ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা ইস্যুটি জাতিসংঘে তুলে ধরার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

 

সংসদ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা চলমান রোহিঙ্গা ইস্যু জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরার কথা জানিয়ে বলেছেন, এ ইস্যুতে সারাবিশ্ব আজ জেগে উঠেছে। সব দেশ থেকে মিয়ানমারকে অনুরোধ করা হচ্ছে নির্যাতন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে। আমাদের কষ্ট হলেও মানবিক কারণেই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়া হবে। কিন্তু তাদের কোনো কষ্ট হতে দেওয়া হবে না। কেননা তারা আমাদের আশ্রয়ের জন্য এসেছে। তাদের আমরা ফেলে দিতে পারি না। মিয়ানমারের মতো নাফ নদী কিংবা বঙ্গোপসাগরের দিকে ঠেলেও দিতে পারি না। 

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার দশম জাতীয় সংসদের সপ্তদশ অধিবেশনের সমাপনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সমাপনি বক্তব্যে অংশ নেন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশদ এরশাদও। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে স্পীকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ৫ কার্যদিবসের এই অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অল্প সময়ের জন্য হলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সংসদের এই অধিবেশন। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ে রেজুলেশন নেওয়া হয়েছে অধিবেশনে। আমরা গণতন্ত্রের চর্চা করি, সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে এটাই নিয়ম। সংসদের মান-মর্যাদা রক্ষা, গুরুত্ব উঠে এসেছে। 

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে মিয়ানমারে। কিছু সন্ত্রাসীগোষ্ঠী দেশটির পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর হামলার পরই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যারা দোষী তাদের খুঁজে বের করা হোক, শাস্তি দেওয়া হোক। কিন্তু নিরীহ মানুষের ওপর এমন নির্যাতন কেন? সেখানে গিয়ে দেখেছি কী করুণ অবস্থা। শিশু, নারী, বয়োবৃদ্ধই বেশী এসেছে। তাদের কাছ থেকে যে ভয়াবহ ঘটনা শুনা যায়, পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যেভাবে আক্রমণ করেছিল সেটিই ফুটে উঠে এসেছে। একাত্তরেও আমাদের এক কোটি শরণার্থী ভারতে গিয়েছিল। এখনো মিয়ানমারে ঘর-বাড়িতে আগুণ জ্বলছে। আমাদের ওপর বিরাট বোঝা হলেও মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছি। 

তিনি বলেন, কীভাবে এবং কেমন করে রাখবো সেটাই বড় সমস্যা। ৩ লাখের বেশি মানুষ এসেছে। আরও আসছে। মিয়ানমারকে জানিয়েছি, সন্ত্রাসীদের কাউকে প্রশ্রয় দেব না। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। সারাবিশ্ব জেগে উঠেছে। সব দেশ থেকে মিয়ানমারকে অনুরোধ করা হচ্ছে নির্যাতন বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে। ৪৫টি দেশের প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে সার্বিক অবস্থা দেখে এসেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও মিয়ানমারকে হত্যাকান্ড-নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। আশ্রয় দেওয়ার জন্য তারা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতার কারণে আশ্রিতদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ভারত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া থেকে রিলিফ পাঠিয়েছে। রিলিফ যাতে সুষ্ঠুভাবে বন্টন হয় সেজন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দিয়েছি। আমাদের দলের পক্ষ থেকেও আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কষ্ট না হয় সেই কাজ করা হচ্ছে। যারা এসেছে তাদের জন্য ছবিসহ আইডি কার্ড করা হচ্ছে। ২ হাজার একশ’ একর জায়গায় সাময়িকভাবে রাখা হবে। এছাড়া ভাষানচরে একটি জায়গা নির্ধারণ করেছি, সেখানে অস্থায়ী আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসন সজাগ রয়েছে। 

সংসদ নেতা বলেন, সবচেয়ে মানবিক দিক হলো শিশুরা। বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক শিশুর আপনজন বলে কেউ নেই। এ ধরণের করুণ কাহিনী সেখনে চলছে। এ দৃশ্য আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। কারণ রিফিউজি হিসেবে থাকার কষ্ট আমি ও আমার বোন শেখ রেহানা বুঝি। আমাদের যত কষ্টই হোক না কেন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতেই হবে। তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই।

বিপদে পড়ে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের যেন কোন কষ্ট না হয় সেজন্য দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জন¯্রােতের সঙ্গে মুল দোষী সন্ত্রাসীরা ঢুকতে না পারে, আশ্রয় না পায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। ত্রাণ যেসব আসছে সেগুলোও ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছি। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় পারদর্শী। প্রয়োজন হলে আমাদের খাবার ভাগ করে খাব, কিন্তু আশ্রিতদের তো ফেলে দিতে পারি না। মিয়ানমারের মতো নাফ নদীতে কিংবা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে পারি না। মানবিক দিক বিবেচনা করে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছি। আশা করি মিয়ানমারের চেতনা ফিরে আসবে, তাদের নাগরিকদের ফেরত নিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

খাদ্য সঙ্কটের গুজব নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারা এসব গুজব ছড়িয়ে খেলছে? আগেও অনেকে মানুষকে নিয়ে খেলেছে। এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে। কোথায় কেউ মজুদ রেখে এ ধরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে কি না তল্লাশি করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। মানুষের খাদ্য নিয়ে কাউকে খেলতে দেব না। দেশবাসীর সহযোগিতা চাই- কারা এ ধরণের কর্মকান্ড ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করে জানান। অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য আমরা অর্জন করেছি। বাংলাদেশকে চাই ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে। দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এবারের বন্যায় রাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেরামত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের জন্য রাজনীতি করি, মানুষের কল্যাণ করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা পরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি বলেই দেশের এতো উন্নয়ন হচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে কোন ঘর অন্ধকার থাকবে না, প্রত্যেক ঘরে আমরা আলো জ্বালাবো। এতো কাজের সুযোগ রয়েছে, কারও আর বেকার থাকার কথা না। ৫ কোটি মানুষ নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। দেশের মানুষ ভাল থাকুক, সুন্দর থাকুক- এটাই আমরা চাই। 

বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেন, রাজধানী ঢাকা ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই ঢাকায় মানুষের চাপ বাড়ছে। যানজটে শত শত ঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। ফ্লাইওভার করা হলেও যানজট কমেনি। ঢাকার আশেপাশের নদীগুলো সচল করতে পারলে যানজট কিছুটা কমবে। তিনি বলেন, ঢাকাকে তিলোত্তমা শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু আমরা সেভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। আগে ঢাকায় প্রথমে আবাসিক এলাকা ছিলো ধানমন্ডি। তারপর গড়ে উঠলো গুলশান, বনানী ও বারিধারা। এখন আর এসব এলাকাকে আবাসিক হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। সব জাযগায় কলকারকানা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য করে গতে তুলতে হলে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিনিয়ত এ শহরে আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বিষ গ্রহণ করছি। বিষাক্ত বর্জ্য আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছে। পুরান ঢাকার অধিবাসিরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ