ঢাকা, মঙ্গলবার 12 September 2017, ২৮ ভাদ্র ১৪২8, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মোদির অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে কলকাতাভিত্তিক বিজেপি নেতাদের দায় এড়ানো

১১ সেপ্টেম্বর, ইন্টারনেট : মিয়ানমার সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে যে অপ্রত্যাশিত মন্তব্য করেছেন তার পক্ষে বেশ কিছু জটিল যুক্তি তুলে ধরছেন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কট্টরপন্থী নেতারা। কলকাতা-ভিত্তিক বিজেপি নেতারা এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে কোনও পক্ষে অবস্থান না নিয়ে মোদি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে সমর্থন করেছেন তারা।

ভারত-মিয়ানমার সম্পর্কে মন্তব্য না করার ইচ্ছা প্রকাশ করে এক বিজেপি নেতা জানান ‘চরমপন্থী সহিংসতার সমাপ্তি ও মিয়ানমারের অখ-তা রক্ষার কথা বলে মোদি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারতের অগ্রাধিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে দ্রুত তার সমাধান করা।’ বিজেপি সূত্র আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, অবশ্যই গত কয়েক বছরে রাখাইন প্রদেশের অস্থিতিশীলতা কারণে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়ে উদ্বাস্তু হওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে মিয়ানমার সরকারকে।

বিজেপির মুখপাত্র কৃষাণ মিত্র বলেন, ‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরন রিজিজু’র সাম্প্রতিক বিবৃতিতে আমাদের দেশে অবৈধভাবে বসবাসরত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যর্পণে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মাতৃভূমি ছাড়া তাদের আর কোথায় পাঠানো যায়, আর এই মাতৃভূমি মিয়ানমারই হওয়ার কথা।’

মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর জাতিগত নিধন অথবা কয়েক হাজার নির্দোষ মানুষ যে বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছে তাতে এ অঞ্চলে কেমন প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি বিজেপির রাজ্যসভা এমপি স্বপন দাসগুপ্ত। তিনি এই ইস্যুতে দিল্লির সরকারি অবস্থানের ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক ঘটনা ও কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি রোহিঙ্গা ‘স্বাধীনতাকামীদের’ সঙ্গে মুজাহিদীন এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ইসলামি চরমপন্থীদের মধ্যে যোগসূত্রের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, কোনও সরকারের পক্ষেই নিরাপত্তা ইস্যুতে রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের বিষয়টি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই তা যে কোনও স্থানের উদ্বাস্তু সম্প্রদায় হলেও। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয় বলে তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন একটি নিবন্ধে। বিজেপি সদর দফতরে সম্ভাব্য রোহিঙ্গা হুমকি নিয়ে তথ্য উপস্থাপনকারী কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে যে, কয়েক বছর আগে বিহারে বৌদ্ধদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনায় চালানো সশস্ত্র হামলার ঘটনায় রোহিঙ্গারা জড়িত আছে।

মুরালিধর লেনের বিজেপি সদর দফতরের সাধারণ অবস্থান হচ্ছে, উদ্বাস্তু হওয়া রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক আশ্রয় না দেওয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিজিজু’র অবস্থান ঘোষণার পর মোদির মিয়ানমার সফরে ভারতের অবস্থান পুনরায় তুলে ধরার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বিজেপির এক দফতর কর্মীর মতে, এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল চলমান বাণিজ্যিক ও অন্যান্য সম্পর্ক বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করা।  যদিও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় কীভাবে তারা মোকাবিলা করবে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে উপদেশ দেওয়া সফররত প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে আশা করা যায় না।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিজিজু ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে সব রোহিঙ্গা ভারতে চলে এসেছে তাদের জোর করে পুশব্যাক অথবা বহিষ্কার করা হবে না। তাদের প্রত্যর্পণের জন্য আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। কিন্তু এ জন্য সময় লাগবে।

জম্মু-কাশ্মির, হারিয়ানা, নয়া দিল্লি, অন্ধ্র প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারি রোহিঙ্গাদের জন্য এই ঘোষণা দুঃসংবাদ। অনেকেই এসব রাজ্যে বা পাশের রাজ্যে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। বেশিরভাগই অস্থায়ী শিবিরে বাস করছে এবং স্থানীয় এনজিও সংস্থাগুলো তাদের সহযোগিতা করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) সত্যিকার শরণার্থীর সংখ্যা ১৪ হাজার বলে জানিয়েছে। অবশ্য ভারত শরণার্থী ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। ফলে ইউএনএইচসিআর-এর পরামর্শ পালনে বাধ্য নয় ভারত।

দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরও ভারতে বাসকারী রোহিঙ্গা পরিবারগুলো স্বীকার করছে, এই পরিস্থিতি তাদের জন্য ভালো। ভারতে আসা রোহিঙ্গাদের সাধারণ অবস্থান হচ্ছে, এখানে কেউ আমাদের হত্যা করতে চেষ্টা করে না কিংবা আমাদের বাড়িঘরে আগুন দেয় না কিংবা সম্পত্তি লুট করে না, নারী ও শিশুদের আক্রমণ করে না, একেবারে স্বর্গের মতো! চলমান এই সংকটে ভারতের কোনও মানবিক দায় রয়েছে কিনা এ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজি হননি কোনও বিজেপি নেতা। নির্দিষ্ট সংখ্যক শরণার্থী গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে শরণার্থীদের ঢল শুরু হবে এবং আরও কয়েক লাখ চলে আসতে পারে। বিজেপির এক বোদ্ধার মতে, যেসব অবৈধ অভিবাসীকে আমরা ফেরত পাঠানো চেষ্টা করছি তারা আমাদের অজান্তেই অন্যদের আকর্ষণ করা শুরু করতে পারে। সর্বোপরি এইসব মানুষের দায়িত্ব মিয়ানমারের। এমনকি যেখানে বাংলাদেশ খুব বেশি মানুষ গ্রহণ করতে পারে না, সেখানেও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। ভারত কেন এই বোঝা বহন করতে যাবে? ইসলামিক দেশগুলোর সংস্থার কী অবস্থা? এভাবেই প্রশ্ন রাখলেন বিজেপে নেতা।

প্রতিমন্ত্রী রিজিজুর মন্তব্যের বিপরীতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, রাজ্যের জেলে প্রায় বিশ জনের মতো রোহিঙ্গা আছে। মানবিক বিবেচনাতেও তাদের প্রত্যর্পণ করা হবে না। যাই হোক, পর্যবেক্ষকরা এটিকে একটি প্রতীকী অবস্থান বলে মনে করছেন যে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় সেখানে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেশ কম। তবে নিজ রাজ্যের উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্ত করা ও অর্থনীতিতে আঘাত হানা গোর্খাল্যাণ্ডের উত্তেজনা থামাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমর্থন প্রয়োজন হবে মমতার। সে যাই হোক, বাংলাদেশে প্রতিদিন বিশাল সংখ্যার রোহিঙ্গার প্রবেশের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিরবতা নিয়ে মুক্তমনাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় কলকাতার বাংলা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে। চলমান সংখ্যালঘু দমন ও বাংলাদেশ সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বসানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষর নিন্দা করা হচ্ছে সেখানে। তবে জাতীয়ভাবে প্রচারিত ও দেশের শক্তিশালী ইংরেজি গণমাধ্যমগুলোতে মোদির নিরব থাকার ব্যাপারে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কংগ্রেসের আমজাদ আলী বলেন, ‘মোদির সফরকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষরা ভাবছেন যে, রোহিঙ্গাদের প্রতি ভালো আচরণ করার জন্য বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মিয়ানমারের ওপর নৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করাতে পারে ভারত। দেশ থেকে বিতাড়িত কয়েক লাখ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে নাইপিদোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের তিক্ততা লাঘব করতে এটা বাংলাদেশকে সাহায্য করতো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন যে, বাংলাদেশ কিছু মানুষকে সাহায্য করছে শুধুমাত্র মানবিক কারণে।কিন্তু এটি মিয়ানমারের দায়িত্ব যা বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ