ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সংখ্যা লিখন পদ্ধতির বৈচিত্র্যতা

জাফর ইকবাল : লিখন পদ্ধতির আবিষ্কার নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে যতদূর জানা যায়, মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম মোটামুটি পরিপূর্ণভাবে লেখার কৌশল আবিষ্কার করে। এর আগে ছবি আঁকিয়ে কিংবা মুখস্থ করে বিভিন্ন ঘটনা মনে রাখা হতো। সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা- সংখ্যা লেখার পদ্ধতি মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম পূর্ণরূপে রপ্ত করতে শেখে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতাভেদে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির বিভিন্ন রকম বৈচিত্র্যতা আসতে থাকে। পর্যায়ক্রমে সেই পরিবর্তনের ধারায় আমরা আজ লিখি ১,২,৩ কিংবা ১,২,৩। এবার সভ্যতাভেদে লিখন পদ্ধতি নিয়েই থাকছে আলোচনা।

মিশরীয়দের পদ্ধতি : মিশরীয়রা ভাষা ও সংখ্যা নির্দেশ করতে বিভিন্ন চিত্রলিপির সাহায্য নিত। এই চিত্রলিপিকে বলা হয় হায়রোগ্লিফিক। হায়রোগ্লিফিক শব্দটি মূলত গ্রিক ঐরবৎড় (পবিত্র) এবং এষুঢ়যবরহ (রেখাঙ্কন) শব্দদুইটির সমন্বয় থেকে উৎপন্ন হয়েছে। মিশরীয়রা হায়রোগ্লিফিককে বলতো পবিত্রলিপি। প্রাচীন মিশরীয়রা এই ভাষাকে দেবভাষা বলে আখ্যায়িত করতো। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০-৩৪০০ অব্দে এই লিপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে এই লিপি মিশরীয় অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর এই লিপির সঙ্গে তৎকালীন প্রচলিত ধর্মের যোগসূত্র থাকায় লিপিগুলো ছিল অলঙ্করণ সমৃদ্ধ এবং লেখা হতো ডানদিক থেকে। তবে এই লিপির সাহায্যে হিসাব-নিকাশ ছিল বেশ কষ্টসাধ্য যে কারণে কয়েকশতকের মধ্যেই এই লিপি জনপ্রিয়তা হারায়। এরপর কিছুকাল অপেক্ষাকৃত সহজ ‘হায়ারোটিক’ লিপির উদ্ভব হয়। এই লিপিতে জন্মগ্রহণ করেছিল চিত্র থেকেই কিন্তু চিত্রকে পূর্ণভাবে প্রকাশ করে নয়। এরপর মিশরীয়রা সংখ্যা লেখা শুরু করে ‘ডিমোটিক’ লিপির সাহায্যে। এই লিপিই পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়ে মিশরীয়দের আধুনিক লিখন পদ্ধতির সূত্রপাত ঘটায়।

ব্যাবিলনীয়দের লিখন পদ্ধতি : খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের দিকে শুধু ব্যাবিলনীয়দের মধ্যেই নয় সুমেরু, মেসোপটেমিয়া, অ্যাসিরীয়র বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন একটি লিপির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই লিপি ‘কিউনিফর্ম’ নামে পরিচিত। বাংলায় একে বলে কীলকাকৃতি লিপি। ল্যাটিন ঈঁহবঁং এবং ঋড়ৎসধ শব্দদুইটি থেকে এই শব্দের উদ্ভব। কাঁচা মাটির টালির ওপর সূচালো বস্তু দিয়ে মূলত এই লিপি লেখা হতো। কিউনিফর্ম লিপিতে এক, দশ এবং একশোর জন্য বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করা হতো। তবে এই লিপিতেও সমস্যা কম ছিল না। সে সময় পর্যন্ত শুন্যের ধারণা এই লিপিতে না থাকায় কোনো সংখ্যার অনুপস্থিতিতে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। এই পদ্ধতিতে লেখার ব্যাপারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারণার প্রয়োগ দিক হল যোগ ও গুনের ধারণার সঙ্গে সঙ্গে বিয়োগের ধারণার বিকাশ। কারণ এই লিপিতে ১২ লেখার সময় দুটো এক চিহ্ন যোগ করা হতো। আবার ৮ লেখার সময় দশের সাথে দু’টো এক চিহ্ন বিয়োগ করা হতো। অর্থাৎ মূল সংখ্যাগুলো ধরা হতো ১, ১০, ১০০ এবং ১০০০। এই সংখ্যাগুলোরই আলাদা আলাদা চিহ্ন ছিল, বাকিগুলো প্রকাশ করা হতো যোগ কিংবা বিয়োগ দিয়ে।

গ্রিকদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : সংখ্যা লিখন পদ্ধতি নিয়ে গ্রিক এবং রোমানদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা উল্লেখ করার মতো। কারণ ১ এবং ১০-এর মাঝখানে তারাই ৫-কে মৌলিক সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করে তাকে আলাদা চিহ্নে প্রকাশ করতো। কিন্তু লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রথম শতকগুলোতে ১,৫, ১০, ৫০, ১০০, ৫০০ বাদে অন্য সংখ্যা প্রকাশে তারা মিশরীয় কিংবা ব্যাবিলনীয়দের মতো যোগ-বিয়োগ পন্থা এড়াতে পারেনি। এছাড়া শুন্যের ব্যবহার জানা না থাকার ফলে তাদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি বেশি উন্নতি করতে পারেনি এবং তাদের সংখ্যা ছিল সসীম। যদিও পরবর্তীতে গ্রীকরা সংখ্যা লিখন পদ্ধতিতে এক থেকে নয় পর্যন্ত প্রতিটি অক্ষর আলাদা চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করেছিল, কিন্তু সেটা বেশ পরে।

মায়াদের সংখ্যা পদ্ধতি : সুদূর মধ্য আমেরিকায় এক প্রাচীন সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল যার নাম মায়া। এরা যে গণনা পদ্ধতির আবিষ্কার করেছিল তা অন্য সভ্যতা থেকে বেশ পৃথক ছিল। এদের পদ্ধতি ছিল বিশকেন্দ্রিক। মায়ারা শুন্যের ব্যবহার জানতো কিনা সেটা সঠিকভাবে বলা না গেলেও এটা ভালোভাবে বলা যায় যে তারা অন্য সভ্যতার থেকে বড় বড় সংখ্যা লিখতে পারতো। এরা এক এবং পাঁচ মৌলিক চিহ্নরূপে প্রকাশ করতো। এরা এক লিখতে একটি ডট ‘.’ এবং পাঁচ লিখতে একটি ‘-‘ ব্যাবহার করতো। আর বাকিসংখ্যা প্রকাশে যোগের পদ্ধতি ব্যাবহার করতো। 

রোমানদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : রোমানরা শূন্যের ব্যবহার না জানলেও সংখ্যা ব্যবহারে তাদের উদ্ভাবিত চিহ্ন বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আজো পর্যন্ত রোমান হরফ বেশ ব্যবহৃত এবং সুপরিচিত। তাদের সংখ্যা প্রকাশে মৌলিক চিহ্ন ব্যবহার করা হতো এক (ও), পাঁচ (ঠ), দশ (ঢ), পঞ্চাশ (খ), একশো (ঈ), পাঁচশো (উ), এবং একহাজার (গ) এর ক্ষেত্রে। এই লিপিতে এক বোঝাতে ইংরেজি আই-এর মতো এবং পাঁচ বোঝাতে ভিএর মতো চিহ্নের ধারণা মনুষ্য হাত থেকেই উদ্ভব। তবে নান্দনিক এবং পরিচ্ছন্ন হওয়ায় রোমানদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতির কদর সে সময়ে বেশ রাজত্ব করেছিল।

চীনদের সংখ্যা লিখন পদ্ধতি : মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতার মতো প্রাচ্য সভ্যতাতেও অতি প্রাচীনকাল থেকেই গণিত চর্চার প্রচলন ছিল। বর্তমান সময়ে চীনে সংখ্যা লিখন পদ্ধতিতে যেসব চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় তার সাথে চৈনিক সভ্যতার প্রথমদিকের সংখ্যা লিখন পদ্ধতির মিল থেকে অমিলই বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু চৈনিক সভ্যতার প্রাচীন গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে বিশেষ করে বিশিষ্ট চৈনিক গণিতজ্ঞ চ্যাং সাং, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ১৫২ সালে পরলোকগত হন, সেই চ্যাং সাং এর নয় খন্ডে বিভক্ত গণিতগ্রন্থ ‘চিউ-চ্যাং শুয়ান শু’-এর দিকে লক্ষ্য করলে চৈনিক সভ্যতার প্রথমদিকে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির ধারণা পাওয়া যায়। এই লিপিতে ১,৫,৬,৭,৮,৯, ১০, ১০০, ১০০০ সংখ্যাগুলো লিখতে আলাদা আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। 

সিন্ধুদের পদ্ধতি : একেবারেই প্রথম পর্যায়ে সিন্ধু সভ্যতায় সংখ্যা লিখন পদ্ধতি কেমন ছিল তা জানা যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসবশেষ থেকে যে লিখন পদ্ধতির লিপি পাওয়া গেছে তা আজো পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মত লিখন পদ্ধতির প্রকাশ ঘটে ভারতবর্ষে। প্রাচীন ভারতে সংখ্যা লিখন পদ্ধতির নমুনা পাওয়া যায় খরোষ্ঠী ও ব্রাহ্মী লিপিতে। ঐতিহাসিকদের মতে খরোষ্ঠী লিপি বহিরাগত। আর ব্রাহ্মী লিপি এ অঞ্চলের ভূমিজ। গণনায় এবং চিহ্ন প্রকাশে অন্য সভ্যতার মানুষদের থেকে ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল কারণ তারাই শুন্যের আবিস্কারক। শুন্য আবিষ্কার হওয়ার ফলে তাদের গণনা প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ হল। ভারতীয় গণিত এবং গণনা পদ্ধতির সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটে বৈদিক যুগে। এ সময় গণনা পদ্ধতিতে দশমিকের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বড় বড় সংখ্যার নামকরণে বৈদিক হিন্দুরা ছিল পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে। রোমান গণিতে মিলি বা এক হাজার, গ্রিক গণিতে মিরিয়াড বা দশ হাজারের উর্ধ্বে যখন কোনো সংখ্যার নাম নেই সে সময় বৈদিক যুগে ভারতীয়রা গুনেছে দশ হাজারের ঊর্ধ্বে, করেছে নামকরণ ও- নিযুত, প্রযুত, অর্বুদ, ন্যর্বুদ, সমুদ্র, মধ্য, অন্ত, পরার্ধ ইত্যাদি। প্রাচীন হিন্দুগ্রন্থ বাজসনেয়ী সংহিতা কিংবা তৈত্তরীয় সংহিতা এই শব্দগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়। এছাড়া যজুর্বেদেও সংখ্যার বিভিন্ন যেসব নাম উল্লেখ আছে সেগুলো সেযুগে আবিষ্কৃত হওয়া যেন অপার বিস্ময়ের। এছাড়া সংখ্যাকে ক্ষুদ্র করে বিভিন্নভাবে উপস্থাপনেও ভারতীয়দের জুড়ি নেই, যেমন যোজন, ক্রোশ, ধনু, হস্ত, যব, ত্রুটি, রেণু প্রভৃতি।

তবে ভারতীয়দের শূন্য আবিষ্কার এবং এক থেকে নয় পর্যন্ত বিভিন্ন চিহ্ন ব্যবহার করে সংখ্যা লিখন পদ্ধতি, সংখ্যার ধারণা এবং লিখন পদ্ধতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। এই শুন্য সম্বলিত লিখন পদ্ধতি প্রথমে ভারত থেকে আরবে যায়, পরে সেখান থেকে পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ অন্যসব লিখন পদ্ধতি পরোপুরি বর্জিত হয়ে এই পদ্ধতি বিভিন্ন ভাষার নিজস্ব স্টাইলে গৃহীত হয়। বর্তমানে সংখ্যা লেখার জন্য পৃথিবীর সকল ভাষাতেই তার নিজস্ব স্টাইলে ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,০ এই দশটি অঙ্ক প্রতীক সর্বজনস্বীকৃতভাবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রতীকগুলোকে ‘হিন্দু-আরব নিউমেরালস’ বলা হয়। ভারত থেকে শূন্যের ধারণা আবিষ্কৃত হয়ে যখন আরবে যায় তখন ‘শূন্য’ কে আরবি ভাষায় ডাকা হয় ‘সিফর’ যেটি পরবর্তীতে জেফিরো এবং সেখান থেকে ‘জিরো’ হয়। ইংরেজিতে সর্বপ্রথম জিরো শব্দটি ব্যবহৃত হয় ১৫৯৮ সালে। সবমিলিয়ে শূন্য আবিষ্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন সভ্যতায় ব্যবহৃত সংখ্যা প্রকাশের বিভিন্ন ধরণকে পাল্টিয়ে দিয়ে এক সূত্রে গেঁথে গিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ