ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৫ দিনের ব্যবধানে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ৬ টাকা

এইচ এম আকতার : একের পর এক চুক্তি করে চাল আমদানি করলেও কোনভাবে দাম কমছে না। উল্টো পথে হাটছে দেশের চালের বাজার। এতে করে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভোক্তা। এ অবস্থা আরো কিছুদিন থাকবে বলে এক ধরনের জল্পনা আছে বাজারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, যা চালের বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানেই আবারও চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এজন্য সরকারের মজুদ ব্যবস্থাকে দায়ী করছে ব্যবসায়ীরা। পাইকারিতে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে বস্তায় (৫০ কেজি) ২৫০-৩০০ টাকা বা কেজি প্রতি সর্বোচ্চ ৬ টাকা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের পর সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে সিন্ডিকেট।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে চালের দাম বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দফায় আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনে। সরকারিভাবেও চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের আগ পর্যন্ত দাম কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ঈদের পর আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠে বাজার।

দুই দফা বন্যার পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে কাক্সিক্ষত চাল না পাওয়া ও রোহিঙ্গা সংকটকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে তাদের কোনো দায় নেই বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। নওগাঁ ধান-চাল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা বলেন, সংকট চতুর্মুখী হওয়ায় সরকারের পক্ষেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। সরকারি মজুদ কমে যাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব পড়তে পারে বাজারে।

তিনি আরও বলেন, নতুন চাল আমদানি করতে খাদ্যমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে রয়েছেন। কিন্তু তাতেও তেমন ফল হচ্ছে না। অনেকে আবার মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির বিরোধীতাও করছেন। তাদের মনে রক্তে মাখা চালের ভাত খেতে রাজি নয় বাংলাদেশের মুসলমানরা। অন্য যে কোন দেশ থেকে চাল আমদানি করতে পারে সরকার। 

এত উদ্যোগ ও সুবিধা বাড়ার পরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী কেন? এমন প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব নেই কারও কাছে। আমদানিকারক, মিল মালিক ও বিভিন্ন স্তরের বিক্রেতা বলছে ভিন্ন কথা। সব মিলে এ যেন আবারও এক চতুর্মুখী সংকট। চালের মিল মালিকদের মতে, শুল্ক কমানোর ফলে মূলত আতপ ও ভারতীয় মোটা চালের আমদানি বেড়েছে। এতে সরু ও মাঝারি চালের দাম কমছে না। আর আমদানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে বাড়ছে চালের দাম। এছাড়া সরকারের বাড়তি দামে চাল কেনায় শুল্ক কমানোর সুবিধা পাচ্ছে না তারা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের পর সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে সিন্ডিকেট।

রাজধানীর বাবু বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা জানান, এবার বোরো মওসুমের চাল সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমেছে। দেশের প্রধান প্রধান চাল প্রক্রিয়াকারী জেলার ব্যবসায়ী ও মিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। এসব কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে চালের দাম।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচদিন আগেও জিরা সিদ্ধ চালের দাম ছিল বস্তাপ্রতি (৭৪ কেজি) ৪ হাজার টাকা। গতকাল একই চাল বস্তাপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ২৫০ টাকায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারতীয় বেতি চালের দাম। ভারত থেকে আমদানি করা বেতি চাল পাঁচদিন আগেও বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। সেই চালই গতকাল বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। স্বর্ণা মোটা সিদ্ধ চাল ২ হাজার ১০০ থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে চালের দর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারকেও দায়ী করছেন আমদানিকারকরা। চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম বলেন, এক মাস আগেও চালের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ৩৫০-৩৫৫ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯৫-৪০০ ডলার। ফলে আমদানির পর তা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে মজুদ কম থাকায় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টাও করছেন। তবে সরকারি মজুদ পর্যাপ্ত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে চালের বাজার অস্থির করা সম্ভব হবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চাল ব্যবসায়ী জানান, সরকারের কাছে চালের মজুদ না থাকার বিষয়টি ব্যবসায়ীরা জেনে গেছেন। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর মিলার ও ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দেয়ায় চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।

চালের দাম কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা বেড়েছে রাজধানীতেও। বাবুবাজারে ঈদের আগে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৫২-৫৩ টাকা। গতকাল তা ৫৭-৫৮ টাকায় বিক্রি হয়। একইভাবে ৬০-৬২ টাকার নাজিরশাইল ৬৫-৬৬ টাকা, ৪৬-৪৭ টাকার বিআর-২৮ এখন ৪৯-৫০ ও ৪১-৪২ টাকার মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩-৪৪ টাকায়।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বাজারে চালের দাম কমার আর কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী। তিনি বলেন, মওসুমের শুরুতে প্রতি মণ জিরাশাইল ধানের দাম ছিল ৮০০-৮৫০ টাকা। বর্তমানে তা ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে চালের দামও বাড়ছে। আগামীতে আরো বাড়বে। এটা রোধ করা সম্ভব হবে না।

ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি চাল আমদানি হয় দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে। সেখানেও পণ্যটির দাম আরেক দফা বেড়েছে। আমদানি মূল্য বেশি পড়ায় ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে চাল বিক্রি করছেন বলে জানান তারা। কয়েক দিনের ব্যবধানে স্থলবন্দরটিতে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকা।

ভারত থেকে আমদানিকৃত স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে পাইকারিতে (ট্রাক সেল) ৪১ থেকে সাড়ে ৪১ টাকা কেজিদরে। রতœা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৩ থেকে সাড়ে ৪৩ টাকায়। অথচ ঈদের আগে ১০ শতাংশ শুল্কে আমদানি করা প্রতি কেজি স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছিল ৩৭-৩৮ ও রতœা ৪১ টাকায়।

আমদানিকারকরা বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সরকার মূলত অনেক বেশি দামে চাল ক্রয় করার কারণে বেসরকারি পর্যায়ের আমদানিকারকদের বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিক্রেতা দেশও সেই সুযোগে দফায় দফায় বুকিং রেট বাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমদানিকারকরা শুল্ক কমানোর সুবিধা পাচ্ছেন না।

ভারতে এক মাস আগেও চালের বুকিং দর ছিল টনপ্রতি ৩৫০ থেকে ৩৫৫ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯৫ থেকে ৪০০ ডলার জানিয়ে হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারক হারুন উর রশীদ হারুন বলেন, ভারতীয় রফতানিকারকরা যে হারে দাম বাড়াচ্ছেন, তাতে শুল্ক হ্রাসের পরও সব মিলে চালের দাম বাড়ছে। বাড়তি দামে কিনে আমরা কয়েক দিন বাড়তি দামে চাল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।

তবে রাজধানীর আরেক বৃহৎ চালের আড়ত বাবুবাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, ধানের মওসুম শেষ। এখন বাজারে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী নভেম্বরের আগে নতুন ধান আসবে না। বন্যায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন সবাই সুযোগ নিচ্ছে। আমদানি ও সরবরাহের সমস্যা না থাকলেও দাম বাড়াচ্ছেন সব স্তরের ব্যবসায়ীরা। আসলে প্রকৃত কারণ এটাই।

চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, মিল মালিকদের কিছুই করার নেই। দেশে সরু ধানের চরম সংকট চলছে। আর এখন ভারতের যে চাল আমদানি হচ্ছে তার সবই প্রায় মোটা। তাই চিকন চালের সংকটে চালের দাম বেড়েছে।

বছরে দেশে চালের চাহিদা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন। এর মধ্যে বোরো মওসুমে এক কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু এবার হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত বোরোতে চালের উৎপাদন ২০ লাখ টন কম হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ লাখ টন চাল কম উৎপাদন হয়েছে। আর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ হেক্টর বলে গত রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

সরকারের খাদ্যের মজুদ কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বা অনিশ্চয়তা দূর করতে এ পর্যন্ত সরকার ১৫ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু গত তিন মাসে আমদানি করে সরকারি গুদামে তুলেছে মাত্র দেড় লাখ টনেরও কম। পাশাপাশি দেশের ভেতরে ধান-চাল সংগ্রহের কাজে খাদ্য মন্ত্রণালয় ভয়ানক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। ফলে সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুত বাড়ছে না। সেই সুযোগে চালের বাজারে সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যশস্য পরিস্থিতির তথ্যে, এ পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট মজুদ তিন লাখ ২৫ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) গত ০৬ সেপ্টেম্ব^র পর্যন্ত সরকারি খাতে এক দশমিক ৪৮ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ দুই লাখ ৫২ হাজার ৩৩৯ টন বোরো চাল (সিদ্ধ ও আতপ) এবং চার হাজার ৮২ টন ধান।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ