ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পদ্মায় প্রবল স্রোতের কারণে সনাক্তকৃত লঞ্চ মৌচাক উদ্ধার অভিযান ব্যহত

শরীয়তপুর সংবাদদাতা : শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর তীব্রস্রোতে পল্টুন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানির তোরে উল্টে তিনটি ডুবে যাওয়া লঞ্চ উদ্ধারের জন্য অভিযান চালালেও পদ্মায় প্রবল স্রোতের কারণে সনাক্ত করা মৌচাক লঞ্চটি উদ্ধার করতে পারেনি। এমভি নড়িয়া-২ ও মহানগরের সন্ধানে বুধবার সকাল থেকে অভিযান শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচলক। এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ কোন ব্যক্তিকেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে নিখোঁজদের পরিবার, স্বজন ও এলাকায় চলছে শোকের মাতম। তবে নিখোঁজদের খুঁজে পাওয়ার জন্য নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এদিকে শরীয়তপুর থেকে গঠন করা তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। মঙ্গলবার বিকেলে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় সনাক্ত করা মৌচাক-২ নামের লঞ্চটি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে জাহাজ ও ডুবুরীদল নিয়ে তীরে ফিরে চলে যায়।

নড়িয়া থানা, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ করে নড়িয়ার পদ্মা নদীর ওয়াপদা লঞ্চঘাটে অবস্থিত পন্টুনের সামনে তীব্রস্রোতের কারণে ২/৩ শতাংশ জমি নিয়ে পদ্মার পাড় দেবে যায়। এ সময় পন্টুনের পাশে ও পদ্মার পাড়ে নোঙ্গর করা পাঁচটি লঞ্চ ভেড়ানো ছিল। তার মধ্য থেকে তিনটি লঞ্চ পল্টুন ও নোঙ্গর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পানির তোরে কাত হয়ে স্রোতে ভেসে নদীতে ডুবে যায়। লঞ্চ তিনটির একটি মৌচাক-২ নড়িয়ার ওয়াপদা ঘাট থেকে ঢাকা এবং এমভি মহানগর ও নড়িয়া-২ নারায়ণগঞ্জে চলাচল করতো। ডুবে যাওয়া ৩টি লঞ্চের মধ্যে মৌচাক নামের লঞ্চটি নড়িয়া পদ্মা নদীর দুলারচর নামক স্থানে সন্ধান পাওয়া গেলেও বাকি দুটি লঞ্চের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় তিনটি লঞ্চের কর্মচারী ও মৌচাক-২ লঞ্চে এক নবজাতকসহ তিন যাত্রী ও অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন নিখোঁজ হয়। এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত এখনও কাউকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজ স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে চলছে কান্না আর আহাজারি। নিখোঁজ স্বজনদের কান্নায় পদ্মা নদীর সুরেশ্বর, ওয়াপদা ঘাটের বাতাস ভাড়ী হয়ে উঠছে। অনেকেই তাদের স্বজনদের ছবি হাতে নিয়ে লাশের অপেক্ষা করছে পদ্মা পাড়ে। 

নিখোঁজ ব্যক্তি ও লঞ্চের সন্ধানে নৌবাহিনীর ১১ সদস্যের ডুবুরী দল, ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা, ফরিদপুর ও শরীয়তপুরের তিনটি ইউনিট এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের একটি ডুবুরী দল পদ্মা নদীর দুর্ঘটনাস্থল ও আশপাশে অবস্থান করছে। পদ্মা নদীতে প্রচন্ড স্রোত থাকার কারণে উদ্ধার তৎপরতা বিঘ্ন হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার অনুসন্ধান চালিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চ মৌচাক এর সন্ধান পেলেও উদ্ধার কাজ শুরু করতে পারেনি। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছে, নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় কোন ডুবুরী দলই ৭ ফিটের বেশী পানির নিচে যেতে পারছেন না। মৌচাক লঞ্চটি ৩৬ থেকে ৪০ ফিট পানির নিচে রয়েছে। পানির স্রোত না কমা পর্যন্ত মৌচাক লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মৌচাক লঞ্চের উদ্ধারকাজ মঙ্গলবারে মত স্থগিত করে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় সুরেশ্বর-২ ও মহানগরের সন্ধানে নতুন করে বুধবার সকাল থেকে অভিযান শুরু করা হবে। 

মৌচাক-২ লঞ্চের দোকান্দার নিখোঁজ লিটন সেখের স্ত্রী ফাতেমা বেগম তার শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সুরেশ্বর পদ্মা পাড়ে স্বামীর ছবি হাতে লাশের অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, গত দুদিন ধরে আমার স্বামীর কোন সন্ধান নেই। ঘটনার দিন রাত ৩টায় সে বাড়ি থেকে লঞ্চে ফিরে আসে এর পর তার আর কোন খোঁজ নেই। আমি আমার স্বামীর লাশটা চাই।

নড়িয়া-২ লঞ্চের যাত্রি নিখোজ নারায়নগঞ্জের রুপগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নিখোঁজ রিপন দাসের আত্মীয় দিলীপ কুমার বলেন, রিপন নড়িয়া বেড়াতে এসেছিল। লঞ্জ ডুবির পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। গত দুদিন তার কোন খোজ নেই। আমরা তার সন্ধানে এখানে এসেছি। 

মৌচাক-২ লঞ্চের বাবুর্চী নিখোঁজ মানিক মাদবরের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, আমার স্বামীর লাশটা ফেরত চাই। যাতে আমার সন্তানরা তাদের বাবার কবরটা দেখে বলতে পারে এটা আমার বাবার কবর। 

নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আসলাম উদ্দিন বলেন, গত দ’ুদিন উদ্ধার কাজ চালিয়ে প্রবল স্রোতের কারণে ডুবুরীরা কোন লাশ বা নিখোঁজ যাত্রিদের কাউকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ফরিদপুরের সহকারী পরিচালক এবিএম মমতাজ উদ্দিন আহ্মেদ আমরা ঘটনাস্থলে পৌছে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধার কাজে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 নৌ-বাহিনীর ডুবুরী দলের প্রধান লেঃ কায়সার ইসলাম বলেন, নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে সনাক্ত করা মৌচাক লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নদীর স্রোতের কারণে পানির গভীরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আপাতত সেখানে উদ্ধার কাজ বন্ধ রেখে অপর নিখোজ দু’টি লঞ্চের জন্য সন্ধান কাজ ও নিখোঁজ যাত্রিদের সন্ধান শুরু করা হবে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মাহবুবা আক্তার বলেন, লঞ্চ ডুবির ঘটনায় ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তাতে বলা হয়েছে নদীর তীব্র স্রোত ও পদ্মার ভাঙ্গনের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ