ঢাকা, শনিবার 9 September 2017, ২৫ ভাদ্র ১৪২8, ১৭ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিপাকে মধ্য আয়ের মানুষ

 

সংগ্রাম রিপোর্ট : কোন অজুহাত ছাড়াই হু হু করে বাড়ছে চালের বাজার। সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও বাজারে তার কোন প্রভাব নেই। ভিয়েতনাম, ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও নতুন করে যুক্ত হওয়া কম্বোডিয়া থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করলেও ইতিবাচক প্রভাব নেই বাজারে। চিকন চালের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটা চালের দামও। এতে করে বিপাকে পড়েছে মধ্য আয়ের মানুষ। কিন্তু এত কিছুর পরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে চালের এই সিন্ডিকেট।

দেশে মানুষ রোহিঙ্গা আর চামড়া নিয়ে যখন ব্যস্ত তখন চাল সিন্ডিকেট ব্যস্ত দাম বাড়াতে। মোটা ও চিকন চালে মানভেদে এক সপ্তাহে বেড়েছে কেজি প্রতি ২-৩ টাকা। পাইকারি প্রতি বস্তায়(৫০ কেজি) বেড়েছে ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত। তবে ঈদের আগে খুচরা বাজারে এই দাম বৃদ্ধির প্রভাব না পড়লেও এখন পড়ছে।

তথ্য মতে, ১ মাস আগেও পাইকারি বাজারে মোটা চালের দাম (স্বর্ণা/গুটি) কেজিতে ৪০-৪১ টাকা থেকে কমে ৩৯ টাকায় নেমে আসে। ঈদের আগে আগে তা আবার বেড়ে ৪১-৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটাশ চালের পাইকারি দাম ছিল ৪৬ টাকা কেজি। সেটি এখন বস্তায় (৫০ কেজি) কেউ ৫০, কেউ বা ১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি করছে। অর্থাৎ কেজিতে দাম পড়ছে ৪৭-৪৮ টাকা। আটাশের মধ্যে ভালো মানের চাল পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়, যা আগে ছিল ৪৯-৫০ টাকা। একইভাবে মানভেদে নাজিরশাইল পাইকারিতেই সর্বনিম্ন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। আবার ভালো মানের নাজির বিক্রি হচ্ছে ৬৬ টাকায়।

মিনিকেট চালও পাইকারি বাজারে সর্বনিম্ন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজিতে। আর ভালো মানেরটার দাম ৫৮ টাকা। প্রতি কেজিতে দুই টাকা করে দাম বেড়েছে। এখন চালের দাম বৃদ্ধির কোন কারণ দেখাতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। তাদের খোড়া অজুহাত হলো চালের আমদানি কম। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ার কারনেই দাম বেড়েছে।

বাবু বাজারের চাল ব্যবসায়ী চাঁদপুর রাইস এজেন্সির বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম মনি বলেন, ঈদের আগেই পাইকারি বাজারে চালের দাম বেড়েছে। এসময় চাহিদা কম থাকায় বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। তিনি বলেন, দেশে এখন ধান-চালের সংকট রয়েছে। তাই দাম বাড়তি। কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী সামনে চালের দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানান।

তথ্য মতে, পাইকারি বাজারে যে দামে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হয় তার থেকে চার-ছয় টাকা বেশি দাম রাখে খুচরা বিক্রেতারা। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৪৬ টাকায়। আটাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২-৫৫ টাকায়, মিনিকেট ৫৮-৬২ ও নাজির ৬৫-৬৮ টাকায়।

বাজারের এই চিত্র সহজেই বলে দিচ্ছে শুল্কমুক্ত চাল আমদানির সুযোগ হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা চালের বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। সরেজমিনে চালের বাজার ঘুরে আড়ৎদার ও মিল মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে দামের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

চালের দাম বাড়ার জন্য সম্পূর্ণ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চালের বাজারের দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ না খুঁজে তারা সরকারকে ভুল বার্তা দিয়েছে। আর বর্তমানে যে পরিমাণ আমদানির হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে, আসলে সেই পরিমাণ চাল আমদানি হচ্চে না। আর এ কারণে চাহিদা আর যোগানের সাথে তার মিল নেই। বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরকার বলছে, দেশের চালের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ কোটি মেট্রিক টন। দেশের উৎপাদন হয়ে থাকে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন চাল। সে হিসেবে চালের ঘাটতি থাকার কথা ১০ লাখ মেট্রিক টন। আর বন্যার কারনে ফসল নষ্ট হয়েছে ৭ লাখ টন। এর আগে সরকার বলেছিল বাংরাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ইতিমধ্যে চাল রফতানিও করেছে বাংলাদেশ। তাহলে এত চাল গেলো কোথায়। ইতোমধ্যে সরকারী এবং বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। তাহলে কোন কারণে চালের সরবরাহ কম থাকবো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের সিন্ডিকেটের কাছে সরকার জিম্মি। সরকার কোনভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আর এ কারণেই চালের বাজার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এত দিন চাল ব্যবসায়ীরা বলে আসছে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার হলেই চালের দাম কমবে। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার পরেও কেন চালের দাম বাড়লো তার কোন উত্তর নেই ব্যবসায়ীদের কাছে।

বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মাহমুদ হাসান রাজু বলেন, দাম বৃদ্ধির জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। দেশে যখন প্রচুর পরিমাণে হাইব্রিড ধান উৎপাদন হয়েছে, তখন তারা বলছেন, মানুষের রুচি পরিবর্তন হয়েছে। এই ধান আর উৎপাদন দরকার নাই। এখন থেকে চিকন চালের ধান উৎপাদন বাড়াতে হবে। এরপর কৃষকরা প্রতি একরে ৮০ থেকে ১০০ মন উৎপাদন হওয়া হাইব্রিড ধান চাষ থেকে সরে এসেছে। কিন্তু চিকুন চালের ধান প্রতি একরে উৎপাদন হয় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ মণ। এ কারণে এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কারণ শহরের তুলনায় গ্রাম পর্যায়ে মোটা চালের ব্যাপক চাহিদার খবর কর্মকর্তারা রাখেন না।

খাদ্য কর্মকর্তারা সরকারকে খাদ্যের সঠিক ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ভুল বার্তা দেয়ায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া দেশ এখন ঘাটতিতে পড়েছে-যোগ করেন তিনি।

চালের আড়ৎদাররা বলছে, সরকারি উদ্যোগে চাল কল স্থাপন করলে সিন্ডিকেট থাকবে না। কেজি প্রতি ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত একটা মুনাফা করে থাকে। সেটা দাম বাড়লেও হবে, কমলেও হবে। কিন্তু চাল নিয়ে আসলে কোথায় চালবাজি হচ্ছে তা খুঁজে বরে করতে হবে সরকারকে। ভেতরের সমস্যা বের না করে যতই আমদানি করুক খুব বেশি কাজে আসবে না। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে চালের পাইকারি ও মিল পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার দাবিও জানান তারা।

এবার বোরো মওসুমে আগাম বন্যায় সরকারি হিসাবেই হাওরে ছয় লাখ টনের মতো ধান নষ্ট হওয়ায় এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে (১০ টাকা কেজি দরের চাল) সাড়ে সাত লাখ টন চাল বিতরণ করায় সরকারি মজুদ তলানিতে নেমে আসে।

সংকট দেখা দেয়ায় চালের দামের লাগাম টেনে ধরতে ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক থেকে ১৮ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিনা জামানতে ও বাকিতে চাল কেনার সুযোগ দেয় সরকার। এতেও বাজার নিয়ন্ত্রন না হলে পরে এই ১০ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়্ এখন চাল আমদানিতে কোন শুল্ক নেই। তার পরেও চালের দাম হু হু করে বাড়ছে।

আমদানির পরও চালের দাম কমছে না কেন জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের হাজি ইসমাইল এন্ড সন্সের মাঈন উদ্দিন বলেন, এই প্রশ্নের জবাব ব্যবসয়ীরাও খোঁজে। আমদানি হচ্ছে সবাই জানে। কিন্তু যে পরিমাণ আমদানি হওয়ার কথা, সত্যিকারে তা আসছে কি-না খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ উল্লেখযোগ্য হারে চাল আমদানি হচ্ছে। এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।

আমদানির চুক্তি বেশি কাজে আসবেনা উল্লেখ করে ঠাকুরগাঁয়ের ন্যাশনাল রাইস মিলের মালিক মাহমুদ হাসান রাজু বলেন, সরকার শুল্ক কমিয়েছে। কিন্তু রপ্তানিকারক দেশগুলো দাম বাড়িয়েছে। ফলে আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হয়। যে কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে দেশের বাজারে দাম কমছে না।

অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিকরা চালের দাম বাড়ানোর ইচ্ছা করলেই চাল বিক্রি বন্ধ করে তা মজুদ রাখেন। এতে করে বাজার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সরবরাহ কমে যায়। ফলে কোন কারন ছাড়াই চাল দাম বাড়িয়ে থাকেন পাইকারি আড়তদাররা। আর এর প্রভাব পড়তে থাকে খুচরা বাজারে।

এদিকে চালের দাম বাড়ার জন্য খুচরা, পাইকারি ও মিলাররা একে অপরকে দায়ী করছেন। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ার কারণে তারাও বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। আবার পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল মালিকরা চালের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন, একই সঙ্গে দামও বাড়িয়েছেন। ফলে তাদের কাছ থেকে বেশি দামে চাল কেনার কারণে বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

মূলত চালের বাজার নিয়ন্ত্রন করে মাত্র ৮/১০ মিল মালিক। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অটো মিল মালিক এসোসিয়েশনের নেতারা বললেও অদৃশ্য কারণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো নিরাপরাধ ১০ হাজার মিল মালিককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ তারা জানেনা কোন অপরাধে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। 

সরকার বলছে আরও চাল আমদানি করা হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন,পরিকল্পনা না করে যতই চাল আমদানি করুক না কেন চালের দাম কমবে না। আসলে কি পরিমান চালের সংকট রয়েছে। আর কি পরিমান চাল আমদানি করা হয়েছে তা আগে জানতে হবে। আসলেই ব্যবসায়ীরা সে পরিমান চাল আমদানি করেছে কি না। না কি আমদানির নাকে শুভাঙ্করের ফাকি দিচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ