ঢাকা, বৃহস্পতিবার 07 September 2017, ২৩ ভাদ্র ১৪২8, ১৫ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঈদের ৫ম দিনেও সিলেটে পর্যটকদের ঢল

হাতের মুঠোয় মায়াবী ঝর্না বিছনাকান্দি -সংগ্রাম

কবির আহমদ, সিলেট: গত শনিবার মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলাগুলোর ন্যায় প্রবাসী অধ্যুষিত আধ্যাত্মীক নগরী নামে খ্যাত সিলেটে ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকদের ঢল নেমেছে। গতকাল বুধবার ঈদের ৫ম দিনেও সিলেটের অভিজাত হোটেল সহ সাধারণ হোটেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হোটেল মোটেলে সংকুলান হচ্ছে না। মানুষের ভীড় যেন লেগেই আছে। তেমনিভাবে রেস্টুরেন্টগুলোতেও উপচে পড়া ভীড়। মুষলধারের বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ঈদুল আযহার ছুটিতে প্রকৃতিকন্যা জাফলংসহ সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড় শুরু হয়েছে ঈদের দিন থেকে। নারী-পুরুষ, শিশুসহ দলে দলে বিপুল সংখ্যক পর্যটক এসেছেন প্রকৃতিকন্যা সিলেটের জাফলং, মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড এবং কমলগঞ্জের বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধে। সিলেটের হোটেল মোটেলগুলোতে ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিপুল পরিমাণ ভ্রমনপিপাসু এসেছেন পর্যটন নগরী সিলেটের জাফলং, লালাখাল, বিছানাকান্দিসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। এ যেন এক পাথুরে বিছানায় বিছনাকান্দির নিবাস।
সরেজমিনে গত ৪ দিন ঘুরে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের প্রকৃতিকন্যা জাফলং, পাথরের বিছানাখ্যাত বিছনাকান্দি, স্বচ্ছ নীল পানির সমাহার, লালাখাল, পানতুমাই ঝর্ণা ও মিঠাপানির সোয়াম ফরেস্ট- রাতারগুলের মনভোলানো দৃশ্যপট দেখতেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো পর্যটক।
এছাড়া নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও রয়েছে সব বয়সী মানুষের ভীড়। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে নেচে- গেয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করছেন সিলেটে আসা পর্যটকরা।
সিলেটের বিমানবন্দর সড়ক এবং তামাবিল সড়কে সারিবদ্ধ চা বাগান, সবুজের সমারোহ, উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলা, গহীন অরণ্য আর ঝর্ণাধারায় মেতেছেন ঈদ আনন্দে। এ ছাড়া ওলিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (র.) হযরত শাহপরাণ (র.)-এর ও সিলেটের প্রথম মুসলমান হযরত বোরহান উদ্দিন (র.) মাজারকে ঘিরেও বেড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা হাজারো ভক্তদের আনাগোনা। সিলেটের লামাবাজার, শিবগঞ্জের সেনপাড়া এবং বোরহান উদ্দিন (র.) মাজার সংলগ্ন মাছিমপুরেও রয়েছে মনিপুরি পাড়ায় হাজারো পর্যটকদের আনাগোনা।
সিলেটের জাফলং, লালাখাল, খাসিয়াপুঞ্জি, রাতারগুল, লোভাছড়া, পানতুমাই, বিছনাকন্দি ছাড়াও প্রতিটি বিনোদন কেন্দ্রে গত রোববার ভীড় দেখা গেছে পর্যটকদের। এ যেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লাখো জনতার মিলনমেলা।
উঁচু পাহাড়, স্বচ্ছ পানি, ছোট-বড় পাথরের সমন্বয়ে গড়া আসাম সীমান্তবর্তী জাফলং। যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে একটু প্রশান্তির জন্য অনেকেই ছুটে আসেন সিলেটে। তবে জাফলংয়ের মামার দোকানের রাস্তা ও বিছানাকান্দি রাস্তার উপর ছোট ছোট পুকুর দেখে বিরক্ত হচ্ছেন হাজারো পর্যটক। এ যেন অভিভাবকবিহীন এ সকল রাস্তা। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ঈদের আগে অনেক বড় বড় কথা বললেও পর্যটকদের চলাফেরা রাস্তা সংস্কার করতে পারেননি।
ঈদের ছুটিতে জাফলংয়ে ভীড় করেছেন হাজারো পর্যটক। সীমান্তের ওপারে থাকা ভারতীয় পাহাড় ডাউকি থেকে অবিরাম ধারায় বহমান জলপ্রপাত, মায়াবী ঝর্ণা, ঝুলন্ত ডাউকি সেতু, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল, উঁচু পাহাড়ের গহীন অরণ্যের সুনসান নীরবতায় মুগ্ধ তারা।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা তানজিনা আক্তার তার বাবা মায়ের সাথে এসেছেন সিলেটে পর্যটক নগরীতে। গতকাল বুধবার কথা হলো তানজিনার সাথে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স অধ্যায়নরত তানজিনা এ প্রতিবেদককে জানান, প্রকৃতিকন্যা জাফলং এক কথায় অসাধারণ। পাহাড়ী ঝর্ণধারা, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি যে কারো মন ভুলাবে। আমি মুগ্ধ। আমি আবারো আসবো জাফলংয়ে।
শুধু জাফলং নয়, জাফলংয়ের পথেই যাওয়া যায় লালাখাল। যেতে হয় স্পিডবোটে। নদীর স্বচ্ছ পানিতে নৌকাভ্রমণ, আর লালাখাল পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতিই আলাদা।
এটি মূলত সোয়াম্পফরেস্ট। বর্ষায় ৮-১০ ফুটের মতো পানি থাকে, শীতে শুকিয়ে যায়।
জলারবনে হিজল, করচ, বনজাম, জংলিবট আর মুরতা নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছড়াছড়ি। জলমগ্ন গাছগুলো যেন গলাগলি করে থাকে। গাছের ডালপালা ছাপিয়ে যাওয়া লতা-গুল্ম মিলে বিশাল এক সবুজ চাঁদোয়া গড়ে তোলে। স্বচ্ছ জলে এই চাঁদোয়ার ছবি ফুটিয়ে তোলে অপরূপ এক দৃশ্য। জল আর গাছের মিতালী দেখতে এখানে এবার ঈদেও ভীড় করেছেন পর্যটকরা।
রাতারগুলের বুনোজল ঘুরে বেড়ানোর বাহন নৌকা। ডিঙি নৌকায় চরে জল আর বনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন পর্যটকরা।
রাতারগুলে ঘুরতে আসা খুলনার চৌধুরী পাড়ার মামুন হোসেনের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মামুন বলেন, এটি অনেকটা সুন্দরবনের মত। নৌকায় চড়ে ভাসমান বনের সৌন্দর্য বিমোহিত করে সবার মন। পাহাড়, পাথর আর নদীর মিতালী দেখতে সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাটের বিছনাকন্দিতেও বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা।
পানিতে ডুবু ডুবু খাচ্ছে ছোট বড় পাথর ও পানির খেলার দৃশ্যে এ অপ্সরা মুহূর্তেই মন কেড়ে নেয় যে কোনো সৌন্দর্য পিপাসুর। এ যেন এক পাথুরে বিছানায় বিছনাকান্দির নিবাস।
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা গতকাল দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ঈদুল আযহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সিলেটে পর্যটকরা এসেছেন। তাদের নিরাপত্তায় প্রায় পাঁচ শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশও রয়েছে।
আরো এক নিখোঁজ পর্যটকের লাশ উদ্ধার
গত মঙ্গলবার সিলেটের পিয়াইন নদী থেকে এক পর্যটকের লাশ উদ্ধারের পর গতকাল বুধবার অপর এক পর্যটকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গোসল করতে নেমে নিখোঁজ কলেজছাত্র ফয়সল হোসেন সৌরভের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সৌরভ চট্টগ্রামের ভাঙ্গা রেলওয়ে কলোনীর আম বাগান এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল মওলার পুত্র ও চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের একাদ্বশ শ্রেণীর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গতকাল সকালে জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয় বলে জানান গোয়াইনঘাট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হিল্লোল রায়।
এর আগে গত মঙ্গলবার কামাল শেখ নামে এক কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কামাল শেখ ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা পৌরসভার বাসিন্দা রশিদ শেখ’র পুত্র ও ময়মনসিংহ এ্যাপোলো ইনিস্টিটিউটের একাদ্বশ শ্রেণীর প্রথম বর্ষের ছাত্র।
গোয়াইনঘাট থানার পুলিশ সূত্রে জানাযায়, কামাল শেখ ও তার ১৫ জন বন্ধু মিলে গত মঙ্গলবার সকালে ময়মনসিংহ থেকে মাইক্রোবাস যোগে পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ে বেড়াতে আসে। দুপুর ১২টায় তারা পিয়াইন নদীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় গোসল করতে নামে। এসময় সাঁতার না জানায় স্রোতের টানে কামাল শেখ তলিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা পর তার লাশ উদ্ধার করে। নিহত কামাল শেখ’র সাথে আসা সহপাঠি সজল ও হৃদয় তার নাম পরিচয় নিশ্চিত করেন। এর কিছু সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রাম থেকে জাফলং ভ্রমণে আসা সৌরভ ও তার চার বন্ধু মিলে পিয়াইন নদীতে গোসল করতে নামে। এসময় স্রোতের টানে সৌরভ পানিতে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় লোকজন, প্রশাসন ও দমকল বাহিনীর সহায়তায় মঙ্গলবার কামাল শেখের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর গতকাল বুধবার সকালে জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে নিখোঁজ অপর পর্যটক কলেজ ছাত্র ফয়সল হোসেন সৌরভের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ