ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অজেয় টেরিফক্স

এম এস শহিদ : পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন-যারা নানা প্রতিবন্ধকতা উতরিয়ে শেষ পর্যন্ত অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছেছেন। এমনই একজন মানুষ হচ্ছেন টেরিফক্স-টেরি ফক্স ১৯৭৭ সালে ফ্রান্সের সিমন ইউনিভার্সিটির ছাত্র তখন তিনি হঠাৎ করে জানতে পারলেন তার ডান পায়ের হাড় ক্যান্সারে আক্রান্ত। তখন তিনি ১৮ বৎসরের যুবক। ক্যান্সারে যেনো তার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য তৎক্ষণাৎ ডান হাঁটুর কয়েক ইষ্ণি ওপর থেকে পাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।  ১৮ বৎসরের একজন যুবকের জন্য, এই অবস্থাটি কতো বেদনাদায়ক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে হানপাতালের বেডে শুয়ে তিনি ভাবছেন কখনো চোখ বন্ধ করে, আবার কখনো খুলে। চিন্তা করে চলেছেন তার মতো আরো অসংখ্যা ভুক্তভোগী মানুষের জীবনযন্ত্রনাবোধ। খুব কাছ থেকে উপলদ্ধি করেছেন মরণব্যাধি ক্যান্সার কীভাবে তরতাজা তরুণকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। হঠাৎ করে তিনি সংকল্প গ্রহণ করলেন বেঁচে থাকলে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষ ও ক্যান্সার গবেষণারর জন্য কাজ করে যাবেন। আর সে ইচ্ছা বাস্তবে রুপ দিতে তিনি মৃত্যুর আগে একটানা ১৪২ দিন দৌড়ে ছিলেন। পাড়ি দিয়েছিলেন দীর্ঘ ৫ হাজার ৩৭৩ কিলোমিটার পথ। ইতিহাসের পাতায় যা আজ ম্যায়াথন অব হোপ নামে সমধিক পরিচিত। 

১৯৫৮ সালের ২৮ জুলাই টেরি ফক্স কানাডার মানিটোবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নামে রোলি ফক্স এবং মাতার নাম বেটি ফক্স। টেরির জন্মের কয়েক বৎসর পরই তার বাবা-মা পাড়ি জমায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাংকুভারের নিকটে পোর্ট ককুইটলামে। বাল্যকাল থেকেই টেরির খেলাধুলার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। যদিও গ্রেড এইটের বাস্কেটবল টিমের বাস্কেটবলে ভালো খেলোয়াড় চিলেন না। টেরি যখন ককুইটলাম সেকেন্ডারি স্কুলের শেষ বর্ষের ছাত্র তখন তিনি বন্ধু ডাগ অ্যালওয়ার্ডের সাথে যৌথভাবে বর্ষসেরা অ্যাথলেটের মর্যাদা লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি সসার, রাগবি, বেসবল এবং বাস্কেটবল খেলতে ভালোবাসতেন। পরবর্তীতে তিনি সাইমন ফ্লেজার বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা বিভাগে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

১৯৭৬ সালের ১২ নভেম্বর টেরি যখন গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন তখন হঠাৎ তার গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এ দুর্ঘটনায় তার ডান পায়ের হাঁটুতে বেশ জখম হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু টেরি ও তার চিকিৎসক কেউই বুঝতে পারেননি এ জখমই তাকে ভবিষ্যতে  ক্যান্সারে আক্রান্ত করবে।

তবে দমে যাননি টেরি ফক্স। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য টাকা সংগ্রহ করা এবং এইসাথে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে নমত গড়ে তোলার জন্য তিনি সংকল্প গ্রহণ করলেন। এ জন্য তিনি সুবিশাল কানাডার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। টেরির ধারণা ছিল যদি সারা দেশের মানুষ এক ডলার করে দেয় তাহলেও ক্যান্সার গবেষণার জন্য তার তহবিল জমা হবে ২ কোটি চল্লিশ লাখ ডলার। এজন্য টেরি ১৪ মাস অনুশীলন করেন। অনুশীলন শেষে ১৯৮০ সালের ১২ এপ্রিল টেরি তার কৃত্রিম পা নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ম্যারাথন যাত্রা শুরু করেন। তীব্র বাতাস, বরফশীতল বৃষ্টি এমনকি তুষারপাতকে উপেক্ষা করে টেরি প্রতিদিন প্রায় ৪২ কিলোমিটার দৌড়াতেন। এভাবে তিনি ১৪২ দিন পর্যন্ত তার দৌড় অব্যাহত রাখতে সমর্থ হন। 

সমালোচকদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে দিনের পর দিন দৌড়ে টেরি অতিক্রম করে যান শার্লট টাউন ডার্টমাউথ, মন্ট্রিয়ল, টরেন্টো, দৌড়ানোর মাঝে চলতে বিভিন্ন স্থানে টেরি, আবেগপ্রবন বক্তব্য দেন। তার বক্তব্য জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। জনগণের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হতে থাকেন। ১৯৮০ সালের ১লা সেপ্টেম্বর টেরি হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। তার ক্যান্সার তখন ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য তাকে আবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। অবশেষে ১৯৮০ সালের ২৮ জুন ক্যান্সারের কাছে হার মেনে তাকে এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয় । তখন নিঃস্বার্থবাদী এ মহান  যুবকের বয়স ছিল মাত্র ২২ বৎসর।

টেরির এই ম্যারাথন দৌড়ের লক্ষ্য ছিলো, ক্যানাডিয়ান ক্যান্সার সোসাইটিকে সহযোগিতা করা ও ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। যদিও টেরি ম্যারাথনে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সমর্থ হননি, তবুও তার দৌড় ২৪.২ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পেরেছিল। টেরির এ ম্যারাথন দৌড় লাখো মানুষকে ক্যান্সার সম্পর্কে জাগ্রত করে তোলে। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি জায়গা করে নিতে সক্ষম হন।  তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য তার নামে নির্মিত হয়েছে স্কুল, স্ট্যাম্পসহ এইচবিও মুভি। প্রতিবৎসর ক্যানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টেরি ফক্স দৌঁড়। ২০০৪ সালে কানাডার জনগণ টেরিফক্সকে ‘সেকেন্ড গ্রেটেস্ট ক্যানাডিয়ান অব অলটাইম’ নির্বাচিত করে। বিশ শতকে ক্যানাডার জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। টেরি ফক্স বিশ্ববাসীর জন্য এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে শরীরিক অক্ষমতা কোনো বাধাই সৃষ্টি করতে পারেনা। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় মনোবল। টেরি ফক্সের নামানুসারে  কানাডার বহু স্কুল, ভবন, রাস্তা এবং পার্কের নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাদেশিক পার্ক এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উপত্যকার নাম করা হয় তার নামানুসারে। ফক্সেস ষ্টোরি নামের গ্রন্থটি ১৯৮৩ সালে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়াও এ কিংবদন্তীকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে নানা সিনেমা ও ডকুমেন্টারি।

এলঙ্গী আচার্য্য, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ