ঢাকা, বুধবার 13 September 2017, ২৯ ভাদ্র ১৪২8, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক ব্যর্থতা

প্রতিবেশি মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর গণহত্যা প্রতিহত করাসহ সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। গত সোমবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে আয়োজিত এক সমাবেশে তারা বলেছেন, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্বের সকল দেশ যখন তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা ও নির্মূল অভিযানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে, এমনকি জাতিসংঘও যখন মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, তেমন এক কঠিন সময়েও আওয়ামী লীগ সরকার কেবলই আশ্রয় ও তথাকথিত মানবিক সহায়তা দেয়ার মধ্যে সকল তৎপরতা সীমাবদ্ধ রেখেছে। একটি উদাহরণ হিসেবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব  তৈয়ব এরদোগানের স্ত্রী এবং দেশটির ফার্স্ট লেডি এমিনো এরদোগানের বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার সফরের কথা উল্লেখ করে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, পৃথকভাবে তো বটেই, এমনকি তুরস্কের ফার্স্ট লেডির সঙ্গেও সরকারের কোনো মন্ত্রী ওই এলাকায় যাননি। অথচ এটা ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সৌজন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। মিসেস এরদোগানের প্রায় এক সপ্তাহ পর গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো কক্সবাজার সফরে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। বিষয়টির সঙ্গে ভারতের অনুমতি পাওয়া-না পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, এতদিনে মোদি সরকারের ‘অনুমতি’ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী! 

সমাবেশে বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে প্রসঙ্গক্রমে সরকারের পররাষ্ট্রনীতি প্রাধান্যে এসেছে। বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটে আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে, এই সরকারের আসলে কোনো বন্ধু নেই। একমাত্র ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত ভারত সংকটের শুরু থেকেই মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ক’দিন আগে দেশটি সফরকালে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদি খোলামেলাভাবেই গণহত্যার প্রশ্নে মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। আরেক কথিত বন্ধুরাষ্ট্র গণচীনও প্রকাশ্যেই মিয়ানমারকে সমর্থন জানিয়ে চলেছে। একই অবস্থান নিয়েছে রাশিয়াও। দেশ দুটির বাধা ও বিরোধিতার কারণে জাতিসংঘ পর্যন্ত পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশ দুটি নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেয়ারও হুমকি দিয়ে রেখেছে। অথচ এই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের দহরম-মহরমের  কোনো শেষ নেই! 

কথা শুধু এটুকুই নয়। সরকার একদিকে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সমর্থন পাওয়ার কোনো চেষ্টা চালানোর প্রমাণ দিতে পারেনি, অন্যদিকে তুরস্কসহ যেসব দেশ বাংলাদেশের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে সেসব দেশের সঙ্গেও সরকার কূটনৈতিক রীতি-নীতি বিরোধী অসম্মানজনক আচরণ করে চলেছে। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি মিসেস এরদোগানের সাম্প্রতিক সফরের সময়। মূলত এ ধরনের নীতি, মনোভাব ও কার্যক্রমের কারণেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে একেবারে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। অবস্থা এখন এতটাই শোচনীয় যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়ার আগে ভারতের ‘অনুমতি’ নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও ব্যঙ্গ-তামাশা করা হলেও বিষয়টিকে আমরা অত্যন্ত গুরুতর না মনে করে পারি না। এমন অবস্থার কারণ সম্পর্কেও সোমবারের সমাবেশে জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন এবং এ কথার সত্যতাও বিভিন্ন সময়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের নামে আয়োজিত এমন এক কর্মকান্ডের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতার দখল নিয়েছিল, যার কোনো পর্যায়েই জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। সেবার জনগণকে ভোটই দিতে দেয়া হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও একদিকে ১৫৪ জন ‘নির্বাচিত’ এমপি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে শুধু একটি সংসদ ও সরকারই গঠন করা হয়নি, ওই সংসদকে সামনে রেখে সরকার বিরোধী দলগুলোর ওপর ফ্যাসিস্ট কায়দায় দমন-নির্যাতনও চালিয়ে যাচ্ছে। স্মরণ করা দরকার, একমাত্র ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারত ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো দেশই ৫ জানুয়ারির ওই কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানায়নি বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ সকল রাষ্ট্র সংসদ ও সরকার গঠনের কর্মকান্ডের বিরোধিতা করেছিল। এখনও পর্যন্ত দেশগুলোর সে অবস্থানে পরিবর্তন ঘটেনি।

এমন অবস্থার কারণে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারেও সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্য একটি বিশেষ কারণকেও সামনে এনেছেন বিশিষ্টজনেরা। মিয়ানমারের যে জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা ও নির্মূলের ভয়ংকর অভিযান চালানো হচ্ছে তারা মুসলিম। দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের সশস্ত্র ইসলামী জঙ্গি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী একেই তার সমর্থন দেয়ার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। চীনের মতো কিছু রাষ্ট্রও এমন এক অসত্য প্রচারণার আড়াল নিয়েছে যে, রোহিঙ্গা মুসলিমরা নাকি আইএস-এর সঙ্গে জড়িত এবং তারা নাকি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে বলেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে! বাংলাদেশ সরকারও নাকি তথাকথিত ইসলামী জঙ্গি বিরোধী একই নীতির কারণে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সুফলপ্রসূ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না!

বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্তরালে যা কিছুই ঘটে থাকুক বা ঘটতে থাকুক না কেন, ঘটনাপ্রবাহের বর্তমান পর্যায়ে এই অভিযোগ অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ক্ষতিকর বিভিন্ন নীতি ও কর্মকান্ডের কারণে তো বটেই, কূটনীতির মতো জরুরি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়েও সরকার দলবাজি করে চলেছে বলেই বাংলাদেশকে এখন বন্ধুহীন অবস্থায় পড়তে হয়েছে। একই কারণে মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গাদেরকেই ঠেলে পাঠাচ্ছে না, দেশটির সামরিক হেলিকপ্টার যখন-তখন বাংলাদেশের আকাশ সীমা লংঘন করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এমনকি বাংলাদেশের দু’-চার কিলোমিটার পর্যন্ত ভেতরেও ঢুকে পড়ছে। বলাবাহুল্য, এসবই সম্ভব হচ্ছে সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার কারণে। বিশিষ্টজনেরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, সময় এসেছে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার। যুদ্ধ নয় বরং জোর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে হবে। তাদের এমন নিরাপত্তার সঙ্গে দেশে ফেরৎ পাঠাতে হবে, তারা যাতে মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক হিসেবে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে জাতিসংঘ, ওআইসি এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনসহ সকল আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে তৎপর হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ