ঢাকা, শুক্রবার 08 September 2017, ২৪ ভাদ্র ১৪২8, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রশ্নে মোদির অবস্থান

হাজার হাজার নিরস্ত্র ও নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলিমের ওপর তথাকথিত শান্তিবাদী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন ‘পরিকল্পিত গণহত্যার’ অভিযান চালাচ্ছে এবং জাতিসংঘসহ সারা বিশ্ব যখন দেশটির গণহত্যা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছে ঠিক তেমন এক জটিল সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। তিনদিনের সফরে রাজধানী ইয়াঙ্গুনে যাওয়ার এবং মিয়ানমারের প্রধান নেত্রী অং সান সুচি ও সামরিক জান্তার নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর গত বুধবার নেপিদোর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে ‘উগ্রপন্থী সহিংসতা’ নিয়ে মিয়ানমার সরকার যে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে তার সঙ্গে তিনি সহমত পোষণ করেন। মিস্টার মোদি এমনভাবে বক্তব্য রেখেছেন, যা শুনে মনে হবে যেন কথিত মুসলিম উগ্রপন্থীরা সত্যিই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সহিংসতা চালাচ্ছে এবং এর ফলে সেনা সদস্যদের তো বটেই, সাধারণ মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়েছে! মিস্টার মোদি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, মিয়ানমারের ঐক্য ও আঞ্চলিক অখন্ডতা বজায় রাখতে সব পক্ষ একযোগে কাজ করবে এবং দেশটিতে সবার জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় থাকবে। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে চলমান সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের প্রতি ‘জোরালো সমর্থন’ জানানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেশটির প্রধান নেত্রী অং সান সুচি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, সন্ত্রাসবাদ যাতে মিয়ানমারের মাটিতে শিকড় গাড়তে না পারে সে জন্য নয়াদিল্লি ও ইয়াঙ্গুন একযোগে কাজ করতে পারে।
সন্দেহ নেই, পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ থাকলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও মিয়ানমারের নেত্রীর বক্তব্য ও আশাবাদ বাংলাদেশসহ এশিয়ার এই অঞ্চলের সকল রাষ্ট্রের মানুষকেই আশান্বিত ও উজ্জীবিত করতো। অন্যদিকে বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের মুসলিম বিরোধী অব্যাহত গণহত্যা এবং দ্রুত বেড়ে চলা ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের কারণে পরিস্থিতি অনেক আগেই অত্যন্ত উত্তপ্ত ও বিপদজনক হয়ে উঠেছে। ৮ সেপ্টেম্বরের খবরেও জানানো হয়েছে, বিগত মাত্র এক সপ্তাহেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তিন হাজার রোহিঙ্গাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেÑ যাদের মধ্যে মুসলিম পুরুষ তো বটেই, বিভিন্ন বয়সী নারীদের পাশাপাশি শিশুরাও রয়েছে। একই সময়ে ১০ হাজারের বেশি গ্রামও পুড়িয়ে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। গণহত্যা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের এ অভিযান মিয়ানমার চালাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা এত মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, বিশ্বের প্রায় সব দেশই একে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ‘নির্মূল’ করার অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জাতিসংঘও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারেনি। বলা হচ্ছে, অং সান সু চির সেনাবাহিনী আসলে রোহিঙ্গা নামের আড়ালে মিয়ানমার থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধেই গণহত্যার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশটি অজুহাতও মন্দ দেখাচ্ছে না। বিশ্বকে বোঝাতে চাচ্ছে যেন তথাকথিত উগ্রপন্থী মুসলিম জঙ্গিরা রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর ওপর ‘সন্ত্রাসী’ হামলা চালাচ্ছে এবং মহামতি বুদ্ধের ‘জীব হত্যা মহা পাপ’ তত্ত্বে বিশ্বাসী ‘শান্তিবাদী’ অনুসারীরা কেবলই বসে বসে মার খাচ্ছে! মারাও যাচ্ছে তারা শয়ে শয়ে! অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি যে সম্পূর্ণ উল্টো রকমের তথা বিপরীতমুখী এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে মুসলিমদেরই যে নির্মূল করার অভিযান চালানো হচ্ছে সে কথাটা মিয়ানমার সুকৌশলে আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সর্বশেষ এক বিবৃতিতে অং সান সু চি এমনকি একথা পর্যন্ত বলে বসেছেন যে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নাকি অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলের নৃশংসতার ছবি প্রকাশ ও প্রচার করে মিয়ানমারের ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছে! উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে সম্মত হয়নি। দেশটি বরং এই বলে প্রচারণা চালাচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা নাকি ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিক এবং অতীতের বিভিন্ন সময়ে তারা নাকি মিয়ানমারে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করেছে!
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এমন এক পরিস্থিতিতে বৃহৎ প্রতিবেশি হিসেবে ভারতের যেখানে মুসলিম বিরোধী গণহত্যা বন্ধ করার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দায়িত্ব ছিল, প্রধানমন্ত্রী মোদি সেখানে উল্টো দেশটির নীতি ও কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যার প্রতিই সমর্থন জানানো হয়েছে। লক্ষণীয় এবং খুবই কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি হলো, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আয়োজিত একই সংবাদ সম্মেলনে মিস্টার মোদি আবার সবার জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রাখার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন! আমরা একে কেবল স্ববিরোধিতাপূর্ণ নয়, বিশেষ করে শান্তি, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিরোধী বলেও মনে করি। রাখাইন রাজ্যে চলমান ‘উগ্রপন্থী সহিংসতা’ নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাকেও সমর্থন করা যায় না। কারণ, ভয়ংকর সহিংসতা চালাচ্ছে আসলে মিয়ানমারের ঘাতক সেনাবাহিনী। গণহত্যার নিষ্ঠুর অভিযানের মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে যেখানে নিজেদের জীবন বাঁচানো এবং ঘরবাড়ি ও সম্পদ রক্ষা করাই সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে তারাই ‘উগ্রপন্থী’ হয়ে উঠবে এবং সহিংসতার পথে পা বাড়াবে- এমন কথা আজকের বাস্তবতায় কাউকেই বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে ভারতীয় প্রধনমন্ত্রী মোদি তেমন হাস্যকর চেষ্টাই করেছেন।
এটা খুবই দুঃখজনক। মিয়ানমারের রাখাইনে শুধু মুসলমানরাই নয়, হিন্দুরাও নির্যাতিত হয়েছে। তাদেরকেও ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে হচ্ছে। আমরাসহ দুনিয়ার শান্তিবাদী সবাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায়ের পক্ষে মজলুমের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকাই আশা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ