ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চলছে জোড়াতালি দিয়ে

খুলনা অফিস : খুলনার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো কোন রকম জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এ সব কমপ্লেক্সগুলোতে রয়েছে জনবল সংকটসহ মেশিনারিজের সংকটও। 

তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন অচল থাকার পর মেরামত শেষে এক্স-রে মেশিনটি সচল হয়েছিল ২০০৯ সালে। ওই বছরেই আবারো অচল হয়ে পড়ে। এরপর এই আট বছরেও মেশিনটি চালু করা যায়নি। এর একমাত্র কারণ মেডিকেল টেকনোলজি (রেডিওগ্রাফী) পদে কোন লোক না থাকা। মাইক্রোসকোপ মেশিনটিও অচল। জনবল না থাকায় ইসিজি, আলট্রাসনো, এ্যানেসথেসিয়া মেশিন এসব কিছুই চালু নেই। এ চিত্র । ১৯৭৪ সালে মাত্র ২৫টি বেড নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া এ হাসপাতালটি এখনও ৩১ বেডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিনটিও অচল। মেশিনটি সংস্কার করতে ২০১৫ সালে একজন ইঞ্জিনিয়ার এসে পরিদর্শন করেন। কিন্তু এখনও একই অবস্থায় রয়েছে সেটি। এ হাসপাতালের জেনারেটর ও অপারেশন লাইট পর্যন্ত নষ্ট। 

দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আন্তঃবিভাগ অনেকটা অরক্ষিত। এক্স-রে টেকনেশিয়ানের পাশাপাশি নেই এ্যাম্বুলেন্স চালকও। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এক্স-রে মেশিন ও এ্যাম্বুলেন্স। 

খুলনার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি যারা পদায়ন রয়েছেন তাদের মধ্যেও অনেককে খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র যেসব চিকিৎসকের উপজেলা পর্যায়ে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার রয়েছে তাদের তৎপরতাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে এমন চিত্রই মিলেছে। খুলনা-যশোর মহাসড়কের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত ৫০ বেডের হাসপাতাল ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। ২৫টি পদের মধ্যে ডাক্তারের ১১টি পদই শূন্য। ২০ জনের মধ্যে মাত্র ১১ জন রয়েছেন নার্স। এক্স-রে, আল্ট্রাসনো, ইসিজি কিছুই হয় না এ হাসপাতালে। জেনারেটরটি রয়েছে বাক্সবন্দী অবস্থায়। আর এক্স-রে মেশিনটি বসানোর আগেই অচল হয়ে রয়েছে।

ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ওই হাসপাতালের এখন প্রধান সমস্যাই হচ্ছে জনবল সংকট। উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ছয়টি পদের সব কটিই শূন্য। একইভাবে তিনজন ফার্মাসিষ্টের কেউই নেই। তিনজনের স্থলে দু’জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাবরেটরি) পদায়ন রয়েছে। শুধুমাত্র সিবিসি ও ইউরিন ছাড়া আর কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। নেই এক্স-রে মেশিনও। ১৯৮৪ সালে ৩১ বেড নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া এ হাসপাতালটি এখনও ৩১ বেডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদিও কিছুদিন আগে ৫০ বেডের জন্য ভবন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু এখনও পদায়ন হয়নি জনবল। জনবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে ইসিজি, আল্ট্রাসনো ও ডেন্টাল এক্স-রে মেশিন। 

রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. উদয় বরণ মন্ডল বলেন, চিকিৎসকের পাঁচটিসহ এ হাসপাতালে বর্তমানে ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

খুলনার সিভিল সার্জন অফিসের সূত্রটি জানায়, জেনারেল হাসপাতালসহ সিভিল সার্জনের আওতাধীন নগরীর অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৫৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ১১২টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৬০টি, তৃতীয় শ্রেণির ২৮৪টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৩১টি পদ শূণ্য থাকায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যহত হচ্ছে। সিভিল সার্জন ডা. এএসএম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জনবলসহ জেলার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র তুলে ধরে প্রতি মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পত্র পাঠানো হয়। প্রতিটি প্রতিবেদনেই জনবলসহ অন্যান্য সংকটের কথা উল্লেখ থাকে। 

উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলো পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোর সংকটকে পুঁজি করে স্থানীয় পর্যায়ে বেশকিছু ভূঁইফোড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথেও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের যোগসাজশ রয়েছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিজেরাই গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যদিয়ে রোগীদের যেমন ওইসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য করা হচ্ছে তেমনি সরকারি হাসপাতালগুলোর যন্ত্রপাতি সচল করতে তেমনটি তৎপরতাও দেখা যায় না। আর নাম সর্বস্ব এসব বেসরকারি ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হলেও এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অথচ প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের আশ-পাশ ঘিরেই গড়ে উঠেছে এসব ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের একটি ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের এক্স-রে মেশিনটিই স্থাপন করা হয়েছে টিন সেড ঘরে। যা’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম বহির্ভূত হলেও খুলনার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর এসব কথিত ডায়াগনষ্টিক সেন্টার চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ