদ্ধার করেন। বর্তমানে টি-২০, ওডিআই এবং টেস্ট এই তিন ফর্মেটেরই এক নম্বর অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসান।
ম্যাচ জয়ের সামর্থ্য : আইসসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে  সাকিব যা করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশ দলের আর কোন ক্রিকেটার এরকম ম্যাচ জয়ের দক্ষতা দেখাতে পারেনি। ওই ম্যাচে আপাতদৃস্টিতে  কিউইদের বিপক্ষে বাংলাদেশ হারতে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে সাকিব হারিয়ে দেন ব্ল্যাক ক্যাপসদের। যে কোন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জয়ের সামর্থ্য  আছে সাকিবর। নিউজিল্যান্ডের ছুড়ে দেয়া ২৬৬ রানের টার্গেট টপকাতে গিয়ে শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশের টপ অর্ডার। ১১.৪ ওভারে ৩৩ রান তুলতেই হারায় ৪ উইকেট। এরপর সাকিব এবং রিয়াদ  বাংলাদেশকে জয় এনে দিয়েছেন। সাকিবের ওই নায়কোচিত পারফর্মেন্সের কারণেই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌছাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ম্যাচে সাকিব ১১৫ বল মোকাবেলায় ১১৪ রান করেন। এটি হচ্ছে তার করা অনেক কীর্তির একটি। ব্যাটে হোক কিংবা বোলিংয়ে, তিনি বাংলাদেশকে বহুবার সংকটাপন্ন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছেন।
অধ্যবসায় : দলের মধ্যে জয়ের মানষিকতা যুক্ত করেছেন সাকিব। এটি একক মেধা দিয়ে হয় না। আশরাফুর বা আফতাবের মধ্যেও প্রকৃতি প্রদত্ত মেধা ছিল। কিন্তু অধ্যাবসায় ও আত্মবিশ্বাসে ঘটতির কারণে তারা সফলতা পায়নি, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য অপরিহার্য। যদি শুধুমাত্র পূর্বসুরী মেধাবীদের মত প্রকৃতিপ্রদত্ত মেধার ওপর নির্ভরশীল থাকতেন, তাহলে হয়তো সাকিবও হারিয়ে যেতেন। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তি তাকে আজ বিশ্ব সেরার আসনে বসিয়েছে। সাকিব থাকা মানে দলে দু’জন খেলোয়াড় থাকা। ১১জন খেলোয়াড় নিয়ে দল গঠিত হলেও একাদশে সাকিব থাকা মানে ১২জন খেলোয়াড় দলে থাকা।
তিনি বিশ্ব সেরার আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলাদেশে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ের আসন অলংকৃত করলেও সব সময় সচেতন থাকেন। তিনি কোন কিছুর ওপর নির্ভর করে থাকেন না। সব সময় কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে নিয়োজিত থেকে সেরার আসনটি ধরে রেখেছেন। সাকিবের  নায়কোচিত  নৈপুন্য সর্বশেষ  দেখা গেছে  অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে  প্রথম টেস্টে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক ছিলেন সাকিব। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে করেছেন ৮৪ রান। কিন্তু  বল হাতে পাঁচ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে  ব্যাট হাতে সাফল্য না পেলেও  বল হাতে আবারো ৫ উইকেট শিকার করে হয়েছেন ম্যাচ সেরা।  তার চেয়েও বড় কথা এ ম্যাচ দিয়ে ক্রিকেট রেকর্ডর অনেক পাতায়ই নাম লিখিয়েছেন তিনি। বাসস

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ