ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্মূল করার লক্ষ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে গণহত্যা ও  ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের ভয়ংকর অভিযান চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ উঠতে শুরু করেছে। প্রথম কিছুদিন পর্যন্ত তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিবাদ জানালেও এরই মধ্যে জাতিসংঘের পাশাপাশি চীনসহ দু’-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্বের সকল রাষ্ট্রই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ঘটাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা। সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে সুচিন্তিতভাবে সংশয়ের সৃষ্টি করা হলেও গত বুধবার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে দেয়া এক সর্বসম্মত বিবৃতিতে নিরাপত্তা পরিষদ অবিলম্বে রাখাইন রাজ্যে চলমান গণহত্যা ও সহিংসতা বন্ধ করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ‘বিরল’ হিসেবে বর্ণিত এই বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর ‘মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ’ করছে। এই সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, অসামরিক লোকজনের ওপর সশস্ত্র হামলা ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে বলে অভিমত প্রকাশ করে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমরা ভয়াবহ মানবিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। গণহত্যা ও সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি তাদের সকলকে অবশ্যই নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার এবং আইনসম্মত নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ও অধিকারের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগ দিতে হবে। উল্লেখ্য, নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতেও একই বক্তব্য রাখা হয়েছে। এতে রোহিঙ্গাসহ সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন ও সমান সুযোগ বজায় রাখার জন্যও আহ্বান জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।
ওদিকে গণহত্যা বন্ধ করে রোহিঙ্গা সংকটের আশু সমাধান করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের উদ্দেশ্যে ‘খোলা চিঠি’ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূসহ ১২ জন নোবেল বিজয়ী এবং ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক শুরুর প্রাক্কালে প্রকাশিত এই ‘খোলা চিঠি’তে বিশ্বের ২৭ বিশিষ্টজন বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবীয় ট্র্যাজেডি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে তার অবসানে জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যদের এই মুহূর্তের দৃঢ় সংকল্প ও সাহসী সিদ্ধান্তের ওপর মানব ইতিহাসের ভবিষ্যৎ গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে বলেও নোবেল বিজয়ীসহ বিশিষ্টজনেরা। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও সহিংসতা শুরু হওয়ার পর গত বছরও তাদের কয়েকজন জাতিসংঘের প্রতি একই আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ২৭ বিশিষ্টজন আরো বলেছেন, কিন্তু তাদের আহ্বান এবং জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বরং সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ অবনতি ঘটে চলেছে।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং অতীতের বিভিন্ন সময়ে তারা এমনকি নির্বাচিত হয়ে দেশটির পর্লামেন্টেরও সদস্য হয়েছেন- এ ধরনের কিছু তথ্যের উল্লেখ করে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ১৯৮০-ও দশকে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ রোহিঙ্গাদের অবার্মিজ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে এবং বিগত কয়েক মাসে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। নিজেদের বসতবাড়ি থেকেও তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। রেহাই পাচ্ছে না এমনকি নারী ও শিশুরাও। বর্তমানে চলমান গণহত্যা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড সম্পর্কিত কিছু তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে নিরাপত্তা পরিষদের মতো বিশিষ্টজনেরাও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার এবং তাদের সকলকে আইনসম্মত নাগরিক অধিকার দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তারও আগে গণহত্যা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘকেই যে প্রধান এবং ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে হবে- সে কথাটাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন বিশ্বের ২৭ বিশিষ্টজন।
বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরাও একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন এবং আহ্বান জানিয়েছেন। গত বুধবার সরকারের উদ্যোগে সীমান্ত এবং উখিয়াসহ কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে পরিদর্শনে গিয়ে রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা দেখে বিদেশি দূতদের  প্রত্যেকেই ব্যথিত ও স্তম্ভিত হয়েছেন। তারা নিজ নিজ দেশের সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার এবং মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের মতো আরো অনেক সংস্থাও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এদিকে ঘটনাপ্রবাহে মিয়ানমারের অবস্থান নতুন করে সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘বিরল’ বিবৃতি থেকে জাতিসংঘের উদ্দেশে লেখা ২৭ বিশিষ্টজনের ‘খোলা চিঠি’ পর্যন্ত সকল কারণেই যখন গণহত্যা বন্ধ করাসহ সমস্যার সমাধানমুখী ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর মধ্যে আশাবাদের সৃষ্টি হতে শুরু করেছিল তেমন এক সম্ভাবনাময় সময়েও মিয়ানমার সম্পূর্ণ উল্টো পথে এগিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। দেশটির প্রধান নেত্রী অং সান সু কি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক চাপ ও আহ্বানের মধ্যেও তারা গণহত্যার অভিযান বন্ধ করবেন না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য গত বছরের আগস্টে গঠিত কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারেও মিয়ানমার চাতুরিপূর্ণ কৌশল নিয়েছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিশন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও আইনসম্মত সকল অধিকার দিয়ে গণহত্যা বন্ধ করার এবং সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর সুপারিশ করেছিল। অন্যদিকে সু কির সরকার এমন এক রাখাইন রাজ্যে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে যেখানে কোনো জীবিত রোহিঙ্গা থাকবে না। এজন্যই বিষয়টিকে সু কি সরকারের ‘সেরা উপহাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এই উপহাসের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার আসলে জাতিসংঘসহ সমগ্র বিশ্বের সঙ্গেই চরম ঔদ্ধত্য দেখাতে শুরু করেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মিয়ানমারের এই ঔদ্ধত্য কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুুযোগ নেই। দেশটির উচিত নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেয়া ‘বিরল’ বিবৃতির তাৎপর্য অনুধাবন করা। মিয়ানমারকে একই সাথে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিকেও যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, বিশ্ব জনমতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে গণহত্যা ও সহিংসতা বন্ধ করা হবে এবং সকল রোহিঙ্গাকে তাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার এবং আইনসম্মত নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ও অধিকারের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগ দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ