ঢাকা, মঙ্গলবার 12 September 2017, ২৮ ভাদ্র ১৪২8, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমারে মুসলিম গণহত্যা

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম : “কেউই আপনাকে অবমাননা করতে পারবে না কিন্তু আপনি ছাড়া” সাংবাদিক অ্যালান ক্লমেন্টেসের সাথে গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় সাক্ষাৎকারে এমনই কথা বলেছিলেন-বার্মার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের নেত্রী নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চি। বর্তমানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের বর্বর, অমানবিক, নিষ্ঠুর, জঘন্য, হিংসাত্মক ও লোমহর্ষক নির্যাতনের ঘটনায় আজকে বলতে হয় অং সান সু চি ক্ষমতায় থেকে নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করে যেন নিজেকেই অবমাননা করছেন?

মিয়ানমারের গণহত্যা এখন ‘টক অব দ্যা ওয়ার্ল্ড।’ মানবতাবিরোধী এমন কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিবেক আজ স্তব্ধ ও হতবাক এটি যুদ্ধাপরাধের শামিল। এ আপরাধে অং সান সু চি সরকারের বিচারের দাবি উঠছে সারা বিশ্বে। মনে করা হয় একদিন হয়তো এ গণহত্যার দায়ে অং সাং সু চিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

আবারো রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলীবর্ষণে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে। হতাহতের সংখ্যা হাজার-হাজার। বসতবাটি সহায়সম্বল হারিয়ে প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সীমান্তগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে। কিন্তু এখানেও যেন ঠাঁই নেই। কারণ ওরা মুসলমান। রাখাইন রাজ্যে গ্রামের পর গ্রামে আগুন জ্বলছে। গহীন অরণ্যে ঢুকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান খুঁজছে মুসলমানরা। অবিরাম গুলীবর্ষণ করে যে নারকীয় পরিবেশ তৈরি করেছে তা বর্ণনাতীত। গুলীবিদ্ধ গুরুতর আহত রোহিঙ্গা যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে সক্ষম হয়েছে তাদের অনেকেই হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে এবং কারো কারো মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার এলাকায় রোহিঙ্গা পুরুষ-নারী-শিশুরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নাফ নদীর বিস্তৃত এলাকা জুড়ে তীরে বসে ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তায় প্রহর গুণছে। এই দৃশ্য অমানবিক, বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক।

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত শুক্রবার ভোররাতে রাখাইনের কিছু পুলিশ চৌকিতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) নামে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালানোর পর থেকে এ পর্যন্ত একশ’র কাছাকাছি মানুষ নিহত হয়েছে।

শুক্রবারের ঘটনার পর মংডু, বুতিডং এবং রাতেডং জেলাকে ঘিরে ফেলে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এসব এলাকায় প্রায় আট লাখ মানুষ বসবাস করে। সেনাবাহিনী সেখানে সন্ধ্যা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছে।

আল জাজিরা জানায়, রোহিঙ্গা অধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলেছেন, গত কয়েক দিনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাদের দাবি, অন্তত আটশ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েক ডজন নারী ও শিশুও রয়েছে।

ইউরোপ নিবাসী রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্ট ও ব্লগার রো নে সান লুইন বলেন, সাম্প্রতিক হামলার সময় পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে তাদের বাড়িঘর থেকে ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বহু মসজিদ ও মাদরাসা পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান কোনো খাদ্য ও আশ্রয় ছাড়া ঘটনাস্থলে আটকা পড়ে আছে।

অভিযোগ উঠেছে, এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী আক্রমণাত্মক হয়ে রোহিঙ্গাদের ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং তাদের হত্যা ও ধর্ষণে মেতে ওঠে। তারা ৮৭ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করে।

রোববার আল জাজিরাকে ফোর্টিফাই রাইটস নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ স্মিথ বলেন, সব রোহিঙ্গাকে যোদ্ধা মনে করছে, এর ফলে সহিংসতা তীব্রতর হতে পারে যার জন্য সরকারই দায়ী থাকবে। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের ১১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে, যাদের বেশিরভাগই দারিদ্র্যের শিকার এবং প্রচন্ড বৈষম্যের শিকার। রোহিঙ্গারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে রাখাইনে বসবাস করে আসলেও এই সংখ্যালঘু জাতিকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী গণ্য করা হয়।

মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে রেখেছে। জাতিসংঘ মনে করে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর যে দমনাভিযান চালায় তা জাতিগত নিধনের শামিল। তবে অং সান সু চি সরকার এ অভিযোগ ক্রমাগত নাকচ করে আসছে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত বৃহস্পতিবার তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত রাখাইনের জন্য দীর্ঘমেয়াাদি সমাধান সম্পর্কে মিয়ানমার সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়। এদিকে, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং দাবি করেন, কমিশনের রিপোর্টে কিছু তথ্যগত ত্রুটি রয়েছে।

কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্টে মিয়ানমারের ১৯৮২ এর নাগরিকত্ব আইনের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করা হয়েছে মূলত আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। এছাড়াও রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, এই নাগরিকত্ব আইনের সাথে মিয়ানমার স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির অধীনে অ-বৈষম্যের নীতিগুলো সাংঘর্ষিক। এমনকি তা ২০০৮ সালের সংবিধানসহ সাম্প্রতিক অনুমোদিত কয়েকটি আভ্যন্তরীণ আইনের সাথেও সাংঘর্ষিক। এদিকে বিবিসির বিখ্যাত উপস্থাপক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিম সাংবাদিক মিশাল হুসেনের নিকট দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি তার চরিত্রের অপর দিকটি উন্মোচন করেন। মুসলমানদের উপর এ অমানবিক নির্যাতন সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলে একপর্যায়ে সু চি মেজাজ হারান এবং তাকে বিড়বিড় করে ক্রোধের সাথে বলতে শোনা যায়, ‘একজন মুসলিম যে আমার সাক্ষাৎকার নেবে এটাও আমাকে কেউ বলেনি।’ মুসলিম নিধনে এমন বক্তব্যে সু চির আসল চরিত্রের খোলস উম্মোচিত হয়েছে।

এ গণহত্যা যেন আইয়্যামে জাহেলিয়াতকেও হার মানায় মুসলিম নর-নারী আর শিশু-কিশোরদের আর্তনাদে আল্লাহর আরশ কাঁপছে কিন্তু ইয়াজিদের মতো মন গলছে না এ সমাজের নব্য ফেরাউন আর নমরুদদের উত্তরসূরিদের। কারণ একটাই নির্যাতিত, বঞ্চিত আর অবহেলিত ওরা তো মানুষ নয়, ওরা মুসলমান এটিই তাদের অপরাধ এ অবস্থায় জাতিসংঘ বিশ্বমানবাধিকার সংস্থা আর বিশ্ব মোড়লদের বক্তৃতা-বিবৃতি দয়া ছাড়া যেন আর কিছুই করার নেই। মুসলিম ধর্মপরিচয়ে এই নির্যাতনই একমাত্র কারণ অন্য কিছু নয়। তা যতোভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন!

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন ও নির্বিচারে হত্যার বিপরীতে সু চির সরকার কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় তার নোবেল পুরস্কার বাতিলের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে চেঞ্জ ওআরজি নামের ইন্দোনেশীয় ভিত্তিক একটি সংগঠন। ইতোমধ্যে লক্ষাধিক মানুষের স্বাক্ষরে এ ধরনরে আবেদন নোবেল কমিটির কাছে পৌঁছানো হয়েছে। বর্তমান সু চির সরকার ক্ষমতায় আসার আগে দশকের পর দশক সে দেশের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কর্মীরা রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালায় ।

আজ রোহিঙ্গাদের জন্য যেন কোনো আইনকানুন নেই। আইন যেন আজ নীরবে নিভৃতে কাঁদে। কারণ মুসলমানদের জন্য আইন নয় আইন এখানে অকেজো, বিবেক এখানে ভোঁতা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব দৃশ্য আর মানুষের বোবা কান্না যেন মানব সভ্যতাকে ভাবিয়ে তুলছে প্রতিটি রোহিঙ্গা মুসলমানের কান্নার আওয়াজ আমাদের আধুনিক সভ্যতার গালে এক-একটি চপেটাঘাত করে বলছে, হে আধুনিক পৃথিবীর মানব সমাজ তুমি মুসলমানদের জন্য বড়ই অমানবিক। হে সভ্যতা তুমি এখনও মুসলমানদের জন্য অনেক বর্বর। অথচ এই পৃথিবীতে মানবিকতা, ইনসাফ আর মজলুমের অধিকার আমরাই নিশ্চিত করেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, আরাকানের নির্যাতিত, নিপীড়িত আর বঞ্চিত মুসলমানদের জন্য বিশ্বের ঘুমন্ত বিবেক জাগবে কবে?

মূলত খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকে ১৭৮৪ অব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আরাকান ছিল মুসলমানদের গড়া এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখানে মগ এবং মুসলমানের মধ্যে অতীত ইতিহাসে সস্প্রীতির কোনো অভাব ছিল না। ম্রোহং (রোহাং) শহর ছিল আরাকানের রাজধানী। মহানবী (সা)-এর জীবিতকালেই আরবদের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। খ্রীস্টীয় সপ্তম শতকে আরব বণিকদের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরবীয় দ্বীপগুলোতে মুসলমানরা আলাদা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ রাজ্যের শাসকের উপাধি ছিল ‘সুলতান’। আরাকান মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের আদলে গড়ে ওঠা প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত একটি শহর। কিন্তু আজ নিজ মাটিতেই মুসলমানরা পরাধীন।    

কথিত আছে, এ বংশের রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০) মুসলমানদের কয়েকটি বাণিজ্য বহর র্রাীব দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে এসে ভিড়লে রাজা তাদের উন্নততর আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করান। আরবীয় মুসলমানরা স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আরবীয় মুসলমানরা ভাসতে ভাসতে কূলে ভিড়লে পর রহম, রহম ধ্বনি তুলে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে। বলাবাহুল্য রহম একটি আরবি শব্দ যার অর্থ দয়া করা। কিন্তু জনগণ মনে করে, এরা রহম জাতীয় লোক। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে থাকেন। এভাবইে আরাকানের গোড়াপত্তন।

বার্মার সঙ্গে আরাকানিদের সম্পর্ক সদাসর্বদা আরাকানিদের সর্বনাশ সাধন করেছে। বর্মীদের কাছে আরাকানিরা নিগৃহিত হয়েছে, লাঞ্ছিত হয়েছে এবং স্বাধীনতার চেতনায় গর্বিত আরাকানিরা হারিয়েছে তাদের প্রিয় স্বাধীনতা। পক্ষান্তরে বাংলা-আরাকান সম্পর্ক আরাকানিদের জন্য এনে দিয়েছে স্বাধীনতা ও জাতিগত মর্যাদা। ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে বর্তমান আরাকান উপকূলে অবস্থিত রামব্রী দ্বীপের অধিবাসী ‘থামাদা’ নামে জনৈক ব্যক্তি আরাকানের রাজধানী ‘ম্রোহং’য়ের ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করলে সুদীর্ঘকালের গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত স্বাধীন আরাকানের রাজনৈতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়ে।

আরাকানি জাতি কয়েক শতাব্দী ধরে জ্ঞান-গরিমার উচ্চশিখরে আরোহণকারী মুসলিম সমাজের ঘনিষ্ঠ সংশ্রবে ছিল। এ সময় বর্মীরা ছিল বিচ্ছিন্ন ও পশ্চাতপদ একটি জাতি। ভোদাপায়া আরাকান দখল করে এ স্বাধীন অবস্থার বিলুপ্তি ঘটান। অথচ ঘা-থানডির সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ছিল, ভোদাপায়া আরাকানের স্বাধীন অবস্থা অক্ষুন্ন রাখবেন আর বিনিময়ে আরাকান বার্মার রাজাকে বার্ষিক কর প্রদান করবে যেমনটি করেছিল ১৪৩০ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশের গৌড়ের সুলতান জালালউদ্দিন শাহ। যা হোক, ভোদাপায়া ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে বার্মাকে একটি প্রাদেশিক রাজ্যে পরিণত করলেন এবং ঘা-থানডিকে নিয়োজিত করলেন প্রাদেশিক গভর্ণর হিসেবে।

১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ব্রহ্মরাজ বোধ পায়া স্বাধীন আরাকান রাজ্য দখল করে নেয়। বর্মী সৈন্যরা আরাকানের গ্রাম গ্রামান্তরে মানুষজনকে একত্রিত করে যথাসম্ভব হত্যা করে। বর্মী সৈন্যদের অত্যাচার নির্যাতন সম্পর্কে তৎকালীন আরাকানী সর্দার অ্যাপোল এর জবানীতে জানা যায়, বর্মী সেনারা নির্বিচারে ২ লাখ আরাকানীকে হত্যা করে এবং সমসংখ্যক দাস হিসেবে বার্মায় প্রেরণ করে।

স্যার হেয়াল্টার হেমিল্টনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি ১৮০২ খ্রীষ্টাব্দে রামুর শরণার্থী শিবিরে প্রায় লক্ষাধিক আরাকানী শরণার্থীর অবস্থান দেখেছিলেন।

সংশ্লিষ্ট মহল উল্লেখিত ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে বলেন এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে মূলত আরাকান অঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে বর্মীদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একই রাষ্ট্রের নাগরিক হলেও রোহিঙ্গা ও বর্মীদের মাঝে ২শ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে শুরু হওয়া দ্বন্দ¦ সংঘাতের ধারাবাহিকতা আজকে পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সুতরাং এ কথা আজ বুঝতে বাকি নেই আরাকানের মুসলমানদেরও আজকের এ দূর্দশার মূল কারণ তারা মুসলমান। আরাকানের মুসলমানদের নির্যাতনের চিত্র প্রায় শত বছরের। অথচ আজ পৃথিবীতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সবার ধর্মীয় অধিকার আর স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য বহুবিধ আইন হয়েছে। শুধু নেই মুসলমানদের জন্য

শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বাস করে আসা জনগোষ্ঠী আজ রাষ্ট্রহীন এক জনগোষ্ঠী। বছররে পর বছর ধরে থেকে থেকে এদের ওপর নিধনযজ্ঞ চলে। রাষ্ট্রহীন হওয়ায় এরা রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত। বিশ্ববাসীর সামনেই ঘটছে এসব। বিশ্বসমাজ ও জাতিসংঘ যেন পালন করছে নীরব ভূমিকা। শুধু বিবৃতি দিয়েই যেন এরা দায়িত্ব সারছে। এই রোহিঙ্গাদের জাতিসংঘ আখ্যায়িত করেছে ‘দ্য মোস্ট পারসিকিউটেড পপিল অন দ্য আর্থ- পৃথিবীর সবচেয়ে যন্ত্রণাকষ্টি জনগোষ্ঠী, অভিধায়। ১৪৩০ সালে বাংলার মুসলিম সুলতান ৬০ হাজার সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে যদি দু’টি অভিযান চালিয়ে পালিয়ে যাওয়া বৌদ্ধ রাজা -কে আরাকানের সিংহাসনে পুনর্বহাল না করতেন, তবে আরাকানের ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতে পারত।

আরাকানিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম : ১৭৮৪ খ্রীষ্টাব্দে বার্মার রাজা ভোদাপায়া আরাকান আক্রমণ করে দখল করে নিলে কয়েক হাজার আরাকানি পালিয়ে সীমান্তবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। আরাকান অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিত বর্মী বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে শুরু করে। বিদ্রোহী আরাকানিদের আশ্রয়স্থল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনাধীন থাকায় বার্মার রাজা এদের মূল নেতাদের ধরিয়ে দেয়ার জন্যে কোম্পানি সরকাররে ওপর চাপ দিতে থাকে। নয়তো কোম্পানির এলাকা বর্মী বাহিনী আক্রমণ করবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়। একপর্যায়ে ধূর্ত ব্রিটিশ ছল-চাতুরীর সাহায্যে তিনজন বিদ্রোহী বন্দির চোখ উপড়ে ফেল এবং জ্বলন্ত আগুনে জীবন্ত নিক্ষেপ করে মেরে ফেলেছে। ব্রিটিশদের এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ নিষ্ঠুর আচরণকে গোটা ভারত বর্বরতা বলে অভিহিত করে। এত অত্যধিক সংখ্যক আরাকানি পালিয়ে আসে যে, এ অঞ্চলে এক মানবিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। শুধু দৈনিক শিশুর মৃত্যুর হার বিশজন বলে এক রিপোর্টে উল্লেখ আছে। নাফ নদী আরাকানিদের মৃত দেহে ভরে ওঠে। ১৬৮৪ খ্রীষ্টাব্দে আরাকানের বৌদ্ধদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিতে থাকে। সুদীর্ঘকাল ধরে পাশবিক বর্বরতায় অভ্যস্ত জলদস্যুরা আরাকান পৌঁছলে আরাকান নানা ধরনের অপকর্মে ভরে ওঠে। বর্বরতা ও পাশবিকতায় আরাকানের পরিবেশ নষ্ট হয়ে পড়ে।

ঐতিহাসিক সিহাবুদ্দিন তালিশ মগ দস্যুদের দস্যুবৃত্তির স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন। মগ দস্যুরা জলপথে নদীর মোহনা থেকে বঙ্গদেশের গভীর অভ্যন্তরে প্রবশে করে জনপদগুলোতে অতর্কিত হামলা করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। স্ত্রী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ ধনী দরিদ্র যাকেই পেত অমানুষিক অত্যাচারের পর বন্দি করে নিত। বন্দিদের হাতের তালু জ্বলন্ত লৌহ শলাকা দিয়ে ছিদ্র করে ছিদ্রপথে সরু বেত চালিয়ে বেঁধে টানতে টানতে জাহাজের নিতলে নিক্ষেপ করে বস্তার মতো স্তুপ করে রাখতো। সকাল-সন্ধ্যা জাহাজের উপর থেকে ছিদ্রপথে খাদ্যস্বরূপ আস্ত চাল নিক্ষেপ করত। এত পাশবিক অত্যাচারের পরও যারা বেঁচে যেত, তাদেরই তারা আরাকানে নিয়ে যেত। আরাকান রাজ এদের পতিত জমি আবাদ করে কৃষি কাজে নিয়োগ করত।

আরাকানের নৃশংসতম গণহত্যা : ১৯৪২ সালের জুন মাসে আরাকানের মগ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করে প্রভৃতি এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বেপরোয়া গণহত্যার সূচনা করে। নারী-শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে হত্যা, লুটতরাজ ও গ্রামের পর গ্রাম বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েও উন্মত্ত মগ হামলাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি, বহু মানুষের মস্তক বর্শার মাথায় বিঁধে তান্ডব নৃত্য করেছিল। আকিয়াবের মরহুম খলিলুর রহমান বিএ বিএল তার কারবালা-ই-আরাকান গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ১৯৪২ সালের গণহত্যায় সর্ম্পূণ উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ৩৭৬টি গ্রামের বর্ণনা দিয়ে বার্মার পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। উন্মত্ত মগ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য দূর্গম আপক গিরিপথে যাওয়ার সময় হাজার হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেন।

আরাকানের গোটা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। তাদের কেউ হাজার বছর, কেউ পাঁচ শতাধিক বছর আর কেউবা কয়েকশ’ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। স্থানীয় মগ জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য সহায়তায় আরাকানের মংডু এবং আকিয়াব এলাকায় চলছে নির্বিচারে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বিরানভূমিতে পরিণত করছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা তরুণীদের অপহরণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি তরুণীকে অপহরণ করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। খাল, বিল ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মহিলাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে। তাছাড়া অনেক মুসলমানকে হত্যার পর লাশ গুম করেছে। অনেককে হত্যা করে বৌদ্ধদের গরোয়া কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে মিডিয়ায় বৌদ্ধ বলে চালিয়ে দিচ্ছে।

খ্রীষ্টিয় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ইউরোপে ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণ বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। যেমন- ১৬৪৮ সালের    জার্মানিতে রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের সমান অধিকারকে স্বীকার করে নেয় এবং এতে করে তাদের মধ্যে ৩০ বছরের যুদ্ধের অবসান হয়। ১৭৬৩ সালে ফ্রান্স, গ্রেট বৃটেনে, স্পেন এবং পর্তুগালের মধ্যে সম্পাদিত ‘প্যারিস চুক্তি’ ( , ১৭৬৩) অনুযায়ী গ্রেট বৃটেনে তার সদ্যপ্রাপ্ত কানাডিয়ান ক্যাথলিকদের ততটুকু ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ দেয়।

১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণ করা হয়েছে। যে নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে এবং ভীতি ও অভাব থেকে মুক্ত থাকে, কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন সেই অবস্থা সৃষ্টি করা হয় যেখানে প্রত্যেকেই তার নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃিতক অধিকার উপভোগ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক এসব আইন থাকলেও তা আজ মুসলমানদের জন্য যেন একেবারেই প্রযোজ্য নয় কবে ফিরে পাবে আরাকানের মুসলমানরা তাদের হারানো স্বাধীনতা? আমাদের কিতাবে লেখা এ আইনে কি আরাকানের মুসলমানদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের সুরক্ষাটুকু দিতেও ব্যর্থ?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ