ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলো ‘ফোর-জি’ গাইডলাইন

স্টাফ রিপোর্টার : চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক তথা ‘ ফোর-জি’ গাইডলাইন অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুমোদনের পরে তা প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সোমবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠিয়ে দেয়া হয়। টেলিযোগাযোগ বিভাগ অনুমোদনপত্র টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিতে পাঠিয়ে দেয়। 

গতকাল মঙ্গলবার বিটিআরসি এই অনুমোদনপত্র পেয়েছে বলে কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

২০১৫ সালের শেষ দিকে ফোরজি নেটওয়ার্ক লাইসেন্সের গাইডলাইন তৈরি করেছে বাংলাদেশের টেলি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিটিআরসি’। তখন বলা হয়েছিল চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে ফোরজি তরঙ্গের নিলাম করবে এই সংস্থা।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত গাইডলাইন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ায় এখন স্বল্প সময়ের মধ্যে নিলাম আয়োজনের চেষ্টা করবে কমিশন। ৯০ দিনের মধ্যে নিলাম অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে ‘ ফোর-জি’র লাইসেন্স ফি ছিল ১৫ কোটি টাকা আর নবায়ন ফি ছিল সাড়ে ৭ কোটি টাকা। সংশোধিত গাইডলাইনে ‘ ফোর-জি’র লাইসেন্স ফি কমিয়ে ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। আর লাইসেন্স নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি টাকা। আগে ৯০০ ও ১৮০০ ব্যান্ডের প্রযুক্তি নিরপেক্ষাতার সেবার জন্যে এর আগে বিটিআরসি মেগাহাটর্জ প্রতি এক কোটি ডলার প্রস্তাব করলেও সংশোধিত গাইডলাইনে তা ৭৫ লাখ ডলারে আনা হয়।

‘ ফোর-জি’ কী : ‘ ফোর-জি’, ‘ ফোর্থ জেনারেশন’ বা ‘চতুর্থ প্রজন্ম’ হলো দ্রুত সময়ে যোগাযোগে ব্যবহৃত মোবাইল টেলিযোগাযোগপ্রযুক্তি, যাকে আবার ‘লং টার্ম ইভাল্যুয়েশন’ বা ‘এলটিই’-ও বলা হয়ে থাকে। এই প্রযুক্তি বর্তমানে বাংলাদেশে চালু থাকা তৃতীয় প্রজন্ম বা ‘থ্রি-জি’র পরের ধাপ।

‘ ফোর-জি’র আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে ‘ ফোর-জি’ বোঝা যায়। ‘আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন- রেডিও যোগাযোগ’ শাখার ‘ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন অ্যাডভান্সড’ (আইএমটিএ) ফোরজির জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়েছে। সেখানে ‘ ফোর-জি’ হতে হলে বেশ কয়েকটি যোগ্যতা উৎরাতে হয়।

আইএমটিএর ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি খুবই দ্রুতগতির হবে। কোনো দ্রুতগতির যানবাহন অর্থাৎ বাস বা ট্রেনে এই সেবার ইন্টারনেট গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবাইট। এ ছাড়া আবাসিক ব্যবহারে বা স্থিরাবস্থায় ‘ ফোর-জি’ নেটওয়ার্কের গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে এক গিগাবাইট।

বৈশিষ্ট্য : ‘ ফোর-জি’র সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন। যার মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে গতি। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে তথ্য আদান-প্রদান পুরোপুরি ‘ইন্টারনেট প্রটোকল প্যাকেট সুইচ নেটওয়ার্ক’ ভিত্তিক হবে। একই স্পেকট্রাম থেকে সর্বাধিকসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্র্যান্ডইউথ ন্যূনতম ৫ থেকে ২০ মেগাহার্টজ এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ৪০ মেগাহার্টজ পর্যন্ত হবে। এ ছাড়া এর ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে লিংক স্পেকট্রাল এফিসিয়েন্সি প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বিট এবং আপলিংকের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৭৫ বিট হবে।

সুবিধা : ‘ ফোর-জি’র মূল সুবিধা- এই নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব। বলাই হচ্ছে এর গতি হবে সর্বনিম্ন ১০০ মেগাবাইট। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ ডেফিনেশন টেলিভিশন ও ভিডিও কনফারেন্সের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে গ্রাহক সব সময়ই মোবাইল অনলাইন ব্রডব্যান্ডের আওতায় থাকতে পারবে। ‘ ফোর-জি’র মাধ্যমে মোবাইলে কথোপকথন ও তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা অনেক বেশি ও শক্তিশালী। এ ছাড়া ‘ ফোর-জি’ মোবাইল গ্রাহকদের ভয়েস মেসেজ, মাল্টিমিডিয়া মেসেজ, ফ্যাক্স, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়।

‘ ফোর-জি’র সূচনা : বেশির ভাগ উন্নত দেশেই ‘ ফোর-জি’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার শুরু হয়েছে। যাত্রার শুরু থেকে দুটি ‘ফোর-জি’ স্ট্যান্ডার্ড বাণিজ্যিকভাবে মোবাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একটি মোবাইল ‘ওয়াইম্যাক্স’ এবং আরেকটি ‘লং টার্ম ইভাল্যুয়েশন’ বা ‘এলটিই’। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু হয় ‘ ফোর-জি’। এর পর একটু বড় পরিসরে ২০০৯ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে (ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন) অপারেশন শুরু করে এই প্রযুক্তি। এ ছাড়া ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্প্রিন্ট নেক্সটেল মোবাইল ওয়াইম্যাক্স এবং ২০১০ সালে মেট্রো পিসিএস এলটিই সার্ভিস চালু করে। অবশ্য শুরুতে ফোরজি ইউএসবি মডেমে থাকলেও ২০১০ সালে সর্বপ্রথম ওয়াইম্যাক্স স্মার্টফোন এবং ২০১১ সালে এলটিই স্মার্টফোনে বাজারে আসে। আর এখন প্রায় সব অপারেটিং সিস্টেমচালিত স্মার্টফোনেই এটি ব্যবহার করা যায়।

বাংলাদেশে ‘ ফোর-জি’ : দেশে প্রথমবারের মতো ‘ ফোর-জি’ বা এলটিই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখিয়েছিল বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (বিআইইএল)। সেটাও বছর দুয়েক আগের কথা। দেশে ‘ফোর-জি’ নেটওয়ার্কের ব্যবহার শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে অপারেটরগুলো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এখনো দেশের সব জায়গায় পূর্ণাঙ্গভাবে ‘থ্রি-জি’ নেটওয়ার্ক দেয়াই সম্ভব হয়নি।

২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ‘থ্রি-জি’ সেবা দিতে এক নিলামে অংশ নিয়েছিল গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল। তবে ‘বিশেষ’ সুবিধায় সরকারি মোবাইল সেবাদান প্রতিষ্ঠান টেলিটক সে সময় নিলামের আগেই ‘থ্রি-জি’ সেবা চালু করে। তবে ফোর-জি নেটওয়ার্কের নিলাম হলে সেখানেও এই অপারেটরগুলোই অংশ নেবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিটিআরসি এটাও উল্লেখ করেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটককেও এ নিলামে অংশ নিতে হবে।

এদিকে, মোবাইল অপারেটরগুলোর সংগঠন ‘অ্যামটব’-এর মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী টি আই এম নূরুল কবীর বলছেন, ‘ ফোর-জি’র জন্য বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত কি না বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু স্পেকট্রাম বিক্রি করলেই এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা সফল হবে না। মাত্র ২৫ শতাংশ স্মার্টফোন পেনিট্রেশনের বাজারে ফোরজির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হবে, তা ব্যবসায়িক মূল্যায়নে যুক্তিযুক্ত কি না সেটিও এক প্রশ্ন। এ ছাড়া স্মার্টফোন ডিভাইস ও ইন্টারনেটে ট্যাক্সের হারও বিবেচ্য। চাহিদা ও জোগান এবং অ্যাকসেসিবিটিলি ও অ্যাফোর্টেবিলিটি হিসাবে আনতে হবে। এখনো থ্রিজি নেটওয়ার্কও ঠিকমতো সম্প্রসারিত হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ