ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের ফেরা ঠেকাতে সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখছে মিয়ানমার

 

সংগ্রাম ডেস্ক : গত তিনদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে সীমান্তের একাংশ জুড়ে ভূমি মাইন পুঁতছে মিয়ানমারের সেনারা যাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আর ফিরতে না পারে। ইসরাইলী মিডিয়া হারতেজ ছাড়াও রয়টার্স একই ধরনের খবরে বলছে সীমান্তের এত কাছে মাইন পাতার প্রতিবাদ জানাবে বাংলাদেশ। রয়টার্সের পাঠানো এই খবরটি অবশ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি বিবিসি বাংলা। হারতেজ ও রয়টার্স অন্তত বাংলাদেশী দুই কর্মকর্তার সূত্রে এ খবর পেয়েছে বলে দাবি করছে। তবে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে জানিয়েছেন, সীমান্তে মাইন পেতে রাখার এবং এসব মাইনে বাংলাদেশে পলায়নরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হতাহত হবার কিছু কিছু খবর তারাও পাচ্ছেন। মিয়ানমারের নেতা অং সাং সু চি দাবি করেছেন, রাখাইন প্রদেশে যে সংকট চলছে তা তার ভাষায় ভুল তথ্যের মাধ্যমে বিকৃত করা হচ্ছে। সু চি’র অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বুধবার বলা হয়, রাখাইনে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা রয়েছে, যেটাকে ভুয়া সংবাদের মাধ্যমে উস্কে দেয়া হচ্ছে যাতে সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়। মিয়ানমার সফররত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরপরই এই বিবৃতিটি প্রকাশ করে ইয়াঙ্গুন। হারতেজের প্রতিবেদনে বাংলাদেশী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে মাইন পুঁতে দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের মাইন পুঁতে রাখান তথ্যপ্রমাণ এমনকি ছবিও বাংলাদেশের হাতে রয়েছে। তবে যারা মাইন পুঁতছে তারা মিয়ানমারের সেনা কি না কিংবা তারা সামরিক পোশাক পরিহিত কি না সে ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা না গেলেও তারা যে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী নয় এ বিষয়টি নিশ্চিত। বিজিবির এক কর্মকর্তা মনজুরুল হাসান খান রয়টার্সকে এর আগে বলেন, মঙ্গলবার মিয়ানমার সীমান্তে দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এরপর খোঁজ নিয়ে জানা যায় মিয়ানমার সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে। মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় একজন রোহিঙ্গার বাম পা উড়ে যায়। তাকে চিকিৎসার জন্যে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হচ্ছিল। আরেকজন রোহিঙ্গা বালক মাইনের আঘাতে আহত হয়। মিয়ানমার বিশ্বে সর্বাধিক মাইন ব্যবহারকারী দেশ। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন বাতিল চুক্তিতে যে কয়টি দেশ স্বাক্ষর করেনি মিয়ানমার তাদের মধ্যে অন্যতম। আহত রোহিঙ্গার শরীর থেকে ১০ সেন্টিমিটার ধাতব টুকরো বের করা হয়েছে। তিনি রয়টার্সকে জানান, মিয়ানমারের সেনারা এধরনের মাইন পুঁতছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এব্যাপারে কোনো মন্তব্য রয়টার্স এখনো জানতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি।

সহিংসতা বন্ধ করুন : মিয়ানমারকে জাতিসংঘ মহাসচিব

মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জাতি নির্মূলের ঝুঁকির বিষয়ে মিয়ানমারকে সতর্ক করেছেন তিনি। অ্যান্তোনিও গুতেরেস মঙ্গলবার এই আহ্বান জানালেন যখন মিয়ানমার ছেড়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী সহিংসতা শুরু হওয়ার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এরই মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ করেছে। অজ্ঞাত ব্যক্তিরা মিয়ানমার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কয়েকটি পোস্টে আগুন দেয়ার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্বিচার অভিযান শুরু করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সব বয়সি রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছে। যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মৌলবাদী বৌদ্ধরা যোগ দিয়ে লুটতরাজ ও নির্যাতন চালাচ্ছে। গত ১১ দিনের সহিংসতায় প্রায় ৪০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে বহু মানুষ। মিয়ানমারে গুলীবিদ্ধ হওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার পর মারা গেছেন। সীমান্ত এলাকা ও সামীনা নির্ধারণকারী নাফ নদী থেকে বেশ কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের গুতেরেস বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ক্ষোভ ও তাদের অধিকারের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য অনস্বীকার্য ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, ‘সহিংসতার এই ভয়ানক চক্রের ইতি টানতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তাদের সবাইকে প্রয়োজনমতো নিরাপত্তা ও সহায়তা দিতে হবে।’ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মহাসচিব গুতেরেস। এ জন্য ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে চিঠি দিয়েছেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদের কাছে মহাসচিবের চিঠি দেয়া একটি বিরল ঘটনা। চিঠিতে গুতেরেস বলেছেন, ‘সংকট আরো ঘনীভূত হওয়া ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়ার দায় রয়েছে।’

রোহিঙ্গা মুসলিমদের বের করে দেবে ভারত

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু ফের জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমরা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। ওদের ভারত থেকে বের করেই দেয়া হবে। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে বলে দিতে চাই, জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের আওতায় নথিভুক্ত হোক বা না-ই হোক, রোহিঙ্গারা ভারতের চোখে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। আর আইনে যেহেতু ওরা বৈধ অভিবাসনকারী নয়, ওদের ভারত থেকে বের করে দেয়া হবে।’ কিছুদিন আগেই রিজিজু সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ভারতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সরকারের পদক্ষেপ অমানবিক আখ্যা দিয়ে সরব হয়েছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। ভারত সরকারকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া থেকে বিরত রাখার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দিয়েছেন দুজন রোহিঙ্গাও। কিন্তু যাবতীয় নিন্দা, সমালোচনা উড়িয়ে পাল্টা রিজিজু বলেন, ‘ভারতই সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে। গ্রহণ করেছে। অতএব উদ্বাস্তুদের প্রতি কী করা উচিত, তা নিয়ে কেউ যেন তাকে উপদেশ না দেয়’ ভারত বিরাট গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অধিকারী বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আইনি রাস্তায় হাঁটছি, অথচ আমাদের অমানবিক বলা হচ্ছে’।  কেন্দ্র রোহিঙ্গাদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করতে সব রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানান রিজিজু। সহিংসতা থেকে অব্যাহতি পেতে মিয়ানমার ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। প্রায় ১৪ হাজার জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের নথিভুক্ত। তবে বেআইনিভাবে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ভারতে বসবাস করছে বলে দাবি করে দিল্লী।

রাখাইনের রোহিঙ্গারা নিরাপদে আছে : সু চি

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলবিজয়ী অং সান সু চি বলেছেন, ‘রাখাইনের রোহিঙ্গাদের রক্ষা করা হচ্ছে। তারা সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় রয়েছে। খবর বিবিসির। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়েব এরদোগানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় সু চি একথা বলেন। মিয়ামনারের রাখাইনে সহিংসতার মুখে পড়ে গত ১০ দিনে এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন শত শত রোহিঙ্গা মুসলমান। দাঙ্গা কবলিত রাখাইন থেকে হিন্দুরাও পালিয়ে যাচ্ছেন। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার থেকে গুলী-বোমা ছুঁড়ছে। রাখাইনের অধিকাংশ বাসিন্দাই মুসলিম। তাদের ওপর সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ার জন্য সমালোচনার মুখে পড়েছেন সু চি। সার্বিক বিষয় সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সু চি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে সন্ত্রাসীদের সাহায্য করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের গণহত্যার জন্য অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করতে হবে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপরে যে পাশবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে আজ সে সম্পর্কে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে গণহত্যায় জড়িত অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করার দাবি জানিয়েছে প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব ইন্ডিয়া (এসআইও)। গত মঙ্গলবার সংগঠনটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক ইমাম হোসেন রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘পশ্চিমাদের নৈতিকতা এবং মানবাধিকারের দাবি যে মিথ্যা, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে মিয়ানমারের হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যার বিষয়ে তাদের নীরবতার মধ্য দিয়ে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর মিয়ানমার সরকারের মদতে যে নৃশংসতা ও বর্বরতা চালানো হছে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং ওই গণহত্যায় জড়িত অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করতে হবে।’ সংগঠনটির পক্ষ থেকে আজ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিয়ানমারে হাজার হাজার নিরীহ, নিরপরাধ মুসলমানকে হত্যা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সরকারের মদতে সেদেশের রাখাইন প্রদেশে মুসলিম নিধন চললেও মানবাধিকারের ভুয়া দাবিদার পশ্চিমাবিশ্ব এ বিষয়ে নীরব রয়েছে। অন্যদিকে প্রথম থেকেই নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিও মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। তার হƒদয় শুধু জীব-জন্তু ও পশুর জন্যই কাঁদে কিন্তু মিয়ানমারের নিরপরাধ, নিরস্ত্র ও অসহায় হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যায় তার বিবেক সাড়া দেয় না।’ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর যে নৃশংস হত্যাকা- চালানো হচ্ছে তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বলে এসআইও পশ্চিমবঙ্গ শাখার রাজ্য সভাপতি ওসমান গনি বলেন। এ ব্যাপারে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর নিশ্চুপ হয়ে থাকাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ